বাঙালির প্রাণের উৎসব নববর্ষ ঘিরে পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার পালপাড়ার নারী-পুরুষ-শিশু সব বয়সি মৃৎশিল্পের কারিগররা এখন ব্যস্ত। সারা বছর মৃৎশিল্পীদের কদর না থাকলেও বৈশাখ উপলক্ষে তারা দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। চৈত্রের শেষ সময়ে মাটির তৈরি খেলনায় শেষ মুহূর্তে রং-তুলির আঁচড় দিচ্ছেন মৃৎশিল্পীরা। যদিও আধুনিকতার ছোঁয়ায় মৃৎশিল্প প্রায় বিলুপ্তির পথে। তবুও বংশগত ঐতিহ্য বা জীবিকার তাগিদে অনেকেই এখনো মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। বছরের অধিকাংশ সময় তাদের তেমন ব্যস্ততা না থাকলেও, বিভিন্ন উৎসবের সময় তাদের ব্যস্ততায় কাটে।
সোমবার (৬ এপ্রিল) সরেজমিন ভাঙ্গুড়া উপজেলার পালপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, রং দিয়ে এবং বিভিন্ন কারুকাজ করে মাটির তৈরি তৈজসপত্র ও খেলনা তৈরি করে সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন পাল পাড়ার মৃৎশিল্পীরা।
মাটির পণ্য তৈরির জন্য মাঠ থেকে মাটি আনা, মাটি নরম করা, ছাঁচ বসানো, চুলায় পোড়ানো, রোদে শুকানো, রং করাসহ প্রায় সব কাজই চলছে। এসব এলাকায় কারিগরদের হাতের ছোঁয়ায় গড়ে উঠছে মাটির পুতুল, রকমারি ফল, হাতি, ঘোড়া, বাঘ, টিয়া, ময়না, ময়ূর, খরগোশ, হাঁস-মুরগি, মাটির ব্যাংক, চায়ের কাপ, পিঠা তৈরির ছাঁচ, নানা জাতের ফুল, হাঁড়ি-পাতিল, কড়াই, বাসন, থালা, বাটি, হাঁস, কলস, মুড়িভাজার ঝাঞ্জুর, চুলা, ফুলের টব, খেলনাসহ মাটির বিভিন্ন তৈজসপত্র।
এসব পণ্যের বাহারি নকশা আর মাটির নিজস্ব গন্ধ ছড়িয়ে দিচ্ছে বৈশাখের আমেজ। মৃৎশিল্প আবহমান গ্রাম-বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য। মৃৎশিল্পের বিভিন্ন উপাদানে গ্রামবাংলার হাসিকান্না, সুখ-দুঃখের রোমাঞ্চকর, মনোমুগ্ধকর ছবি ফুটিয়ে তুলতেন শিল্পীরা। মৃৎশিল্পের একসময় কদর থাকলেও এখন বছরের এই সময় ছাড়া সারা বছর আর তেমন কদর থাকে না। শুধু মেলা এলেই কর্মমুখর হয়ে ওঠে চিরচেনা এই পালপাড়া গ্রাম। বাংলা নববর্ষ ঘিরে তাদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে।
ভাঙ্গুড়া উপজেলার কালিবাড়ী পালপাড়ার মৃৎশিল্পী সাধন চন্দ্র পাল জানান, এখন মাটির জিনিসের কদর নেই। সারা বছর টানাপোড়েনের মধ্যে সংসার চলে। পূর্বপুরুষের কাছ থেকে শেখা কাজের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও শিকড়ের টানে এখনো আঁকড়ে ধরে আছেন এই পেশা। বছরের প্রায় অর্ধেক আয়ের উৎস এই সময়ে অর্ডারের চাপ বেড়েছে কয়েকগুণ। প্লাস্টিক আর স্টিলের ভিড়ে তাদের এই মাটির পণ্য এখনো টিকে আছে শুধু মানুষের ভালোবাসার কারণে।
শিশুদের খেলনার পাশাপাশি মসলা রাখার পাত্র, হাঁড়ি এবং দেয়ালে ঝোলানো শোপিস তৈরি করা নারী শ্রমিক সোমা রানী পাল বলেন, বৈশাখ মাস এলে মেলায় মাটির তৈরি খেলনা ও সামগ্রীর চাহিদা থাকে। চাহিদার সঙ্গে বাড়তি আয়ের সুযোগ থাকায় পুরুষদের পাশাপাশি তারাও কাজ করে থাকেন। মাটির কাজ কষ্টের, কিন্তু নারীরা এটাকে ভালোবেসে করেন।
চলনবিল সাহিত্য সংসদের সভাপতি কবি নুরুজ্জামান সবুজ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, সভ্যতার সূচনাপর্বে মানুষ মৃৎশিল্পের ধারাবাহিক উৎকর্ষের পরিচয় দিয়েছে। এ শিল্প যেমন মানুষের প্রয়োজন মিটিয়েছে, তেমনি নান্দনিকতার ছাপ রেখেছে। ঐতিহ্যের এই শিল্পের প্রতি মানুষের দৃষ্টি দিন দিন কমে যাচ্ছে। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। তা না হলে অচিরেই হারিয়ে যাবে একসময়ের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন