× UCB Sticker Card
শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

রূপালী প্রতিবেদক

প্রকাশিত: জুন ২০, ২০২৬, ১০:৩৬ পিএম

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের আলোকিত মুখ: ফরিদ আহম্মদ রনির অনন্য অভিযাত্রা

রূপালী প্রতিবেদক

প্রকাশিত: জুন ২০, ২০২৬, ১০:৩৬ পিএম

ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

একটি ছবি কখনো কখনো ইতিহাসের দলিল হয়ে ওঠে। একটি মুহূর্ত, একটি অনুভূতি কিংবা একটি সমাজের অদেখা বাস্তবতা ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি হয়ে সময়ের সীমানা অতিক্রম করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যায়। সেই শক্তিশালী মাধ্যমকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছেন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফার, ফটোসাংবাদিক ও লেখক ফরিদ আহম্মদ রনি।

ফেনী জেলার জোয়ার কাছার গ্রামের সহজ-সরল পরিবেশে বেড়ে ওঠা রনির শৈশব থেকেই মানুষ, প্রকৃতি ও সমাজের নানা রূপের প্রতি ছিল গভীর আগ্রহ। সেই আগ্রহই ধীরে ধীরে তাকে নিয়ে যায় ফটোগ্রাফির জগতে। বর্তমানে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে একজন পেশাদার ফটোগ্রাফার ও সাংবাদিক হিসেবে তিনি কাজ করছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি ও সাফল্য অর্জন করলেও তিনি বরাবরই প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকতে পছন্দ করেন। ক্যামেরার সামনে নয়, বরং ক্যামেরার পেছনে থেকেই মানুষের গল্প তুলে ধরাই তার স্বাচ্ছন্দ্যের জায়গা।

ফরিদ আহম্মদ রনির কাছে ফটোগ্রাফি কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব। তার বিশ্বাস, একটি সঠিক ছবি ইতিহাসের সাক্ষী হতে পারে, আবার একটি হারিয়ে যাওয়া মুহূর্ত চিরতরে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। তাই প্রতিটি ফ্রেম ধারণের আগে তিনি গুরুত্ব দেন গভীর পর্যবেক্ষণ, মানবিক সংবেদনশীলতা এবং বাস্তবতার প্রতি দায়বদ্ধতাকে। তাঁর ছবিতে যেমন নান্দনিকতা রয়েছে, তেমনি রয়েছে মানুষের জীবনসংগ্রাম, সংস্কৃতি, পরিবর্তন ও মানবিক সংকটের বাস্তব প্রতিচ্ছবি।

বিশ্বজুড়ে ভ্রমণ তার সৃজনশীলতার অন্যতম উৎস। নতুন দেশ, নতুন মানুষ ও নতুন সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় তাঁকে দিয়েছে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে তিনি ক্যামেরাবন্দি করেছেন অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, যা কেবল দৃশ্য নয়, বরং সময় ও সমাজের জীবন্ত দলিল।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাঁর সবচেয়ে আলোচিত সাফল্য এসেছে বহুভাষিক চিত্রগ্রন্থ ‘প্যারিসের ছবি’ (Images of Paris) প্রকাশের মাধ্যমে। বাংলা, ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় প্রকাশিত এই গ্রন্থটি শুধু একটি ফটোবুক নয়; এটি শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক অনন্য সমন্বয়। প্যারিসের স্থাপত্য, ইতিহাস, শিল্পকলা এবং নগরজীবনের সৌন্দর্যকে নিজের ক্যামেরার ফ্রেমে ধারণ করে তিনি নির্মাণ করেছেন এক ব্যতিক্রমী ভিজ্যুয়াল দলিল।

এই গ্রন্থ আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছে। ফ্রান্সের ঐতিহাসিক গ্রাঁ পালে প্রাসাদে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ‘চেঞ্জ নাউ’ সম্মেলনে ফরিদ আহম্মদ রনি তাঁর ‘প্যারিসের ছবি’ বইটি মোনাকোর যুবরাজ আলবার্ট দ্বিতীয়, ফ্রান্সের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কপ-২১ সম্মেলনের সভাপতি লরেন্ট ফ্যাবিয়াস এবং জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল মেলিসা ফ্লেমিং-এর হাতে তুলে দেন। বিশ্বনেতারা বইটির শিল্পমান ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বের প্রশংসা করেন, যা বাংলাদেশের জন্যও একটি গর্বের অর্জন।

এর আগেও তিনি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং প্যারিসের মেয়র আনে ইদালগোর হাতে সরাসরি এই গ্রন্থ উপহার দেওয়ার সুযোগ লাভ করেন। পরবর্তীতে তাদের দপ্তর থেকে প্রাপ্ত আনুষ্ঠানিক প্রশংসাপত্র রনির সৃজনশীল কাজের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিকে আরও শক্তিশালী করেছে।

‘প্যারিসের ছবি’ গ্রন্থের নেপথ্যেও রয়েছে দীর্ঘ প্রস্তুতি ও নিষ্ঠার গল্প। বিভিন্ন গবেষক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং ফ্রান্স ও বাংলাদেশের বিশিষ্টজনদের পরামর্শ ও অনুপ্রেরণায় তিনি এই প্রকল্পকে বাস্তবে রূপ দেন। ইতোমধ্যে দেশের ও দেশের বাইরের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক এবং আলোকচিত্রী বইটির প্রশংসা করেছেন। তাদের মতে, এটি কেবল একটি শহরের চিত্রায়ণ নয়, বরং দুই দেশের সংস্কৃতির মধ্যে এক সৃজনশীল সেতুবন্ধন।

ফরিদ আহম্মদ রনির আরেকটি উল্লেখযোগ্য অবদান হলো ফ্রান্সে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নামে একটি পাবলিক স্কোয়ার নামকরণের উদ্যোগে তার ভূমিকা। দীর্ঘ প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্যারিসে ‘প্লেস ডু প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস’ নামকরণের বাস্তবায়ন ফ্রান্স–বাংলাদেশ সম্পর্কের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক অধ্যায় হয়ে আছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন, একজন আলোকচিত্রী কেবল ছবি তোলেন না; তিনি সমাজ ও ইতিহাসের সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকতে পারেন।

ফটোসাংবাদিক হিসেবেও তার অভিজ্ঞতা অত্যন্ত সমৃদ্ধ। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ইউরোপজুড়ে শতাধিক আন্তর্জাতিক ইভেন্ট কভার করেছেন তিনি। কান চলচ্চিত্র উৎসব, জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন, চেঞ্জ নাউ সামিট, প্যারিস পিস ফোরাম, ইউনেস্কো ইয়ুথ ফোরাম, ইউরোপিয়ান ইয়ুথ ইভেন্ট এবং ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরামের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক আয়োজনগুলোতে তাঁর উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য।

ক্রীড়া অঙ্গনেও রয়েছে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ। প্যারিস অলিম্পিক ২০২৪, ফ্রেঞ্চ ওপেন টেনিস, প্যারিস ম্যারাথন এবং ব্যালন ডি’অর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের মতো বিশ্বমানের ইভেন্ট তিনি কভার করেছেন। পাশাপাশি প্যারিস ফ্যাশন উইক, প্যারিস কার্নিভাল এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শিল্প প্রদর্শনী কভার করে ইউরোপীয় সংস্কৃতির বৈচিত্র্যময় চিত্রও তুলে ধরেছেন।

প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও তাঁর আগ্রহ লক্ষণীয়। ভিভা টেকনোলজি, প্যারিস এয়ার শো এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সম্মেলন থেকে তিনি নিয়মিত প্রতিবেদন ও আলোকচিত্র প্রকাশ করেছেন। বিশ্ব রাজনীতি, পরিবেশ, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি ও মানবিক বিষয়গুলোকে একইসঙ্গে তুলে ধরার সক্ষমতা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

বর্তমানে ফরিদ আহম্মদ রনি ফেনী ফটোগ্রাফিক সোসাইটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নতুন প্রজন্মের আলোকচিত্রী তৈরিতে এবং ফটোগ্রাফির প্রসারে তিনি নিরলসভাবে কাজ করছেন। তিনি প্রেস ক্লাব ডি ফ্রান্স, রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ), ফটোগ্রাফিক সোসাইটি অব আমেরিকা (পিএসএ) এবং ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব ফটোগ্রাফিক আর্ট (এফআইএপি)-এর সদস্য। এছাড়া বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটির আজীবন সদস্য এবং ঢাকা ফটোগ্রাফার্স ক্লাবের উপদেষ্টা হিসেবেও যুক্ত রয়েছেন।

সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছে তিনি একজন বিনয়ী, কর্মনিষ্ঠ ও মানবিক মানুষ হিসেবে পরিচিত। ব্যক্তিগত প্রচারের চেয়ে কাজকে প্রাধান্য দেওয়াই তার বৈশিষ্ট্য। তার ক্যামেরা যেমন বিশ্বকে দেখেছে, তেমনি বিশ্বও তার ক্যামেরার মাধ্যমে নতুন করে দেখেছে বাংলাদেশকে।

একজন স্বাধীন ফটোগ্রাফার ও সাংবাদিক হিসেবে ফরিদ আহম্মদ রনি আজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে চলেছেন। তার প্রতিটি ছবি, প্রতিটি প্রতিবেদন এবং প্রতিটি সৃজনশীল উদ্যোগ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে বিশ্বদরবারে আরও উজ্জ্বল করে তুলছে। লেন্সের আড়ালে থাকা এই মানুষটির যাত্রা প্রমাণ করে, নিষ্ঠা, সৃজনশীলতা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে একটি ক্যামেরাও হয়ে উঠতে পারে জাতির গর্ব বহনকারী শক্তিশালী মাধ্যম।

Link copied!