একসময় ৫০ কিলোমিটার দূরে থাকা আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা করতে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হতো। ল্যান্ডফোন আসার পর সেই দূরত্ব কিছুটা কমলেও কাছের মানুষের মুখ দেখার সুযোগ ছিল না। পরে মোবাইল ফোনের আগমন বদলে দেয় যোগাযোগের ধরন। প্রথমে কণ্ঠস্বর, তারপর ভিডিও কল- কয়েক সেকেন্ডেই কাতার থেকে আমেরিকা, পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব হলো। স্মার্টফোন যেন গোটা বিশ্বকে এনে দিল হাতের মুঠোয়।
একসময় মনে করা হয়েছিল, প্রযুক্তি দূরত্ব কমাবে এবং ‘বসুধৈব কুটুম্বকমমের’ ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রেই মানুষকে আপনজনদের থেকে আরও দূরে ঠেলে দিচ্ছে। পরিবারের সদস্যরা একই ছাদের নিচে থেকেও অনেক সময় নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের বদলে ডুবে থাকছেন মোবাইলের পর্দায়। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে বয়স্ক, শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের ওপর।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মনে করছে, একাকিত্ব বর্তমানে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় হুমকি। সংস্থাটির মতে, একাকিত্ব মানুষের মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায়। চিকিৎসকদের মূল্যায়নে দেখা গেছে, দীর্ঘস্থায়ী একাকিত্ব স্বাস্থ্যের জন্য এমন ক্ষতিকর, যা দিনে ১৫টি সিগারেট ধূমপানের সমতুল্য।
এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি আন্তর্জাতিক কমিশন গঠন করেছে (হু)। কমিশনে রয়েছেন মার্কিন চিকিৎসক ডা. বিবেক মুর্তি, আফ্রিকার যুবনেত্রী এমপেম্বাসহ বিভিন্ন দেশের মোট ১১ জন বিশেষজ্ঞ, আইনপ্রণেতা ও নীতিনির্ধারক।
আগামী তিন বছর ধরে কমিশনটি একাকিত্ব নিয়ে আরও গবেষণা চালাবে এবং এর কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোভিড-১৯ মহামারির পর থেকে বিশ্বজুড়ে একাকিত্বের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ডা. মুর্তির মতে, একাকিত্বের ক্ষেত্রে বয়স কোনো নির্ধারক বিষয় নয়; যে কোনো বয়সের মানুষ এ সমস্যার শিকার হতে পারেন।
তার ভাষায়, একাকিত্বের কারণে যে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়, তা দিনে ১৫টি সিগারেট ধূমপানের ক্ষতির সমান। এমনকি স্থূলতা বা শারীরিক ব্যায়ামের অভাবজনিত সমস্যার তুলনাতেও একাকিত্বের প্রভাব অনেক বেশি হতে পারে।
অনেকের ধারণা, একাকিত্ব মূলত উন্নত দেশগুলোর সমস্যা। তবে ডা. মুর্তি জানিয়েছেন, অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। এসব দেশে প্রতি চারজন বয়স্ক মানুষের মধ্যে একজন একাকিত্বের সমস্যায় ভুগছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়স্কদের মধ্যে একাকিত্ব ডিমেনশিয়া ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। অন্যদিকে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব অত্যন্ত গুরুতর হতে পারে। বিশ্বব্যাপী ৫ থেকে ১৫ শতাংশ কিশোর-কিশোরী একাকিত্বে ভুগছে। আফ্রিকায় এ হার ১২.৭ শতাংশ, আর ইউরোপে ৫.৩ শতাংশ।
গবেষকদের মতে, স্কুলজীবনে যারা একাকিত্বে ভোগে, উচ্চশিক্ষায় তাদের পিছিয়ে পড়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। এর নেতিবাচক প্রভাব অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও পড়তে পারে। একাকিত্বে আক্রান্ত কিশোর-কিশোরীরা পরবর্তী সময়ে পেশাজীবনে নানা সমস্যার সম্মুখীন হন। তারা নিজেদের কাজ নিয়ে কম সন্তুষ্ট থাকেন এবং কর্মক্ষমতাও তুলনামূলকভাবে কম হয় বলে (হু)-এর বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, একাকিত্ব কেবল মানসিক নয়, শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্যও একটি বড় ঝুঁকি। তাই প্রযুক্তির যুগে ভার্চুয়াল সংযোগের পাশাপাশি বাস্তব মানবিক সম্পর্ক ও সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন