ঢাকা শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬

বিসমিল্লাহর গলদ ও খান সাহেবের দম্ভ

নাফিউল হক
প্রকাশিত: জুন ২৬, ২০২৬, ০৫:৩০ পিএম
ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

ড. সলিমুল্লাহ খানের মতো একজন উচ্চ-নিনাদিত, কেতাবি বিদগ্ধ এবং প্রায়শই ‘আইকনিক’ হিসেবে পুজিত বুদ্ধিজীবী যখন হুট করে কোনো এক জনাকীর্ণ আসরে বা সাক্ষাৎকারে বলে বসেন, ‘শহীদুল জহিরকে প্রথম শ্রেণির দূরে থাক তৃতীয় শ্রেণির লেখকও মনে করি না’, তখন আসলে ধাক্কাটা শহীদুল জহিরের গায়ে লাগে না। ধাক্কাটা লাগে স্বয়ং সলিমুল্লাহ খানের সেই আপাত-নির্মিত রাজনৈতিক-দার্শনিক মহাজাগতিক ইমারতে, যা তিনি বছরের পর বছর ধরে ফুকো, গ্রামশি, ওয়াল্টার বেঞ্জামিন কিংবা আহমদ ছফার নাম জপে জপে খাড়া করেছেন। জহিরকে ‘তৃতীয় শ্রেণির লেখকও না’ বলে খারিজ করে দেওয়ার এই যে চন্ডীপাঠ, তা কোনো সাধারণ সাহিত্যিক মতভিন্নতা বা সমালোচনা নয়। এটা একটা গভীর রাজনৈতিক অপরাধ, একটা হেজিমোনিক বা আধিপত্যকামী প্রাতিষ্ঠানিক দম্ভের বহিঃপ্রকাশ।

​সলিমুল্লাহ খান যখন এই রায়টি দেন, তখন তিনি আসলে কোন গদি থেকে কথা বলছেন? তিনি কি একজন নিস্পৃহ পাঠক? নাকি তিনি সেই ক্ষয়িষ্ণু, বুর্জোয়া, প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান-কারখানার দারোয়ান, যিনি নিজেই নির্ধারণ করতে চান কার লেখার ছাড়পত্র মিলবে আর কার মিলবে না? এই যে ‘শ্রেণি’ নির্ধারণের খেলা—প্রথম শ্রেণি, দ্বিতীয় শ্রেণি, তৃতীয় শ্রেণি—এটা তো খাঁটি আমলাতান্ত্রিক এবং পুঁজিবাদী ভাষা! মার্ক্সবাদের বুলি আউড়ানো একজন তাত্ত্বিকের মুখ থেকে যখন সাহিত্য বিচারের ক্ষেত্রে এইরকম একটা ঘোরতর পেটি-বুর্জোয়া ‘শ্রেণিবিন্যাস’ বা ‘রেটিং সিস্টেম’ বের হয়, তখন বুঝতে হবে তাঁর তাত্ত্বিক জমিটি আসলে কতটা ফাঁপা। শহীদুল জহিরকে এভাবে নাকচ করার মধ্য দিয়ে সলিমুল্লাহ খান নিজের অজান্তেই সেই লিবারেল-কলোনিয়াল নান্দনিকতার পাহারাদার হিসেবে হাজির হয়েছেন, যা বাংলা সাহিত্যের প্রান্তিক, সাবঅল্টার্ন এবং জাদুকরী বাস্তবতায় মোড়া রাজনৈতিক আখ্যানকে সহ্য করতে পারে না। এটি একটি বিশুদ্ধ রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব।

তিনি সবসময় এই ধরনের ‘হাই-কালচারাল’ বা উচ্চ-সংস্কৃতির মাতবরিকে এক হাত দেখে থাকেন। আমাদের কিছু ‘বড়দা’ বা ‘ওস্তাদ’ আছেন, যাঁরা নিজেদের সমস্ত জ্ঞানের একচ্ছত্র পরিবেশক মনে করেন। সলিমুল্লাহ খানের এই আক্রমণটি সেই ‘ওস্তাদ সংস্কৃতির’ এক চরম নিদর্শন। আমি মনে করি জহিরের ভাষা, জহিরের আখ্যান-পদ্ধতি কেন সলিমুল্লাহ খানের মতো একজন গ্র্যান্ড-তাত্ত্বিকের মগজে ঢুকলো না, তার একটা ময়নাতদন্ত দরকার।

​শহীদুল জহির কোনো ড্রয়িংরুমের সাজানো গুছানো লেখক ছিলেন না। তিনি পুরান ঢাকার গলি, ভুতুড়ে মানুষের অবয়ব, সুহাসিনী গ্রামের ডুমুর গাছ, আর ইতিহাসের ট্রমা নিয়ে এমন এক ভাষায় কথা বলেছেন যা কোনো চেনা ছকে বা অ্যাকাডেমিক সিলেবাসের সোজা লাইনে মাপা যায় না। আমাদের দেখতে হবে যে সলিমুল্লাহ খান জহিরকে খারিজ করার মাধ্যমে আসলে কোন শ্রেণিস্বার্থ রক্ষা করছেন। তিনি কি জহিরের সেই সাবঅল্টার্ন মোটিফগুলোকে ভয় পাচ্ছেন? নাকি জহিরের লেখায় যে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, একাত্তরের অমীমাংসিত ক্ষত আর মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা অত্যন্ত সুক্ষ্ম ও জাদুবাস্তব কায়দায় এসেছে, তা সলিমুল্লাহ খানের স্থূল ‘বাইনারি’ বা দ্বিমুখী রাজনৈতিক সমীকরণের সাথে মিলছে না বলে এই উষ্মা? সলিমুল্লাহ খানের রাজনীতি তো সরল লাইনের—সেখানে একপাশে শোষক, অন্যপাশে শোষিত; একপাশে সাম্রাজ্যবাদ, অন্যপাশে প্রতিরোধ। কিন্তু জহির দেখান এই দুইয়ের মাঝখানের ধূসর এলাকাটি, মানুষের ভেতরের জটিল জটিল অন্ধকার কুঠুরি। সলিমুল্লাহ খানের চ্যাপ্টা তাত্ত্বিক কাঠামো জহিরের এই বহুমাত্রিক জটিলতাকে ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছে, আর সেই ব্যর্থতার ক্ষোভ তিনি ঝেড়েছেন জহিরকে ‘তৃতীয় শ্রেণির লেখকও না’ বলে।

​​শহীদুল জহিরকে যারা পড়েছেন, তারা জানেন তাঁর চেয়ে বড় রাজনৈতিক লেখক সমকালীন বাংলা সাহিত্যে কমই জন্মেছেন। অথচ সলিমুল্লাহ খান তাঁকে ছুঁড়ে ফেলছেন আঁস্তাকুড়ে। জহিরের ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ উপন্যাসটির কথাই ধরা যাক। একাত্তরের কোলাবোরেটর বা রাজাকারদের পুনর্বাসন এবং সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বে তার যে সুদূরপ্রসারী ও ভয়াবহ প্রভাব, তা জহির যেভাবে দেখিয়েছেন, তা কোনো তাত্ত্বিক তার দশখানা মোটা বইয়েও দেখাতে পারেননি।

​সলিমুল্লাহ খান নিজেকে এই ক্ষতের এবং এই রাজনীতির সবচেয়ে বড় বিশ্লেষক দাবি করেন। তাহলে জহিরের এই অসামান্য রাজনৈতিক দলিলটি তাঁর চোখে ‘তৃতীয় শ্রেণির’ চেয়েও অধম ঠেকলো কেন? এখানেই লুকিয়ে আছে আসল রাজনীতি। সলিমুল্লাহ খান চান সাহিত্যের মধ্যে রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা। তাঁর কাছে সাহিত্য তখনই ‘প্রথম শ্রেণির’ হবে যখন তা তাঁর নিজের রাজনৈতিক এজেন্ডাকে হুবহু রিপ্রডিউস বা পুনরুৎপাদন করবে। কিন্তু জহির তো তা লেখেননি। জহির লিখেছেন মানুষের রক্তের ভেতরের হাহাকার। জহিরের বাক্যের যে বুনন—কমা দিয়ে দিয়ে বাক্যকে অন্তহীনভাবে টেনে নিয়ে যাওয়া, এক কাল থেকে অন্য কালে, এক চরিত্র থেকে অন্য চরিত্রে অবলীলায় ঢুকে পড়া—তা তো আসলে আমাদের সমাজ ও ইতিহাসের ভাঙাগড়ারই এক নান্দনিক প্রতিফলন। সলিমুল্লাহ খান এই ভাষার রাজনীতি বুঝতে অক্ষম। তিনি ভাষার এই বিনির্মাণকে ধরতে না পেরে একে হয়তো ‘দুর্বোধ্য’ বা ‘অর্থহীন’ মনে করেছেন। এটি তাঁর মেধার সীমাবদ্ধতা, জহিরের সাহিত্যের নয়।

​এবার ​আসুন, সলিমুল্লাহ খানের ব্যবহৃত ‘শ্রেণি’ শব্দটিকে আরও একটু ব্যবচ্ছেদ করি। সাহিত্যের কোনো প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণি হয় কি? কে ঠিক করে এই শ্রেণি? পুঁজিবাদী রাষ্ট্র যেমন মানুষকে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণিতে ভাগ করে রাখে তার অর্থনৈতিক সক্ষমতা অনুযায়ী, সলিমুল্লাহ খানও তেমনি সাহিত্যের এক অলিখিত হাতির দাঁতের মিনার থেকে লেখকদের র‍্যাঙ্কিং করছেন। এই র‍্যাঙ্কিং কালচারটি নিজেই অত্যন্ত প্রতিক্রিয়াশীল এবং জনবিরোধী। তিনি মুখে প্রগতিশীলতার কথা বললেও, তাঁর সাহিত্যিক রুচিটি গড়ে উঠেছে কলোনিয়াল ও ইউরোপীয় আধুনিকতার সেই ছাঁচে, যা নিখাদ দেশজ, আঞ্চলিক এবং নিজস্ব ঘরানার এক্সপেরিমেন্টেশনকে ভয় পায়। শহীদুল জহির তো আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের উত্তরসূরি হয়েও নিজের এক সম্পূর্ণ আলাদা জগত তৈরি করেছিলেন। ইলিয়াসের মহাকাব্যিক বাস্তবতাবাদের বিপরীতে জহির এনেছিলেন এক পরাবাস্তব বা জাদুবাস্তব আবহ, যা লাতিন আমেরিকার জাদুবাস্তবতার সস্তা অনুকরণ নয়, বরং পুরোদস্তুর এই গাঙ্গেয় বদ্বীপের নিজস্ব ভূত-প্রেত, সুবাস আর গন্ধ মাখা। সলিমুল্লাহ খান যখন এই অনন্য মৌলিকতাকে অস্বীকার করেন, তখন তিনি মূলত এই মাটির নিজস্ব নান্দনিক বিকাশের ধারাটিকেই অস্বীকার করেন।

​আমাদের দেশে বুদ্ধিজীবী হওয়াটা একটা দারুণ ফ্যাশন। মাথায় একটা বিশেষ টুপি বা শাল জড়িয়ে, একটু গুম্ফ-শ্মশ্রুশোভিত হয়ে, গম্ভীর গলায় ফরাসি বা জার্মান দার্শনিকদের উদ্ধৃতি দিলে সমাজে একটা সমীহ জাগানো যায়। সলিমুল্লাহ খান এই ইমেজের সবচেয়ে বড় ভোক্তা এবং উৎপাদক। তিনি যখন কোনো বিষয়ে কথা বলেন, তখন তাঁর ভক্তকূল ধরে নেয় এটাই ঈশ্বরের শেষ বাণী। কিন্তু যখন এই বাণীর অন্তসারশূন্যতা ধরা পড়ে শহীদুল জহিরের মতো একজন জেনুইন বা খাঁটি লেখকের মূল্যায়নে, তখন সেই আইকনিক ইমেজের পেছনের কঙ্কালটি বেরিয়ে পড়ে।

​সলিমুল্লাহ খানের অনুসারীরা হয়তো বলবেন, ‘খানের তো নিজস্ব একটা ক্রাইটেরিয়া বা মাপকাঠি আছে, সেই অনুযায়ী তিনি জহিরকে পছন্দ নাও করতে পারেন।’ পছন্দ না করাটা যেকোনো পাঠকের গণতান্ত্রিক অধিকার। আপনি জহিরকে পছন্দ নাও করতে পারেন, তাঁর বই পড়ে আপনার ঘুম আসতে পারে, আপনার বিরক্তি লাগতে পারে—সেটা সম্পূর্ণ আপনার ব্যক্তিগত রুচির ব্যাপার। কিন্তু আপনি যখন একজন পাবলিক বুদ্ধিজীবী হিসেবে জনপরিসরে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেন যে তিনি ‘তৃতীয় শ্রেণির লেখকও নন’, তখন আপনি আর পাঠক থাকেন না; আপনি একজন জল্লাদ হয়ে ওঠেন। আপনি তখন জহিরকে সাহিত্যর ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার এক ফতোয়া জারি করেন। এই ফতোয়াবাজি কোনো প্রগতিশীল রাজনীতির অংশ হতে পারে না। এটি চরম ফ্যাসিবাদী আচরণ। এটি সেই কর্তৃত্ববাদী মানসিকতারই অংশ, যা নিজের পছন্দের বাইরে আর কোনো কিছুর অস্তিত্ব স্বীকার করতে চায় না।

​চলুন, আরও সুনির্দিষ্টভাবে জহিরের টেক্সটের ভেতরে ঢোকা যাক, যা সলিমুল্লাহ খান সম্ভবত তলিয়ে পড়েননি অথবা পড়লেও তাঁর তাত্ত্বিক চশমার কারণে দেখতে পাননি। ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ উপন্যাসে জহির দেখিয়েছেন কীভাবে যুদ্ধের ঠিক পরপরই একাত্তরের ঘাতক-দালালরা আবার সমাজে পুনর্বাসিত হতে শুরু করে। সেখানে মোস্তফা নামের যে চরিত্রটি, তার মায়ের মাংস যেভাবে কাকেরা ঠুকরে খেয়েছিল, সেই ট্রমা মোস্তফা সারাজীবন বয়ে বেড়ায়। জহির যখন লিখছেন- ‘১৯৭১ সালে লক্ষ্মীবাজারে মোস্তফার মা আমেনা বেগমের মাংস যখন কাকেরা খেয়েছিল, তখন সেই কাকদের ওড়ার শব্দে এবং কা-কা রবে মোস্তফার মনে হয়েছিল যে, এই শহরে মানুষের চেয়ে কাকের সংখ্যা বেশি।’

​এই লাইনের ভেতরে যে রাজনৈতিক ও দার্শনিক হাহাকার লুকিয়ে আছে, সলিমুল্লাহ খানের কোনো মোটা তাত্ত্বিক বইয়ে কি তার বিন্দুমাত্র নির্যাস পাওয়া যাবে? এই যে কাকের মাংস খাওয়ার রূপক, এটি তো শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়, এটি গোটা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ট্র্যাজেডির গল্প। রাষ্ট্র যখন তার নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, রাষ্ট্র যখন খুনিদের সাথে আপস করে, তখন সাধারণ মানুষের অবস্থা এই মোস্তফার মতোই হয়। সলিমুল্লাহ খান প্রতি সপ্তাহে টেলিভিশনে বা ইউটিউবে বসে রাষ্ট্রের সমালোচনা করেন, কিন্তু জহির এই রাষ্ট্র ব্যবস্থার ভেতরের পচনটিকে দেখিয়েছেন এক অমোঘ নান্দনিক দক্ষতায়। জহিরকে তৃতীয় শ্রেণির লেখক বলা মানে এই একাত্তরের ট্রমা, এই সাবঅল্টার্ন লড়াই এবং এই অসামান্য শৈল্পিক বয়ানকে অপমান করা।

সলিমুল্লাহ খান যে ভাষায় কথা বলেন, তা এক ধরনের কৃত্রিম, অতি-তাত্ত্বিক এবং সাধু-চলিত-ইংরেজি মেশানো এক অদ্ভুত ডিকশন, যা সাধারণ মানুষের সাথে সংযোগ স্থাপনের জন্য নয়, বরং সাধারণ মানুষকে ‘ইনটিমিডেট’ বা ভয় দেখানোর জন্য তৈরি। এই ভাষা মূলত শ্রোতাকে বোঝাতে চায়—‘আমি তোমার চেয়ে অনেক বেশি জানি, তাই তুমি চুপ করে আমার কথা শোনো।’ অপরদিকে, শহীদুল জহিরের ভাষার দিকে তাকান। জহির লিখছেন সম্পূর্ণ অন্য এক ঢঙে। তাঁর ভাষা অতি-লৌকিক অথচ তীব্র আধুনিক। তিনি পুরান ঢাকার স্থানীয় কথ্য রূপকে এমন এক গদ্যে রূপান্তর করেছেন, যা বাংলা সাহিত্যে এর আগে কেউ দেখেনি। জহিরের বাক্যের দীর্ঘতা আসলে আমাদের জীবনের এবং স্মৃতির যে অন্তহীন বিস্তার, তাকেই ধারণ করে। আমরা যখন স্মৃতিচারণ করি, তখন তো আমরা দাড়ি-কমা মেনে ছোট ছোট বাক্যে ভাবি না; আমাদের স্মৃতি একটা স্রোতের মতো আসে, যেখানে অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। জহির গদ্যের এই মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক দিকটি আবিষ্কার করেছিলেন। সলিমুল্লাহ খান, যিনি নিজেকে ভাষার পণ্ডিত মনে করেন, তিনি জহিরের এই ভাষাগত বিপ্লবকে অনুধাবন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। কারণ তাঁর নিজের ভাষাটি হচ্ছে মৃত, কিতাবি এবং প্রাতিষ্ঠানিক। জহিরের জীবন্ত, বহমান এবং কিছুটা ‘অবাধ্য’ ভাষাকে তাই তাঁর কাছে ‘তৃতীয় শ্রেণি’র মনে হয়েছে, কারণ এই ভাষা সলিমুল্লাহর মতো পণ্ডিতদের তৈরি করা ব্যাকরণের তোয়াক্কা করে না।

কেউ কেউ বলতেই পারেন, একজন লেখক আরেকজন লেখক বা সমালোচক সম্পর্কে মন্তব্য করতেই পারেন, এতে এত শোরগোলের কী আছে? শোরগোল এই কারণেই আছে যে, বাংলাদেশে এখন বুদ্ধিবৃত্তিক ফ্যাসিবাদের এক চরম জয়জয়কার চলছে। এখানে গুটিকয়েক মানুষ নিজেদের সমস্ত জ্ঞান ও সংস্কৃতির একমাত্র ইজারাদার বা ডিসপেনসার মনে করছেন। সলিমুল্লাহ খান যখন জহিরকে এভাবে বাতিল করে দেন, তখন তাঁর অন্ধ অনুসারী তরুণরা জহিরকে না পড়েই ধরে নেয় যে জহির একজন ফালতু লেখক। এর ফলে যা হয়, তা হলো তরুণ প্রজন্মের পাঠাভ্যাস এবং চিন্তার জগতকে একতরফাভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এটি একটি ঘোরতর রাজনৈতিক অপরাধ। খান সাহেব চান তাঁর কথাই হবে শেষ কথা।

শহীদুল জহির কোনো সলিমুল্লাহ খানের সার্টিফিকেটের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকার মতো লেখক নন। জহির টিকে আছেন এবং থাকবেন তাঁর নিজস্ব সৃষ্টির শক্তিতে, তাঁর রাজনৈতিক সততায় এবং তাঁর জাদুকরী গদ্যের সম্মোহনে।

​সলিমুল্লাহ খানের এই মন্তব্য আসলে এক ধরণের ‘মনোটেস্টিক’ বা একত্ববাদী মেধার অহংকার থেকে আসে, যা বহুত্ববাদকে সহ্য করতে পারে না। সাহিত্যে বহু ঘরানা থাকবে, বহু সুর থাকবে। ইলিয়াস থাকবে, জহির থাকবে, হাসান আজিজুল হক থাকবে, আবার একদম ভিন্ন ধারার কবি-লেখকরাও থাকবে। সবাইকে সলিমুল্লাহ খানের থিওরির ছাঁচে পড়তে হবে—এই দাবিটিই তো ফ্যাসিবাদের সাহিত্যিক সংস্করণ। আমাদের এই বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গন থেকে এবার ‘ওস্তাদদের’ বিদায় জানানোর সময় এসেছে। ড. সলিমুল্লাহ খান সাহেব অনেক বড় পণ্ডিত হতে পারেন, তাঁর পঠিত বইয়ের সংখ্যা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে, কিন্তু সাহিত্য ও মানুষের মনস্তত্ত্ব বোঝার ক্ষেত্রে যে ‘এমপ্যাথি’ বা সহমর্মিতা এবং রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি দরকার, তিনি জহির সংক্রান্ত এই মন্তব্যটির মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে তাঁর সেই দূরদৃষ্টির চরম অভাব রয়েছে।

​শহীদুল জহিরকে প্রথম বা তৃতীয় কোনো শ্রেণিতেই বন্দি করা যাবে না। তিনি বাংলা সাহিত্যের এমন এক নিয়মের বাইরে থাকা লেখক, যাঁর লেখার কাছে গিয়ে সলিমুল্লাহ খানের তৈরি সমস্ত কৃত্রিম তাত্ত্বিক কাঠামো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। খান সাহেব তাঁর তাত্ত্বিক মিনারেই বসে থাকুন, আমরা বরং জহিরের সুহাসিনী গ্রাম কিংবা ভূতের গলির সেই অন্তহীন বাক্যের গোলকধাঁধায় হারিয়ে গিয়েই প্রকৃত রাজনৈতিক বাস্তবতার সন্ধান করি।

 

নাফিউল হক
কবি ও শিক্ষার্থী