কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার ধলা ইউনিয়নের সেকান্দরনগর গ্রামে অবস্থিত সেকান্দরনগর সাহেববাড়ি জামে মসজিদ মোগল আমলের স্থাপত্য নিদর্শনের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। প্রায় চার শতকেরও বেশি পুরোনো এই মসজিদটি আজও তার গৌরব, ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও নান্দনিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখে দাঁড়িয়ে আছে।
স্থানীয় সূত্র ও ইতিহাসবিদদের মতে, মসজিদটি আনুমানিক ১৬০০ শতকের দিকে নির্মিত। সে সময়ের মোগল স্থাপত্যরীতির স্পষ্ট ছাপ পাওয়া যায় এর গঠনশৈলী, নকশা ও নির্মাণ উপকরণে। পোড়া ইট, চুন-সুরকি, খয়ার এবং সুপারির কষ ব্যবহার করে নির্মিত এই মসজিদ টেকসই নির্মাণ কৌশলের এক অনন্য নিদর্শন।
মসজিদের ছাদে রয়েছে তিনটি গম্বুজ মাঝখানে একটি বৃহৎ গম্বুজ এবং দুপাশে দুটি অপেক্ষাকৃত ছোট গম্বুজ। এ ছাড়া ওপরের অংশে অষ্টভূজাকৃতির ১২টি ছোট মিনার মসজিদের বাহ্যিক সৌন্দর্যকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। প্রধান প্রবেশপথের বিশাল খিলান ও তার চারপাশের সূক্ষ্ম কারুকাজ মোগল স্থাপত্যশৈলীর নিখুঁত উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত।
মসজিদের ভেতরে রয়েছে কিবলামুখী নান্দনিক মিহরাবসহ প্রশস্ত নামাজকক্ষ, যেখানে একসঙ্গে প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদের বাইরের প্রশস্ত আঙিনায় আরও প্রায় ২০০ মুসল্লির নামাজ আদায়ের সুযোগ রয়েছে, যা এটিকে এলাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
মসজিদের পাশেই অবস্থিত প্রাচীন জলাশয়টি মুসল্লিদের অজুর সুবিধার্থে খনন করা হয়েছিল। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও জলাশয়টি আজও বিদ্যমান রয়েছে, যা মসজিদের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
মসজিদের ইমাম সৈয়দ আবু সায়েম জানান, ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ মসজিদটির সংরক্ষণ কার্যক্রম গ্রহণ করে। সে সময় মসজিদের বিভিন্ন অংশে সৃষ্ট ফাটল মেরামত এবং রংয়ের কাজ করা হয়। এছাড়া ২০২৫ সালে জলাশয়ের পাড় ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিলে প্রতিরক্ষা প্রাচীর নির্মাণ করে মসজিদটি রক্ষা করা হয়।
ইতিহাস অনুসারে, বর্তমান সেকান্দরনগর গ্রামের পূর্ব নাম ছিল ‘বেইয়াডহি’। বাংলায় ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে আগত ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম হজরত শাহ্ সেকান্দরের নামানুসারেই এ এলাকার নামকরণ করা হয় সেকান্দরনগর। এই মসজিদ সেই ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, সেকান্দরনগর সাহেববাড়ি জামে মসজিদ শুধু নামাজের স্থান নয়; এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের অমূল্য স্মারক। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, যথাযথ সংরক্ষণ ও পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে এই মসজিদ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি জীবন্ত মোগল স্থাপত্য নিদর্শন হিসেবে টিকে থাকবে।
চার শতকের ইতিহাস ও মোগল আমলের স্থাপত্যশৈলী ধারণ করে সেকান্দরনগর সাহেববাড়ি জামে মসজিদ আজও কালের সাক্ষী হয়ে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।



