আমেরিকা ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে একের পর এক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে। এতে করে গোটা বিশ্বে নানামুখী সংকট তৈরি হয়েছে। এবং বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে দেখা দিয়েছে জ্বালানি তেলের সংকট। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার দেশের সরকারি ও বেসরকারি সকল বিশ্ববিদ্যালয় সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের অস্থিরতার প্রভাবে সরকারের এই সিদ্ধান্তের পর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল পেজে প্রকাশ করা হয়েছে অনলাইন ক্লাসের রুটিন। এতে করে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, তবে কি আবার ফিরে আসছে করোনাকালের মতো পরিস্থিতি?
২০২০ সালে দেশে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন ক্লাস চালু করা হয়। জরুরি পরিস্থিতিতে অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল। প্রায় ছয় বছর পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নতুন এই অনলাইন ক্লাসের রুটিন দেখে সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
গতকাল (৮ মার্চ) রোববার কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। সেখানে শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন ক্লাস পরিচালনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিদ্যুৎ সংরক্ষণসংক্রান্ত সাম্প্রতিক সরকারি নির্দেশনা মেনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ক্লাস ৯ মার্চ থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত অনলাইনে পরিচালিত হবে। তবে ঈদের ছুটির পর নির্ধারিত মিডটার্ম পরীক্ষা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় একাডেমিক কার্যক্রমের প্রস্তুতির জন্য সকল অনুষদ সদস্য ও কর্মকর্তাদের আগামীকাল অফিসে উপস্থিত থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
অনলাইন ক্লাস প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘করোনার সময় দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। এবারও কি তেমন কোনো পরিস্থিতির আভাস দেখা যাচ্ছে? সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ অপচয় হয়, তা বন্ধ করলেই অনেকটা সাশ্রয় সম্ভব। রাজনৈতিক ও দাপ্তরিক কর্মসূচিতেও মিতব্যয়ী হওয়া উচিত। সরকারের এ ধরনের উদাসীনতা জাতির মেরুদণ্ডে আঘাত করেছে। এটি অত্যন্ত নিন্দনীয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা অনেক। শিক্ষালাভকে আরও উন্মুক্ত ও সম্প্রসারিত করা এবং শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে জোর দেওয়া উচিত, যাতে বাংলাদেশ আগামীর বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে। কিন্তু আমরা ভিন্ন ধরনের উদ্যোগ দেখছি। জাতিকে শিক্ষিত করার পরিবর্তে সরকার সংকীর্ণ মানসিকতার পরিচয় দিচ্ছে। এটি হতাশাজনক ও উদ্বেগজনক। তাই আমরা এই পদক্ষেপের নিন্দা জানাই।’
একই চিত্র দেখা গেছে স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশে। আজ (৯ মার্চ) বিকেলে তাদের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অনলাইন ক্লাস ১০ মার্চ থেকে শুরু হয়ে ১৬ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত চলবে।
বিশ্ববিদ্যালয়টি জানিয়েছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ২০২৬ সালের ২৭ মার্চ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।
তাদের ভাষ্য, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের অস্থিরতার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে শুরু করেছে। এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী বলেন, বিশ্বের চলমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি ও জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে উচ্চশিক্ষা খাতে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের কথা বিবেচনায় নিয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় সাময়িকভাবে অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে অনলাইন ক্লাসে নিয়মিত অংশ নেওয়া অনেকের জন্য সহজ নয়। বিশেষ করে গ্রামীণ বা প্রত্যন্ত এলাকায় বসবাসকারী শিক্ষার্থীরা দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগের কারণে সমস্যায় পড়ছেন। অনেকের মতে, অনলাইন ক্লাসে পাঠ্য বিষয় পুরোপুরি বোঝা কঠিন হয়ে যায় এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সরাসরি যোগাযোগের অভাব থাকে।
তিনি আরও বলেন, ক্যাম্পাসে ক্লাস করলে শিক্ষকদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করা যায়। কিন্তু অনলাইনে অনেক সময় নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে ঠিকমতো ক্লাস করা যায় না।
এদিকে বিদ্যুৎ ও শক্তি সংরক্ষণ সংক্রান্ত সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি তাদের একাডেমিক কার্যক্রম ৯ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত বন্ধ থাকবে বলে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে। তবে তারা অনলাইন ক্লাসে ফিরবে কি না সে বিষয়ে এখনো কিছু উল্লেখ করা হয়নি।
মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির এক শিক্ষার্থী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘করোনার সময় আমরা অনলাইনে ক্লাস করেছি, সেটাও আমাদের একটি অভিজ্ঞতা। তবে আমরা সেই অভিজ্ঞতায় আবার ফিরে যেতে চাই না। আমরা চাই সবকিছু স্বাভাবিক থাকুক। আমরা যেন ক্যাম্পাসে বসেই ক্লাস করতে পারি।’
উল্লেখ, হরমুজ প্রণালির বন্ধের কারণে জ্বালানি সংকটে পাকিস্তানও ফের অনলাইন ক্লাসে ফিরছে, এমন খবর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
দেশটির অর্থমন্ত্রী মহম্মদ আওরঙ্গজেব জানিয়েছেন, বর্তমানে পাকিস্তানের কাছে প্রায় ২৫ দিনের পেট্রল-ডিজেলের মজুত রয়েছে, অপরিশোধিত তেলের মজুত রয়েছে ১০ দিনের এবং এলপিজি মজুত রয়েছে ১৫ দিনের। এই পরিস্থিতিতে সরকার জ্বালানি ব্যবহারে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শীঘ্রই পাকিস্তানের বেশিরভাগ সরকারি ও বেসরকারি অফিসের কর্মীদের বাড়ি থেকে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি, স্কুল ও কলেজগুলিতেও অনলাইন পাঠদান শুরু হতে পারে।

