ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

আজ লক্ষ্মীপুর হানাদারমুক্ত দিবস

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৪, ২০২৫, ১১:০৮ পিএম
৭১-এর শহীদ সমাধি, লক্ষ্মীপুর। ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

লক্ষ্মীপুরের ইতিহাসে ৪ ডিসেম্বর এক গৌরবময় দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল আক্রমণের মুখে পাকিস্তানি বাহিনী কৌশলে পালিয়ে যায়। দীর্ঘদিন অবরুদ্ধ থাকার পর লক্ষ্মীপুর সদরের মানুষ সেদিন মুক্তির স্বাদ ও বিজয়ের আনন্দ পায়।

এই জেলায় পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে ওঠে এপ্রিল মাসে। শত্রুবাহিনী যেন লক্ষ্মীপুর সদরে প্রবেশ করতে না পারে সে জন্য স্বাধীনতাকামী জনগণ ও মুক্তিযোদ্ধারা নোয়াখালীর চৌমুহনী থেকে লক্ষ্মীপুর সদর পর্যন্ত সড়কের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু ভেঙে প্রাথমিক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। সেই সময়ের স্মৃতি হিসেবে মাদাম ব্রিজের পিলার আজও দাঁড়িয়ে আছে।

২৫ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী লক্ষ্মীপুর সদরে প্রবেশ করে বাজারডিতে প্রধান ক্যাম্প স্থাপন করে। ওই দিন মজপুর গ্রামে হামলা চালিয়ে ৩৫ জনকে হত্যা করা হয়, যা ‘মজপুর গণহত্যা’ নামে পরিচিত। পরবর্তীতে জেলার বিভিন্ন স্থানে তারা একাধিক সাব-ক্যাম্প স্থাপন করে।

তথ্য অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধের সময় লক্ষ্মীপুরের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক লুটপাট, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও হত্যাযজ্ঞ চালায় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা। এই বর্বরতার বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা জেলায় ১৯টি সম্মুখযুদ্ধ এবং ২৯টি দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনা করেন। যুদ্ধে শহীদ হন ৩৫ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং অসংখ্য মুক্তিকামী মানুষ। দালাল বাজার-রামগঞ্জ সড়কে ১৭টি বড় যুদ্ধের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধারা ৬০ থেকে ৭০ জন পাকসেনাকে হত্যা করতে সক্ষম হন।

নভেম্বর থেকে পাকিস্তানি বাহিনী ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ২ ডিসেম্বর রাতে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের দুটি প্রধান ক্যাম্প ঘিরে ফেলেন। আত্মসমর্পণের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করলে শুরু হয় তীব্র যুদ্ধ। কয়েক ঘণ্টার সংঘর্ষের পর ৩ ডিসেম্বর গভীর রাতে পাকিস্তানি বাহিনী রাজাকারদের রেখে নোয়াখালীর চৌমুহনীর দিকে পালিয়ে যায়।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবুর রহমান জানান, ১৯৭১ সালের ২১ মে ভোর রাতে লক্ষ্মীপুর শহরের উত্তর ও দক্ষিণ মজুপুর গ্রামের হিন্দু পাড়ায় ভয়াবহ তাণ্ডবলীলা চালায় পাক-হানাদার বাহিনী। বাড়ি ঘরে আগুন লাগিয়ে বহু মানুষকে গুলি ও বেওনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে তারা। এতে প্রায় ৪০ জন নিরস্ত্র মুক্তিকামী বাঙালি শহীদ হন। একাত্তরের ১ ডিসেম্বর থেকে, প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল হায়দার চৌধুরী ও সুবেদার আব্দুল মতিনের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা সাঁড়াশি আক্রমণ চালায় হানাদার বাহিনীর বিভিন্ন ক্যাম্পে। অবশেষে ৪ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় তারা। 

৪ ডিসেম্বর সকালে খবর ছড়িয়ে পড়তেই লক্ষ্মীপুরজুড়ে বিজয়ের উল্লাস শুরু হয়। রাজাকাররা মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। তবে বিজয়ের আনন্দের মাঝেই বেদনার অধ্যায় রচিত হয়–  রাজাকার কমান্ডার আবদুল হাইয়ের নেতৃত্বে অতর্কিত হামলায় শহীদ হন মুক্তিযোদ্ধা আবু সাঈদ এবং আহত হন আরও তিন জন।

এভাবেই ত্যাগ, লড়াই ও আত্মদানের মধ্য দিয়ে ৪ ডিসেম্বর লক্ষ্মীপুর মুক্ত হয়।

এ জেলার বাগবাড়ীর টর্চার সেল, গণকবর, মাদাম ব্রিজ ও বাসুবাজারের গণকবর আজও যুদ্ধের বিভীষিকাময় স্মৃতি বহন করে। মাহবুবুল আলম, জহিরুল ইসলাম ও খোরশেদ আলম সহ স্থানীয় কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা এসব স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ ও সংস্কারের দাবি জানান।