ঢাকা শুক্রবার, ০৩ জুলাই, ২০২৬

কাফকা একজন ভয়ংকর প্রেমিক

জুবায়ের দুখু
প্রকাশিত: জুলাই ৩, ২০২৬, ০৪:৪৩ পিএম
ছবিটি এআই দিয়ে বানানো।

১৯১২ সালের সেপ্টেম্বরের এক রাতে চেক লেখক ফ্রানৎস কাফকা এক বসাতেই রচনা করেন তার বিখ্যাত ছোটগল্প ‘দাস উরটাইল’ (বিচার)। গল্পটি নিয়ে তিনি বিশেষভাবে গর্বিত ছিলেন এবং এটি উৎসর্গ করেছিলেন ফেলিস বাউয়ারকে, যার সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল মাত্র ছয় সপ্তাহ আগে।

গল্পটি সদ্য বাগদত্ত এক যুবক ও তার বাবার আবেগগতভাবে বিকৃত সম্পর্ককে কেন্দ্র করে লেখা হয়েছিল। এটি কোনো প্রচলিত প্রেমের নিবেদন ছিল না। কিন্তু বার্লিনের একটি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বাস্তববাদী ও স্বাবলম্বী তরুণী ফেলিস বাউয়ার এবং প্রাগে বসবাসকারী অসুস্থ, যন্ত্রণাক্লিষ্ট কাফকার সম্পর্কও ছিল একেবারেই অপ্রচলিত।

কাফকার চিঠিগুলো ভরা ছিল অমঙ্গলসূচক অনুভূতিতে। তিনি লিখেছিলেন— ‘তুমি আমার কাছ থেকে কখনো অবিমিশ্র সুখ পাবে না; পাবে কেবল ততটুকুই অবিমিশ্র যন্ত্রণা, যতটুকু কেউ কামনা করতে পারে।’

আবার কখনো লিখেছেন— ‘যদি আমরা অস্ত্র ব্যবহার করতে না পারি, তবে এসো অভিযোগের মাধ্যমে আলিঙ্গন করি।’

চিঠির মধ্যেই গড়ে ওঠা এক প্রেম

১৯১২ সালে বন্ধু ম্যাক্স ব্রডের বাড়িতে ফেলিসের সঙ্গে দেখা হওয়ার সময় কাফকা এরই মধ্যে লেখালেখিতে সম্পূর্ণ নিমগ্ন। পাশাপাশি একটি বীমা কোম্পানিতে চাকরি করতেন। দিনের চাকরির কারণে তাকে রাতেই লিখতে হতো।

পরবর্তী পাঁচ বছরে তাদের দেখা হয়েছে খুবই কম। কাফকা প্রায়ই ভ্রমণে যেতে অস্বীকৃতি জানাতেন—কখনো লেখার চাপ, কখনো দুর্বল স্বাস্থ্যের অজুহাতে। ফলে তাদের সম্পর্কের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে চিঠি।

শুরুর দিকে এই দূরত্ব কাফকাকে কষ্ট দিত। তিনি লিখেছিলেন, ‘শুধুমাত্র শব্দ দিয়ে কাউকে ধরে রাখার আশা কীভাবে করা যায়?’

তিনি দিনে প্রায় দু'বার চিঠি লিখতেন। ফেলিস সেই গতিতে উত্তর দিতে না পারলে কাফকা বিচলিত হয়ে পড়তেন। এক চিঠিতে কাফকা লিখতেন, ‘আমার প্রতি তোমার যথেষ্ট হয়েছে; এর আর কোনো ব্যাখ্যা নেই।’

আর পরের চিঠিতেই ক্ষমা চাইতেন, ‘আমার সঙ্গে থাকো, আমাকে ছেড়ে যেও না।’

বিদ্রূপাত্মক ভঙ্গিতে ১৯১৩ সালের নভেম্বরে তিনি লিখেছিলে, ‘এত চিঠির এই পাগলামি বন্ধ করাটাই ঠিক হবে; গতকাল আমি এই বিষয়ে একটি চিঠি লেখাও শুরু করেছি, যা আগামীকাল পাঠাব।’

ভালোবাসা বনাম লেখকসত্তা

ফেলিসকে লেখা কাফকার পাঁচ শতাধিক চিঠিতে ধরা পড়ে এক গভীর দ্বন্দ্ব।

একদিকে তিনি চেয়েছিলেন সংসার, নিরাপত্তা ও ভালোবাসা।

অন্যদিকে ছিল তার নির্জনতা, লেখালেখির প্রতি চরম নিবেদন এবং সৃষ্টিশীলতার প্রতি প্রায় ধর্মীয় নিষ্ঠা।

১৯১২ সালের ১১ নভেম্বরের এক চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ফেলিসের প্রতিদিনের চিঠি তাকে এতটাই অস্থির করে তোলে যে তিনি আর স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারেন না। এমনকি তিনি প্রস্তাব দেন, ‘যদি আমরা আমাদের জীবনকে মূল্যবান মনে করি, তবে এসো আমরা সবকিছু ত্যাগ করি।’

তবুও সম্পর্কটি চলতে থাকে এবং অবশেষে তাদের বাগদান সম্পন্ন হয়।

বাগদান, ভাঙন এবং আত্মসমালোচনা

১৯১৪ সালের গ্রীষ্মে ফেলিসের পরিবার তাদের বাগদান উপলক্ষে একটি সংবর্ধনার আয়োজন করে, যা কাফকার কাছে ছিল ভীষণ অসহনীয়।

নিজের ডায়েরিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘নিজেকে একজন অপরাধীর মতো হাত-পা বাঁধা মনে হচ্ছিল।’

এর কিছুদিন পর বার্লিনের আসকানিশে হফ হোটেলে এক উত্তপ্ত বৈঠকের পর তাদের বাগদান ভেঙে যায়।

পরে লেখা এক দীর্ঘ চিঠিতে কাফকা এই বিচ্ছেদের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্বীকার করেন যে ফেলিস তার লেখকসত্তাকে পুরোপুরি বুঝতে পারেননি। তিনি লিখেছিলেন, ‘তুমি শুধু আমার কাজের সবচেয়ে বড় বন্ধুই ছিলে না; একই সঙ্গে ছিলে তার সবচেয়ে বড় শত্রুও।’

দুই সত্তার সংঘর্ষ

কাফকা নিজের ভেতরে দুটি সত্তার কথা বলেন। একটি মানুষকে ভালোবাসতে চায়, সংসার করতে চায়, ফেলিসের সঙ্গে জীবন কাটাতে চায়। আর অন্যটি চায় শুধুই লিখতে, সারা জীবনের জন্য।

তিনি লিখেছেন, ‘আমার ভেতরে সবসময়ই দুটি সত্তা একে অপরের সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিল এবং এখনো আছে। একটি ঠিক তেমন, যেমন তুমি তাকে দেখতে চাও। অন্যটি কাজ ছাড়া আর কিছুই ভাবে না; তার কাছে এমনকি সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুর মৃত্যুও কেবল কাজের সাময়িক বাধা।’

এই স্বীকারোক্তিই সম্ভবত কাফকার প্রেম ও শিল্পের দ্বন্দ্বের সবচেয়ে নির্মম প্রকাশ।

১৯১৩ সালের এক চিঠিতে কাফকা লিখেছিলেন, ‘লেখার খাতিরে মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ সুখ ত্যাগ করতে বাধ্য বোধ করি।’

এই একটি বাক্য যেন তার সমগ্র জীবনকে ব্যাখ্যা করে।

ভালোবাসা ছিল, কিন্তু লেখালেখির চেয়ে বড় নয়। ফেলিসের প্রতি তার ভালোবাসা গভীর ছিল, কিন্তু সেই ভালোবাসা তাকে তার কঠোর, শৃঙ্খলাবদ্ধ লেখকজীবন থেকে সরিয়ে আনতে পারেনি।

এবং অধ্যায়

১৯১৭ সালে তাদের দ্বিতীয়বার বাগদান হয়। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই কাফকার যক্ষ্মা ধরা পড়ে এবং সম্পর্কের সমাপ্তি ঘটে। পরে ফেলিস অন্যত্র বিয়ে করেন এবং সংসারী হন।

অন্যদিকে, কাফকা জীবনের শেষ কয়েক বছরে আরও কয়েকটি প্রেমের সম্পর্কে জড়ালেও কোনো সম্পর্কই স্থায়ী হয়নি।

১৯২৪ সালে যক্ষ্মায় তার মৃত্যু হয়। জীবদ্দশায় তিনি তেমন স্বীকৃতি পাননি। কিন্তু মৃত্যুর পর প্রকাশিত তার অন্ধকার, রহস্যময় এবং গভীর অস্তিত্ববাদী রচনাগুলো তাকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

১১ নভেম্বর ১৯১২ ফেলিসকে লেখা চিঠি

‘আমাকে সপ্তাহে মাত্র একবার চিঠি লিখো, যাতে তোমার চিঠি রোববারে এসে পৌঁছায়। কারণ আমি তোমার প্রতিদিনের চিঠি সহ্য করতে পারি না।

আমি তোমার একটা চিঠির উত্তর দিই, তারপর আপাত শান্তভাবে বিছানায় শুয়ে থাকি; কিন্তু আমার হৃদয় সারা শরীরে স্পন্দিত হতে থাকে এবং শুধু তোমাকেই অনুভব করে।

আমি তোমার। কিন্তু এই কারণেই জানতে চাই না তুমি কী পরেছ, কিংবা তুমি আমাকে ভালোবাসো কি না। যদি তা জানতাম, তবে কীভাবে অফিসে বসে থাকতাম? চোখ বন্ধ করে প্রথম ট্রেনে উঠে তোমার কাছে চলে যেতাম।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, আমার স্বাস্থ্য কেবল আমার একার জন্যই কোনোমতে যথেষ্ট; বিয়ের জন্য নয়, পিতৃত্ব তো আরও নয়।

তাই যদি আমরা আমাদের জীবনকে মূল্যবান মনে করি, তবে এসো—আমরা সবকিছু ত্যাগ করি।

আমি কি নিজেকে ‘তোমার’ বলে পরিচয় দেব? না। এর চেয়ে বড় মিথ্যা আর কিছু হতে পারে না। আমি চিরকাল নিজের কাছেই শৃঙ্খলিত।’

— ফ্রাঞ্জ

১৯১৪ লেখা আরও একটি চিঠি... 

‘তুমি আমার কাজের আমার উপর যে বিপুল প্রভাব রয়েছে, তা পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারোনি।

আমার ভেতরে দুটি সত্তা ছিল। একটি তোমার হতে চেয়েছিল; অন্যটি শুধু কাজের।

আমার কাজই আমাকে বেঁচে থাকার অধিকার দেয়।

আমি সুখী নই। তবু এই ভেবে শান্তি পাই যে পরিস্থিতি যতটুকু অনুমতি দেয়, আমি আমার কর্তব্য পালন করছি।

ফেলিস, আমার চিঠিতে তোমার যতই আপত্তি থাকুক, তোমাকে উত্তর দিতেই হবে। গত রাতে এমন কিছু মুহূর্ত ছিল যখন আমার মনে হয়েছিল আমি উন্মাদনার সীমা অতিক্রম করেছি।’

— ফ্রাঞ্জ কাফকা