রাজশাহীর তানোরে বিলকুমারী বিলের জমিতে বোরো ধান কাটা-মাড়াইয়ে হিড়িক পড়েছে। বাম্পার ফলন হলেও দামে চরম হতাশ হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। এক মণ ধান বিক্রি করে একজন শ্রমিকের মজুরি হচ্ছে না। জ্বালানি সংকটের দোহাইয়ে মোকাম থেকে আসছে না গাড়ি। এ অজুহাতে সর্বকালের নিম্ন দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন প্রান্তিক চাষিরা।
আলুতে ধরাশায়ী হয়ে ধানেও লোকসান, চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন খাদ্যযোদ্ধারা। অথচ এসব পা-ফাটা কৃষকের রক্ত-ঘামের পরিশ্রমে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। আবার যেসব ধান মাটিতে নুয়ে পড়েছে, সেগুলো কাটতে গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। তবে গত রবিবার থেকে সূর্যের আলো নেই। শ্রমিকদের জন্য অনুকূল আবহাওয়া হলেও বৃষ্টির চিন্তায় দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষকরা। এতে করে ধানের বাজার নিয়ে কৃষি বিপণন বিভাগের জরুরি হস্তক্ষেপ ও মাঠপর্যায় থেকে ধান কেনার জোর দাবি তুলেছেন চাষিরা।
বিলপাড়ের তোফা নামের এক কৃষক জানান, চার বিঘা জমির ধান কাটা হয়েছে। গত রবিবার থেকে সূর্যের দেখা নেই। ধানের দাম প্রকারভেদে ৮০০ টাকা থেকে ৮৫০ টাকা মণ বিক্রি হচ্ছে। সারা দিন একজন শ্রমিকের মজুরি ৯০০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকা। এক মণ ধান বিক্রি করে একজন শ্রমিকের মজুরি হচ্ছে না। এর আগে আলুতে লোকসান, আবার বোরো ধানেও লোকসান। এভাবে চলতে থাকলে কৃষকরা চাষাবাদ ছেড়ে অন্য পেশা বেছে নিতে পারেন।
মুনসুর নামের আরেক কৃষক জানান, দুই বিঘা জমিতে ২৫ মণ করে ৫০ মণ ফলন হয়েছে। তুলনামূলক বাম্পার ফলন, কিন্তু দাম নেই। সাড়ে ৮০০ টাকা মণে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। তেল সংকটের কারণে বহিরাগত শ্রমিক আসতে পারেনি। সে সুযোগে স্থানীয় শ্রমিকরা বেশি মজুরিতে ধান কাটছেন। উপায় নেই, বৈশাখ মাস, কখন ঝড়-বৃষ্টি শুরু হবে বলা যায় না। এজন্য বাড়তি খরচ হলেও ধান কাটতেই হবে। জমিতে তো ধান ফেলে রাখা যাবে না।
তিনি আরও জানান, বিলের নিচু জমির ধান মাটিতে নুয়ে পড়ায় তিন ভাগের এক ভাগ ধান শ্রমিকদের দিতে হচ্ছে। সকাল সাতটা থেকে দুপুর ১২টার আগেই শ্রমিকরা কাজ শেষ করে চলে যায়। আগে একবেলা কাজের জন্য ৫০০ টাকা নিত, এখন ৬০০ টাকা নিচ্ছে। সারা দিন কাজ করলে ১ হাজার টাকা। বহিরাগত শ্রমিক এলে এ সমস্যা হতো না।
আরেক কৃষক ও শ্রমিক শাকির জানান, তিন বিঘা জমি লিজ নিয়ে বোরো চাষ করেছেন। এখন ১০-১২ জন মিলে ধান কাটছেন। ফলন ভালো হলেও দাম না থাকায় লোকসান গুনতে হবে। গত সপ্তাহের ঝড়-বৃষ্টিতে অনেক জমির ধান মাটিতে নুয়ে পড়েছে। ফলে ধান কাটতে বাড়তি শ্রমিক লাগছে এবং খরচও দ্বিগুণ হচ্ছে।
কৃষকরা জানান, শ্রমিক খরচ বেড়েছে, বহন খরচ বেড়েছে, অথচ ধানের দাম নেই। এক মণ ধান বিক্রি করে একজন শ্রমিকের মজুরি হচ্ছে না। আগে এক বিঘা জমির ধান পরিবহনে ৮৫০-১০০০ টাকা লাগত, এখন তেল সংকটে ১৫০০-১৭০০ টাকা লাগছে।
তাদের দাবি, ধানের ন্যায্যমূল্য থাকলে সমস্যা হতো না। ধানের দাম না থাকার কারণে অনেক জায়গায় পুকুর করা হচ্ছে। প্রান্তিক চাষিরা ধান কাটার পরই বিক্রি করতে বাধ্য হন কারণ শ্রমিক, সার ও কীটনাশকের বকেয়া পরিশোধ করতে হয়। অন্যদিকে সচ্ছল কৃষকরা ধান গোলায় রেখে পরে বেশি দামে বিক্রি করতে পারেন।
সরকার ৩৬ টাকা কেজি দরে ধান কেনার কথা থাকলেও কৃষকরা তা দিতে পারছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। গুদামে ধান দিতে গেলে নানা অজুহাত দেখানো হয়—তাপ নেই, ওজন কম, কার্ড ও হিসাব ইত্যাদি সমস্যা দেখানো হয়। কৃষকদের দাবি, স্থানীয় হাট বা ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে সরকার ধান কিনলে তারা উপকৃত হতেন।
উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকায় বিলকুমারী বিল অবস্থিত। এসব এলাকার জমিতে আগাম বোরো আবাদ হয়। বর্তমানে দিন-রাত সমানতালে ধান কাটা, মাড়াই ও বহনে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষক ও শ্রমিকরা।
গত রবিবার থেকে সূর্যের দেখা নেই। গত সপ্তাহে তীব্র তাপমাত্রা থাকলেও শনিবার রাতের বৃষ্টির পর আবহাওয়া শীতল হয়েছে। সকাল-সন্ধ্যায় অনেকে গরম কাপড় পরছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ আহম্মেদ জানান, এ বছর উপজেলায় ১৪ হাজার ১৩০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর জমিতে আগাম বোরো চাষ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন ভালো হয়েছে। বর্তমানে দাম কম থাকলেও সরকারিভাবে ৩৬ টাকা কেজিতে ধান কেনা হবে এবং কৃষকরা কৃষি কার্ডের মাধ্যমে ধান বিক্রি করতে পারবেন।



সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন