মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার মৎস্য কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
বুধবার (৬ মে) মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুজ্জামানের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন কাদির নামের এক ভুক্তভোগী। এ ঘটনায় উপজেলা জুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
লিখিত অভিযোগপত্রে বলা হয়, মো. মনিরুজ্জামান দীর্ঘদিন ধরে জুড়ী উপজেলায় কর্মরত থাকার সুবাদে হাকালুকি হাওরকেন্দ্রিক একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলে হাওরের সম্পদ লুটপাট করে আসছেন এবং নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। বিভিন্ন বিলে সরকারি জলমহাল নীতিমালা অমান্য করে সেচ মেশিন দিয়ে বিল শুকিয়ে মাছ আহরণের মাধ্যমে মৎস্য সম্পদ ধ্বংস করছেন।
বছরের পর বছর হাকালুকি হাওরের চাতলা, তুরল ও নাগুয়াবিলসহ বিভিন্ন বিলে প্রকাশ্যে ১০ থেকে ১৫টি মেশিন দিয়ে বিল শুকিয়ে মাছ আহরণের অভিযোগও রয়েছে সেখানে।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, মো. মনিরুজ্জামান দায়িত্ব গ্রহণের পর অবৈধ মৎস্য শিকার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের পরিবর্তে ব্যক্তিগত সুবিধার বিনিময়ে তা পরোক্ষভাবে প্রশ্রয় দিয়ে আসছেন। বিশেষ করে অবৈধ কারেন্ট জালের ব্যবহার, প্রজনন মৌসুমে নির্বিচারে মাছ আহরণ এবং নিষিদ্ধ পদ্ধতিতে বিল সেচে মাছ শিকার—এ ধরনের কার্যক্রম চলমান থাকা সত্ত্বেও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, হাকালুকি হাওরের বিভিন্ন বিলে সরকারি বিধি অনুযায়ী মাছের সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক বংশবিস্তার নিশ্চিত করার কথা থাকলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না। তদুপরি উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামানের সহযোগিতায় ইজারাকৃত বিলগুলোতে নিয়মবহির্ভূতভাবে অতিরিক্ত মাছ আহরণ, সেচ/পাম্প মেশিন ব্যবহার করে পানি নিষ্কাশনের মাধ্যমে নির্বিচারে মাছ ধরা এবং প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে অবৈধ সুবিধা গ্রহণের মতো অনিয়ম সংঘটিত হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডের ফলে একদিকে সরকারের রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে হাওরের প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য ও মাছের প্রজনন প্রক্রিয়া মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে—যা পরিবেশ ও স্থানীয় মৎস্যসম্পদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।
এ ছাড়াও মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে সরকারি বরাদ্দের পাশাপাশি বিভিন্ন দাতা সংস্থা ও এনজিওর মাধ্যমে জুড়ীতে পরিচালিত বিভিন্ন কার্যক্রমেও ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির কথা বলা হয়েছে অভিযোগপত্রে।
অভিযোগপত্র থেকে আরও জানা যায়, জুড়ী উপজেলার বিভিন্ন বাজার ও দোকানে অবাধে অবৈধ কারেন্ট জাল বিক্রি হচ্ছে। এসব দোকান থেকে নিয়মিত মাসোয়ারা আদায় করা হয় এবং কেউ তা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে জাল জব্দের ঘটনা দেখানো হয়। একই সঙ্গে হাকালুকি হাওরে অবৈধ টানা জাল ব্যবহারকারী মৎস্য শিকারীদের কাছ থেকেও নিয়মিত অর্থ গ্রহণ করেন মৎস্য কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, কয়েক মাস আগে বাস্তবায়িত শুটকি প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ও আত্মসাতের অভিযোগ নিয়েও তার বিরুদ্ধে সমালোচনা রয়েছে, যা স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
উপজেলা পরিষদে কেবল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তরেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ (এসি) সুবিধা রয়েছে; অন্য কোনো কর্মকর্তার কক্ষে এ সুবিধা নেই। এমন প্রেক্ষাপটে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বিলের এক ইজারাদার জমির উদ্দিনের কাছ থেকে উৎকোচ হিসেবে একটি এসি গ্রহণ করেছেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ আছে।
গত ৫ মে জুড়ী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তাকে নিয়ে আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ নেতা এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মামলার আসামি হিসেবে পরিচিত এক বিলের ইজারাদার জমির উদ্দিনের আত্মীয় ফয়েজের বাড়িতে আয়োজিত এক জাঁকজমকপূর্ণ ভূরিভোজে অংশ নেন।
তবে ভূরিভোজের বিষয়ে কথা না বললেও বিল সংশ্লিষ্ঠ অভিযোগের বিষয়ে ফয়েজ আহমেদ, জমির উদ্দিন ও ছবির মিয়া রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘জলমহাল নীতিমালা অনুযায়ী আমরা বিল পরিচালনা করে আসছি। আমাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্য নয়।’
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমার শুধু একটাই কথা, আপনারা এ বিষয়ে তদন্ত করে যা পাবেন তা লিখবেন। তদন্ত করলেই এ বিষয়ে অনেক কিছুই পেয়ে যাবেন। এখন আমি এ বিষয়ে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছি না।’
এ বিষয়ে মৌলভীবাজারের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক রুবেল মাহমুদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘মৎস্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন