মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার পাটুরিয়া ফেরিঘাটের অদূরে পদ্মা-যমুনা নদী থেকে রাতের আঁধারে কাটার ড্রেজার বসিয়ে অবাধে বালু উত্তোলনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় নালী বড়রিয়া কৃষ্ণচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মোন্তাজ উদ্দিনের বিরুদ্ধে ওঠা এই অবৈধ কর্মযজ্ঞে নদীভাঙন ও পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি জায়গা জবরদখল করে গড়ে ওঠা এই বালুর রাজত্ব নিয়ে জনমনে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
অনুমোদিত বালুমহাল ছাড়া যেকোনো প্রাকৃতিক জলাশয় বা নদী থেকে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ বেআইনি। অথচ এই আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রধান শিক্ষক মোন্তাজের নেতৃত্বাধীন চক্রটি প্রতিদিন রাত ১০টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত পদ্মার বুক চিরে অব্যাহতভাবে বালু উত্তোলন করে আসছে।
উত্তোলিত বালু বাল্কহেডের মাধ্যমে এনে পাটুরিয়া ১নং ফেরিঘাটের সরকারি জায়গা দখল করে স্তূপ করা হচ্ছে। এর ফলে সেখানে ছোটখাটো পাহাড়সম বালুর গদি তৈরি হয়েছে। এমনকি বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর সীমানা নির্দেশক ‘ফোরশার পিলার’ জবরদখল করেও এই অবৈধ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, শিক্ষকতার মতো একটি মহান পেশার আড়ালে মোন্তাজ উদ্দিন পাটুরিয়া ঘাট এলাকার একচ্ছত্র বালু বাণিজ্যের মূল নিয়ন্ত্রণকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। নিজের সম্পৃক্ততা আড়াল করতে তিনি সামনে রেখেছেন আপন ভাগিনা আলমগীরকে। তবে পর্দার আড়ালের মূল পরিকল্পনা ও পরিচালনা তার মাধ্যমেই হয়ে থাকে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক বালু ব্যবসায়ী জানান, প্রতি রাতে নদী থেকে অবৈধ বালু তুলে ১ নং ঘাটের নির্দিষ্ট বেডে স্তূপ করা হয়। এরপর ভোর হওয়ার আগেই দাসকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশেই কাটার ড্রেজারটি নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রাখা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, এই অবৈধ সাম্রাজ্য নির্বিঘ্নে টিকিয়ে রাখতে মোন্তাজ উদ্দিন মূল ‘ম্যানেজার’-এর ভূমিকা পালন করছেন। পাটুরিয়া ফেরি ও লঞ্চ ঘাট এলাকা দখল করে রাখা অন্তত ১২ জন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় এবং প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে তা বণ্টন করার দায়িত্বও তার কাঁধে। স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধিদের নাম ভাঙিয়ে এলাকায় একক আধিপত্য বিস্তার করে চলেছে এই সিন্ডিকেট।
নৌপথের নিরাপত্তা ও নদী রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বিশেষায়িত নৌ পুলিশ থানার নাকের ডগায় এ ধরনের অপরাধ চললেও তাদের রহস্যজনক নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসন মাঝে মাঝে লোকদেখানো অভিযান চালিয়ে সামান্য জরিমানা করলেও তা এই প্রভাবশালী চক্রের কাছে নগণ্য। ফলে পরদিনই নতুন উদ্যমে ঘাটে বালু ফেলার কাজ শুরু হয়। কোনো স্থায়ী কঠোর আইনি পদক্ষেপ বা নিয়মিত ফৌজদারি মামলা না হওয়ায় দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে চক্রটি।
এ বিষয়ে শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনিষা রাণী কর্মকার কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, রাতের আঁধারে নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন রোধে নৌ পুলিশ টহল দিয়ে ব্যবস্থা নিতে পারে। ইতোমধ্যে নৌ পুলিশের ওসিকে জড়িতদের গ্রেপ্তার ও তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়েরের স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তবে উপজেলা প্রশাসনের এই কঠোর বার্তার বিপরীত চিত্র পাওয়া গেছে পাটুরিয়া নৌ পুলিশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলামের বক্তব্যে নির্দেশনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন সুর গেয়ে বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত নই। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
উপজেলা প্রশাসনের প্রধানের স্পষ্ট নির্দেশনার পরও ওসির এমন মন্তব্য প্রশাসনিক গাফিলতি নাকি অপরাধীদের ছত্রচ্ছায়া দেওয়ার চেষ্টা—তা নিয়ে তীব্র সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক মোন্তাজ উদ্দিনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি, যা তার সন্দেহজনক অবস্থাকে আরও ঘনীভূত করেছে।
শিক্ষকতার মতো সম্মানিত পেশায় থেকে প্রশাসন ও রাজনৈতিক প্রভাবের অপব্যবহার করে নদী ধ্বংস এবং সরকারি জমি দখলের এই চক্রকে চিরতরে উচ্ছেদ করতে কেবল নামমাত্র জরিমানা নয়; বরং মূল হোতা প্রধান শিক্ষক মোন্তাজ উদ্দিনসহ সংশ্লিষ্টদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার এবং নিয়মিত ফৌজদারি মামলার মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল ও ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।

