পার্বত্য প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের প্রতীক শিমুল গাছ আজ হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কায়। রাজস্থলী উপজেলা এলাকায় একসময় পাহাড়-টিলা ও গ্রামাঞ্চলজুড়ে দৃষ্টিনন্দন শিমুল গাছ শোভা পেত। ১২ থেকে ১৮ ফুট কিংবা তারও বেশি উচ্চতার এসব বিশাল গাছ যেন প্রকৃতির নিজস্ব ভাস্কর্য। বসন্ত এলে গাঢ় লাল ফুলে সেজে উঠত চারপাশ, দূর থেকে মনে হতো পাহাড়ে লেগেছে আগুনের আভা।
প্রতিদিন ভোরে শালিক, ফিঙে, ঘুঘু, কাক ও চড়ুইসহ নানা পাখির কলকাকলিতে মুখর থাকত এসব গাছ। যেন পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। ভোরে ঘুম ভাঙাত, সন্ধ্যায় নিস্তব্ধতায় ডুবিয়ে দিত প্রকৃতিকে। পথচারীরাও থমকে দাঁড়িয়ে উপভোগ করতেন আগুনরাঙা ফুলের মেলা।
ঋতুরাজ বসন্তের আগমনে শিমুল গাছে ফুটত নয়নাভিরাম লাল ফুল। সবুজ পাতা আর আমের মুকুলের সঙ্গে মিলেমিশে প্রকৃতি জানিয়ে দিত শীতের বিদায়, ফাগুনের আগমন। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই দৃশ্য এখন অনেকটাই বিরল।
স্থানীয়ভাবে ‘তুলা গাছ’ নামে পরিচিত শিমুল গাছ নির্বিচারে কাটার ফলে আজ বিলুপ্তির পথে। উপজেলা ও বাজার এলাকায় ৫-৭টি বড় গাছ চোখে পড়লেও গ্রামাঞ্চলে আগের মতো আর দেখা যায় না। অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে একের পর এক গাছ কেটে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিন উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে বয়স্ক মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় বাড়ির আনাচে-কানাচে, সরকারি রাস্তার ধারে ও পতিত জমিতে প্রচুর শিমুল গাছ ছিল। গাছে গাছে ফোটা লাল ফুলই ছিল বসন্তের আগমনী বার্তা। আজ কৃষিতে আধুনিকতার ছোঁয়ায় নানা ফুলের দেখা মিললেও চোখধাঁধানো গাঢ় লাল শিমুল ফুল আর তেমন চোখে পড়ে না। পরিবেশবিদদের মতে, শিমুল গাছ ধ্বংস হওয়ায় পরিবেশের ভারসাম্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অনেকেই সংশ্লিষ্ট বিভাগের উদাসীনতাকে দায়ী করছেন।
শিমুল গাছ শুধু সৌন্দর্যের নয়, অর্থনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ থেকে সংগৃহীত তুলা বিক্রি করে কয়েক হাজার টাকা আয় করা সম্ভব। একসময় লেপ, তোশক ও বালিশ তৈরিতে শিমুল তুলার ব্যাপক ব্যবহার ছিল।
চৈত্র মাসের শেষে ফল পুষ্ট হয়ে বৈশাখে শুকিয়ে ফেটে যায়। তুলার সঙ্গে বীজ বাতাসে উড়ে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেয় নতুন চারা। এ ছাড়া শিমুল একটি সুপরিচিত ওষধি গাছ। এর ফুল অনেকেই মাছের সঙ্গে তরকারি হিসেবে খান। পাহাড়ি জনগোষ্ঠী সিদ্ধ করে শুঁটকির সঙ্গে মরিচ মিশিয়েও খেয়ে থাকেন।
শিমুল গাছ উজাড় হওয়ায় পাখিরা হারাচ্ছে তাদের বাসস্থান। ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে পাখির সংখ্যা। যে গাছগুলো একসময় পাখিদের কলতানে মুখর ছিল, আজ সেখানে নীরবতা নেমে এসেছে। এতে প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়ছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, কৃষকের উদাসীনতার পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের অভাবই শিমুল গাছ বিলুপ্তির অন্যতম কারণ।
এলাকাবাসীর দাবি—সরকারি খাসজমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গণ ও বড় বড় রাস্তার ধারে কৃষি বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শিমুল গাছ রোপণের কর্মসূচি গ্রহণ করা হোক। পরিকল্পিতভাবে চারা রোপণ ও সংরক্ষণ করা গেলে আবারও ফিরে আসতে পারে আগুনরাঙা বসন্ত।
শিমুল গাছ কেবল একটি বৃক্ষ নয়, এটি বসন্তের প্রতীক, পাখিদের আশ্রয়, অর্থনৈতিক সম্ভাবনার উৎস এবং গ্রামীণ ঐতিহ্যের অংশ। এখনই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো কেবল গল্পে শুনবে শিমুলের আগুনরাঙা সৌন্দর্যের কথা। পাহাড়ের প্রকৃতি রক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত সচেতনতা, সংরক্ষণ ও পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন