ঢাকা শুক্রবার, ০৩ জুলাই, ২০২৬

রাজশাহীতে কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি না হলেও এডিসের বিস্তার উদ্বেগজনক

রাজশাহী ব্যুরো
প্রকাশিত: জুলাই ৩, ২০২৬, ০৪:৩২ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

আষাঢ় মাস পেরোলেও রাজশাহীতে এখনো কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির দেখা নেই। জলাবদ্ধতা তেমন না থাকলেও নগরজুড়ে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ডেঙ্গুবাহী এডিস মশার বিস্তার। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে প্রতিদিনই নতুন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হচ্ছেন। অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রাক-বর্ষা কীটতাত্ত্বিক জরিপে নগরীতে এডিস মশার ঘনত্ব বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্ধারিত ঝুঁকিমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি পাওয়া গেছে। ফলে বর্ষা শুরুর আগেই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সম্ভাব্য ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

রামেক হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার (৩ জুলাই) সকাল পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে দুইজন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন চারজন। জুন মাসের শেষ ২০ দিন এবং জুলাইয়ের প্রথম দুই দিনে মোট ২১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। যদিও এই সময়ে ডেঙ্গুতে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি, তবে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে ১৮ মাস বয়সী এক শিশুসহ তিনজন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।

হাসপাতালের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ধীরে ধীরে রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। মাসের শেষদিকে প্রতিদিনই নতুন রোগী শনাক্ত ও ভর্তি হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। অনেক রোগী চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরলেও ধারাবাহিকভাবে নতুন রোগী ভর্তি হওয়ায় উদ্বেগ কাটছে না চিকিৎসকদের।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মে মাসে পরিচালিত প্রাক-বর্ষা কীটতাত্ত্বিক জরিপে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ব্রেটো ইনডেক্স (বিআই) পাওয়া গেছে ৩০ দশমিক ৬৬। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, এই সূচক ২০-এর বেশি হলে সংশ্লিষ্ট এলাকাকে ডেঙ্গু সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে রাজশাহী এখন উচ্চ ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে।

জরিপে নগরীর ৭৫টি বাড়ির মধ্যে ১৫টিতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে, যা হাউস ইনডেক্সকে ২০ শতাংশে উন্নীত করেছে। একই সঙ্গে পরীক্ষা করা ৫২টি পানিধারণকারী পাত্রের মধ্যে ২৩টিতে লার্ভা শনাক্ত হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক পানির পাত্রই এডিস মশার প্রজননস্থলে পরিণত হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি এখনই নিয়ন্ত্রণে না আনলে বর্ষাকালে ডেঙ্গুর সংক্রমণ কয়েকগুণ বেড়ে যেতে পারে। কারণ বৃষ্টির পানিতে জমে থাকা ছোট ছোট জলাধার এডিস মশার বংশবিস্তারের আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে।

রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য কার্যালয়ের এন্টো-টেকনিশিয়ান আব্দুল বারী বলেন, নিয়মিত নজরদারির অংশ হিসেবে পরিচালিত জরিপে নগরীতে লার্ভা ও পূর্ণবয়স্ক এডিস মশার উপস্থিতি ধারাবাহিকভাবে বাড়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তাই এখন থেকেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।

রাজশাহী জেলা কীটতত্ত্ববিদ উম্মে হাবিবা জানান, বর্তমানে শুধু ড্রেন বা জলাবদ্ধ স্থান নয়, মানুষের অসচেতনতার কারণেও এডিস মশা দ্রুত বংশবিস্তার করছে। জরিপে ফুলের টব, ছাদবাগান, পরিত্যক্ত টায়ার, নারকেলের খোসা, দইয়ের কাপ, শিশুদের খেলনা ও বিভিন্ন পরিত্যক্ত পানিধারণকারী সামগ্রীতে লার্ভা পাওয়া গেছে। এসব স্থানে নিয়মিত পানি জমে থাকায় মশার প্রজনন বাড়ছে।

অন্যদিকে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা শেখ মো. মামুন জানান, বর্ষাকে সামনে রেখে নালা-নর্দমা পরিষ্কার, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা সচল রাখা এবং মশকনিধন কার্যক্রম আরও জোরদার করা হচ্ছে। পাশাপাশি নগরবাসীকেও নিজ নিজ বাসা ও আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, আঙিনা কিংবা আশপাশে তিন দিনের বেশি কোথাও পানি জমতে না দেওয়া, পরিত্যক্ত পাত্র অপসারণ এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই এডিস মশার বিস্তার রোধ করা সম্ভব। অন্যথায় বর্ষার সঙ্গে সঙ্গে রাজশাহীতেও ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।