ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের পাশ ঘেঁষে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় উপজেলা কয়রা সাতটি ইউনিয়নের ১৩১টি গ্রাম নিয়ে গঠিত। কপোতাক্ষ, শাকবাড়িয়া, শিবসা ও আড়পাঙ্গাশিয়া নদীবেষ্টিত এ উপজেলার মানুষ সারা বছরই আতঙ্কে থাকেন। অমাবস্যা ও পূর্ণিমার সময় জলোচ্ছ্বাসে বেড়িবাঁধ ভেঙে বিভিন্ন গ্রাম প্লাবিত হয়।
প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা ও আম্ফান পেরিয়ে গেলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগের আতঙ্ক কাটেনি কয়রাবাসীর। একের পর এক ঘূর্ণিঝড় বয়ে গেলেও দুর্যোগপ্রবণ এ উপজেলায় মানুষের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য চাহিদা অনুযায়ী এখনো গড়ে ওঠেনি সাইক্লোন শেল্টার। যেগুলো রয়েছে, সেগুলোর বেশিরভাগই ঝুঁকিপূর্ণ।
এলাকাবাসী জানান, উপকূলীয় এলাকায় জনসংখ্যার তুলনায় আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা অপ্রতুল। যেসব এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে, সেগুলোর অবস্থাও ভালো নয়। ঝড়-তুফানে ঘরবাড়ি উড়ে গেলে আশ্রয়ের জন্য নিরাপদ জায়গা থাকে না।
জলোচ্ছ্বাসের সময় নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দিশেহারা হয়ে পড়েন মানুষ। প্রতিবছরই দুর্যোগে চরম সংকটে পড়তে হয় তাদের। অনেক ক্ষেত্রে একই কক্ষে গাদাগাদি করে থাকতে হয় নারী-পুরুষকে, এমনকি শৌচকর্মও করতে হয় একই জায়গায়। ফলে নতুন আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগের সময় প্রায় ৩ লাখ মানুষের জন্য বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৯৭টি আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। এছাড়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ২১টি সাইক্লোন শেল্টার রয়েছে।
২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলায় উপজেলার ৪১ জনের মৃত্যু হয়। ২০২০ সালের ২০ মে সুপার সাইক্লোন আম্ফানে উপজেলার ৪টি ইউনিয়নের ৫২টি গ্রাম সম্পূর্ণ এবং আরও ২টি ইউনিয়নের ২৪টি গ্রাম আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২১টি স্থানে বাঁধ ভেঙে যায় এবং ৫১ হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে প্রায় ১ লাখ ৮২ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন।
২ নম্বর কয়রা ইউনিয়নের বাসিন্দা আলামিন ইসলাম বলেন, দুর্যোগ প্রবণ এলাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী আশ্রয়কেন্দ্র এখনো তৈরি হয়নি। ফলে দুর্যোগের খবর শুনলেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তার মতে, উপজেলায় আরও অন্তত ১৫০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রয়োজন।
কাটকাটা গ্রামের রাণী মুন্ডা (৫০) বলেন, প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকতে হয়। নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড় যেন প্রতিনিয়ত মৃত্যুভয় বয়ে আনে।
দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের মাটিয়াভাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা বেলায়েত কাজি বলেন, ‘আমরা উপকূলীয় অঞ্চলে বাস করি। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য আরও সাইক্লোন শেল্টার ও গবাদিপশু রাখার ব্যবস্থা প্রয়োজন।’
মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের তেঁতুলতলা চরের বাসিন্দা জাকারিয়া হোসেন বলেন, ‘আমাদের এলাকায় একটি আশ্রয়কেন্দ্র থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। গত বছরের ঘূর্ণিঝড়ে সবাই সেখানে আশ্রয় নিতে গিয়ে গাদাগাদি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আমরা একই গ্রামে আরেকটি আশ্রয়কেন্দ্র চাই।’
উপজেলার সিপিপি সদস্য লিপি আক্তার বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের সময় করণীয় বিষয়ে মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে এবং নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। তবে বর্তমান সাইক্লোন শেল্টার ও মুজিব কেল্লার সংখ্যা পর্যাপ্ত নয়। ঝুঁকিপূর্ণ আশ্রয়কেন্দ্রগুলো দ্রুত সংস্কার জরুরি।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবির বলেন, প্রায় ৩ লাখ মানুষ দুর্যোগের সময় ঝুঁকিতে থাকেন। কয়রায় ১১৮টি আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে ৮০টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং এর মধ্যে ২০টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, যা দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন। এছাড়া আরও ১০০ থেকে ১৫০টি নতুন আশ্রয়কেন্দ্র প্রয়োজন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল বাকী বলেন, বিদ্যমান আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। উপকূলবাসীর নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য নতুন সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণে সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

