জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭-এ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কর ও শুল্ক সুবিধা ঘোষণার পর আশাবাদ তৈরি হলেও বাস্তবে এসব সুবিধা সীমিত সংখ্যক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ)। সংগঠনটির দাবি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জারিকৃত এসআরও সংশোধন না করা হলে দেশের সৌরবিদ্যুৎ খাতের সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হবে এবং ২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না।
রোববার (১৪ জুন) রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিএসআরইএ'র নেতারা এসব তথ্য জানান।
বিএসআরইএ'র সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ লিখিত বক্তব্যে বলেন, বাজেট-পরবর্তী এসআরও বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঘোষিত সুবিধাগুলো মূলত নির্দিষ্ট কিছু সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এবং রেসকো মডেলে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী কোম্পানির জন্য প্রযোজ্য করা হয়েছে। ফলে আবাসিক, কৃষি (সোলার সেচ) ও ক্ষুদ্র বাণিজ্যিক গ্রাহকসহ বৃহৎ অংশের ব্যবহারকারী এবং খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
তিনি বলেন, দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাজারের বড় অংশ গড়ে উঠেছে আমদানিকারক, পরিবেশক, ডিলার, খুচরা ব্যবসায়ী এবং ইপিসি (ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন) প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। কিন্তু বর্তমান প্রণোদনা কাঠামোয় তাদের জন্য কার্যকর কোনো সুবিধা রাখা হয়নি। এতে খাতসংশ্লিষ্ট হাজারো প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা ও কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বিএসআরইএ জানায়, বর্তমান এসআরও মূলত দেশের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের ২০ থেকে ২২ শতাংশ অংশকে লক্ষ্য করছে, অথচ অধিকাংশ ব্যবহারকারী এর বাইরে রয়ে গেছেন। তাদের মতে, রেসকো মডেল বড় শিল্প গ্রাহকদের জন্য উপযোগী হলেও আবাসিক, কৃষি ও গ্রামীণ গ্রাহকদের জন্য কার্যকর নয়।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সাধারণ মানুষের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে যে সৌর প্যানেল ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং বাজারে দাম কমেছে। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ সৌর পণ্যের ক্ষেত্রে বিদ্যমান শুল্ক ও কর কাঠামোয় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। এতে বাজারে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে এবং ব্যবসায়ীরা অযৌক্তিক চাপের মুখে পড়ছেন।
সংগঠনটি আরও অভিযোগ করে, চলতি বাজেট ও সংশ্লিষ্ট এসআরওতে সোলার ইরিগেশন, সোলার স্ট্রিট লাইট এবং ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (বিইএসএস) খাতের জন্য কার্যকর নতুন কোনো প্রণোদনা দেওয়া হয়নি। দেশে প্রায় ১৭ লাখ ডিজেলচালিত সেচ পাম্প থাকলেও সেগুলোকে সৌরচালিত ব্যবস্থায় রূপান্তরের জন্য সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা বা আর্থিক প্রণোদনার প্রতিফলন বাজেটে নেই।
বিএসআরইএর মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জামের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের ‘ওয়েট-বেইজড অ্যাসেসমেন্ট’ পদ্ধতির পরিবর্তে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘ট্রানজ্যাকশন ভ্যালু’ ভিত্তিক মূল্যায়ন চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়নি। ফলে প্রকৃত আমদানি মূল্যের তুলনায় অতিরিক্ত মূল্যায়নের কারণে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
এ ছাড়া মাউন্টিং স্ট্রাকচার, লিথিয়াম সেল, ব্যাটারি প্যাক ও বিইএসএসের জন্য প্রদত্ত শুল্ক সুবিধা ২০২৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সীমিত রাখার সিদ্ধান্তেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। তাদের দাবি, দেশে এখনো এসব পণ্যের পর্যাপ্ত উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে ওঠেনি। ফলে আগেভাগে সুবিধা প্রত্যাহার করা হলে বিনিয়োগ ও বাজার সম্প্রসারণ ব্যাহত হতে পারে।
বিএসআরইএর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেশের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীর ৬৩ শতাংশই আবাসিক, কৃষি ও ক্ষুদ্র বাণিজ্যিক গ্রাহক। অথচ বর্তমান প্রণোদনা কাঠামোয় তাদের জন্য কোনো প্রত্যক্ষ সুবিধা নেই। একই সঙ্গে স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, পেমেন্ট সিকিউরিটি এবং বিনিয়োগ সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বাজেটে নতুন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।
সংগঠনটি সতর্ক করে বলেছে, বর্তমান এসআরও বহাল থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট পিক (এমডব্লিউপি) সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা অর্জন সম্ভব হবে না; বরং সর্বোচ্চ ২ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট পিক সক্ষমতা অর্জিত হতে পারে।
তবে সকল আমদানিকারক, ইপিসি প্রতিষ্ঠান, ডিস্ট্রিবিউটর এবং খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের জন্য শূন্য শতাংশ কাস্টমস ডিউটি ও কর সুবিধা উন্মুক্ত করা হলে ঢাকা ও বিভাগীয় শহরগুলোর মাত্র ২৫ শতাংশ ছাদ ব্যবহার করেই ২০৩০ সালের মধ্যে ৬ থেকে ৮ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব বলে দাবি করেছে বিএসআরইএ।
সংগঠনটি সোলার মডিউল, ইনভার্টার, ব্যাটারি স্টোরেজ, মাউন্টিং স্ট্রাকচার, ডিসি কেবল, কানেক্টর ও স্মার্ট মিটারসহ সব নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জামের ক্ষেত্রে সমান শুল্ক সুবিধা কার্যকর, অন্তত ১০ বছরের ট্যাক্স হলিডে ও আয়কর অব্যাহতি এবং আবাসিক ও কৃষি গ্রাহকদের জন্য কর সুবিধা উন্মুক্ত করার দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি সোলার ইরিগেশন, সোলার হোম সিস্টেম, রুফটপ সোলার ও বিইএসএসকে জাতীয় অগ্রাধিকার খাত হিসেবে ঘোষণার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিএসআরইএর সভাপতি আরও বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি কোনো নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা নয়; এটি দেশের প্রতিটি নাগরিকের জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই প্রণোদনা কাঠামো অবশ্যই সবার জন্য সমভাবে উন্মুক্ত হতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে বিএসআরইএ'র সিনিয়র সহ-সভাপতি জাহিদুল আলম, সহ-সভাপতি এম এ তাহের, সাধারণ সম্পাদক মো. আতাউর রহমান সরকার রোজেল, পরিচালক (অর্থ) নিতাই পদ সাহা, তোফায়েল আহমেদ, গ্রুপ সি ও সুপারস্টার গ্রুপসহ সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন