সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের ধলাই নদীর প্রবল স্রোতে তলিয়ে যাওয়ার দীর্ঘ ১৮ ঘণ্টা পর নিখোঁজ চিকিৎসক সুব্রত সাহা বিকাশের (৩৩) মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এই মরদেহ উদ্ধারে পুলিশের কোনো তৎপরতা বা কৃতিত্ব ছিল না; বরং স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চরম গাফিলতি ও ব্যর্থতাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে স্থানীয় দুই শিশু।
শুক্রবার (৩ জুলাই) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ধলাই নদীর ব্যাংকার এলাকার ৩ নম্বর পিলারের কাছ থেকে ওই দুই শিশুর সহায়তায় মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। নিহত সুব্রত সাহা বিকাশ লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতি উপজেলার মিহির লাল সাহার ছেলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) দুপুরে বন্ধুদের সঙ্গে সাদাপাথরে ঘুরতে এসে জিরোপয়েন্ট এলাকায় ধলাই নদীর উৎসমুখে গোসল করতে নামেন ডা. সুব্রত। এ সময় পাহাড়ি ঢল ও পানির তীব্র স্রোতে তিনি মুহূর্তের মধ্যেই তলিয়ে যান। ঘটনার পরপরই উদ্ধার অভিযানে নামে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ। কিন্তু গতানুগতিক ও দায়সারা অনুসন্ধান চালিয়ে অন্ধকার নেমে আসার অজুহাতে বৃহস্পতিবার রাতেই উদ্ধার কাজ বন্ধ করে দেয় প্রশাসন।
শুক্রবার সকালে যখন পুলিশ ও উদ্ধারকারী দল নদী তীরে কার্যত 'বেখবর' এবং নিষ্ক্রিয় অবস্থায় বসে ছিল, তখন ধলাই নদীতে মাছ ধরতে নামা দুই স্থানীয় শিশু পানির স্রোতে একটি মরদেহ ভাসতে দেখে। পুলিশ বা প্রশাসনের কোনো নজরদারি না থাকায় ওই দুই শিশুই সাহসিকতার সাথে স্রোতের মধ্য থেকে মরদেহটি টেনে তীরে নিয়ে আসে। পরে তাদের চিৎকারে স্থানীয়রা ছুটে এসে পুলিশকে খবর দেয়। ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ কেবল মরদেহের সুরতহাল করার আনুষ্ঠানিকতাটুকু সারে।
নৌকার মাঝি রুবেল মিয়া জানান, সকালে ওই দুই শিশু নদীতে মাছ ধরার সময় প্রথমে পানিতে মানুষের মাথার চুল ভাসতে দেখে। তারা ভয় না পেয়ে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কাছে গিয়ে নিশ্চিত হয় যে এটি একটি মরদেহ। এরপর তারাই মূলত মরদেহটি টেনে তীরের নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসে এবং পুলিশকে খবর দিতে সহায়তা করে। অথচ এই পুরো সময়টাতে ঘটনাস্থলে প্রশাসনের কোনো তৎপরতা ছিল না।
এদিকে, এই ঘটনার পর সিলেটের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র সাদাপাথরে পর্যটকদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্ষা মৌসুমে ধলাই নদীতে পানির তীব্র স্রোত ও ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও প্রশাসন পর্যটকদের সুরক্ষায় কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পর্যটকদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের চরম ব্যর্থতা এবং লাইফ জ্যাকেট বা সতর্কতামূলক সাইনবোর্ডের অভাবই বারবার এমন প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। শুধু তাই নয়, দুর্ঘটনার পর উদ্ধার তৎপরতাতেও পুলিশের চরম সমন্বয়হীনতা ও অবহেলা ফুটে উঠেছে।
কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সফিকুল ইসলাম খান জানান, নিখোঁজ চিকিৎসকের মরদেহ পাওয়া গেছে এবং প্রাথমিক সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে বিনা ময়নাতদন্তে পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে উদ্ধার অভিযানে পুলিশের গাফিলতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
সাদাপাথরের মতো জনাকীর্ণ পর্যটন কেন্দ্রে প্রশাসনের এমন "বেখবর" ও ঠুঁটো জগন্নাথ মার্কা ভূমিকা এবং দুই শিশুর হাতে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাটি স্থানীয় সচেতন মহল ও পর্যটকদের মাঝে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। অনতিবিলম্বে এখানে প্রশাসনিক নজরদারি জোরদার এবং দায়িত্বহীন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।

