ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ঘুষ বাণিজ্য নিয়ে সংবাদ প্রকাশ, সাংবাদিকের নামে ওসির জিডি

বদলগাছী (নওগাঁ) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: মার্চ ২৭, ২০২৬, ১০:০০ এএম
বদলগাছী থানা ও ওসি মিঠু হাসান। ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

নওগাঁর বদলগাছী থানা পুলিশের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্য নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে মিঠু হাসান নামে এক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন বদলগাছী থানার ওসি লুৎফর রহমান। গত ১৮ মার্চ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়া সংবাদটিকে উদ্দেশ্য প্রণোদিত হিসেবে দাবি করে তিনি এ জিডি করেন। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয় সাংবাদিক ও সচেতন মহলের মাঝে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

এর আগে ‘৩ হাজার টাকার ফোন উদ্ধারে ৪ হাজার টাকা ঘুষ দাবি’ শিরোনামে বদলগাছী থানা পুলিশের এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ দাবির অভিযোগ তুলে ধরে (১৮ মার্চ) দৈনিক রূপালী বাংলাদেশ পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ করেন সাংবাদিক মিঠু হাসান। সংবাদ প্রকাশের পর অভিযুক্ত এসআইকে নওগাঁ পুলিশ লাইনে ক্লোজ করেন জেলা পুলিশ। তিনি ওই পত্রিকায় বদলগাছী উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত।

প্রকাশিত প্রতিবেদন ও ভুক্তভোগী সাংবাদিক সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ৭ এপ্রিল একটি স্মার্টফোন হারিয়ে যাওয়ার ঘটনায় বদলগাছী থানায় জিডি করেছিলেন বিউটি বেগম নামে এক নারী। চলতি বছরের ১৫ মার্চ বিউটি বেগমের মুঠোফোনে কল করে তাকে থানায় ডেকে নেন আজিজুর নামে এক এসআই। এরপর ফোনটির অবস্থান শনাক্ত হয়েছে জানিয়ে তা উদ্ধারে ৪ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন আজিজুর রহমান। 

পরে পুলিশের ঘুষ দাবির এ বিষয়টি স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে তুলে ধরেন বিউটি বেগম। এরপর বিষয়টি নিয়ে মিঠু হাসানসহ কয়েকজন সাংবাদিক বিভিন্ন প্রিন্ট ও অনলাইন নিউজপোর্টালে সংবাদ প্রকাশিত হলে আলোচনা সৃষ্টি হয়। এ ঘটনা ক্ষতিয়ে দেখতে গঠিত হয় তদন্ত কমিটিও।

এর মাঝেই বদলগাছী থানার ওসি লুৎফর রহমান সংবাদটিকে মিথ্যা ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত হিসেবে দাবি করে ১৮ মার্চ দায়েরকৃত জিডিতে উল্লেখ করেন ‘গত বছর নিহার চন্দ্র নামে এক এসআই মোবাইল হারানোর এই জিডিটি তদন্ত করেছিলেন। আজিজার রহমান নামে কোনো এসআই তার থানায় কর্মরত নেই। তবে এএম আজিজুর রহমান নামে এক পিএসআই তার থানায় কর্মরত আছেন। সাংবাদিক পরিচয়দানকারী মিঠু হাসান সত্যতা যাচাই না করে থানা পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য মিথ্যা নিউজ ফেসবুকে শেয়ার করেছেন। প্রাথমিক তদন্তে এ সংবাদের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। বিষয়টি ভবিষ্যতের জন্য ডায়েরিভুক্ত করা হলো।’

ভুক্তভোগী সাংবাদিক মিঠু হাসান বলেন, একজন পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে তথ্য প্রমাণ যাচাই করেই সংবাদ প্রকাশ করেছি। সংবাদ প্রকাশের পর অভিযুক্ত এসআইকে প্রত্যাহার করা হলো। এই নিউজ আমি ছাড়া আরও কয়েকজন সাংবাদিক প্রকাশ করেছে। অন্য আর কারো নামে জিডি না করে শুধু আমার বিরুদ্ধে জিডি করে আমাকে চাপে ফেলার চেষ্টা করছেন ওসি। এটি স্পষ্টভাবে স্বাধীন সাংবাদিকতাকে ভয় দেখানো এবং দমিয়ে রাখার একটি অপচেষ্টা। এই জিডির মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে কোনো চাপ বা ভয়ভীতি আমাকে সত্য প্রকাশ থেকে বিরত রাখতে পারবে না।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে বদলগাছী থানার ওসি লুৎফর রহমানের ব্যবহৃত সরকারি নম্বরে কল করা হলে তিনি ছুটিতে আছেন বলে জানানো হয়। 

থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নজরুল ইসলাম বলেন, সাংবাদিক মিঠুর বিরুদ্ধে একটি জিডি হয়েছে, এমন কথা আমিও শুনেছি। তবে ওসি স্যার সেটি করেছেন কি না আমার জানা নেই।

নওগাঁ জেলা প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শফিক ছোটন বলেন, পুলিশের মতো দায়িত্বশীল সংস্থার এমন আচরণ গণমাধ্যমের জন্য উদ্বেগজনক ও হুমকিস্বরূপ। সংবাদ প্রকাশের জেরে জিডি করা স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর চাপ সৃষ্টির শামিল। কোনো অভিযোগ থাকলে তা ক্ষতিয়ে দেখা উচিত। সাংবাদিককে ভয় দেখিয়ে নয়। এতে পুলিশের ভাবমূর্তিও প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। তাই এ বিষয়ে দ্রুত স্বচ্ছ তদন্ত এবং ন্যায়সঙ্গত সমাধানের আহ্বান জানান তিনি।

নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, যেকোনো ঘটনায় প্রয়োজনে পুলিশ জিডি করতেই পারে। তবে ওই জিডিতে ভাষাগত ত্রুটি আমরা লক্ষ করেছি। এখানে ব্যক্তির বিরুদ্ধে জিডি করার সুযোগ নেই। ঘটনা সংক্রান্ত বিষয় উল্লেখ করে জিডি করতে হয়। আগামীতে বিষয়টি খেয়াল রাখতে ওসিকে সতর্ক করা হবে।

তিনি বলেন, প্রকাশিত সংবাদ নজরে আসার পরপরই ওই এসআইকে ক্লোজড করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলমান। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থ্যা নেওয়া হবে।