আপনি কি কখনো ভাবতে পেরেছেন, ছুটি মানেই শুধু অ্যাডভেঞ্চার নয়- হতে পারে একটানা আরামের ঘুমও? হ্যাঁ, সময় বদলেছে। ঘুমকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে ভ্রমণের নতুন এক ধারার নাম ‘স্লিপ ট্যুরিজম’ বা ঘুম পর্যটন, যেখানে ছুটির মূল উদ্দেশ্যই হলো মানসিক ও শারীরিকভাবে বিশ্রাম নেওয়া, ভালো ঘুমিয়ে ফিরে আসা।
স্লিপ ট্যুরিজম মূলত এমন এক ভ্রমণধারা, যেখানে ভ্রমণকারীরা এমন হোটেল বা গন্তব্য খোঁজেন, যেগুলো ঘুমের অভিজ্ঞতা উন্নত করার জন্য বিশেষ সুবিধা দেয়। যেমন স্মার্ট ম্যাট্রেস, ওজনযুক্ত কম্বল, বালিশের মেন্যু, অ্যারোমাথেরাপি, ঘুম থেরাপি, সাদা শব্দ মেশিন ও ব্ল্যাকআউট পর্দার মতো নানা আরামদায়ক ব্যবস্থা।
গত বছর হিল্টনের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মানুষ এখন ভ্রমণকে বিশ্রামের মাধ্যম হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। মহামারির পর মানুষের মধ্যে ঘুম ও সুস্থতা নিয়ে সচেতনতা বেড়েছে, আর সেই সঙ্গেই জনপ্রিয়তা পেয়েছে স্লিপ ট্যুরিজম। অতিরিক্ত চাপ, ঘুমের ঘাটতি ও মানসিক ক্লান্তি মানুষকে বিশ্রামমুখী করে তুলছে।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এখন অনেক হোটেল ঘুমবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে আগ্রহী। ইতালির রোম ক্যাভালিরি হোটেলে রয়েছে বালিশ নির্বাচন সুবিধা; ইন্দোনেশিয়ার কনরাড বালিতে পাওয়া যায় দোল ঘুম থেরাপি; নিউ ইয়র্কের দ্য বেঞ্জামিন রয়েল সোনেস্টায় রয়েছে ঘুমের বিশেষ কিট, সঙ্গীত ও থেরাপি। এমনকি বার্ন (সুইজারল্যান্ড), লুক্সেমবার্গ ও টালিন (এস্তোনিয়া) শহরগুলো ঘুমবান্ধব সুযোগ-সুবিধার কারণে শীর্ষস্থানে রয়েছে।
ঘুমের এই অভিজ্ঞতা এখন বিভিন্ন থেরাপি প্রোগ্রামের মাধ্যমেও আরও বিস্তৃত হচ্ছে। যেমন মালদ্বীপের সোনেভা রিসোর্টে ৭ বা ১৪ দিনের ‘সোনেভা সোল’ স্লিপ প্রোগ্রাম চালু আছে।
ইতালির লেফে রিসোর্টে চায়নিজ মেডিসিন অনুসারে আকুপাংচার থেরাপি দেওয়া হয়, আর শ্রীলঙ্কার সান্তানি ওয়েলনেস রিসোর্টে আয়ুর্বেদিক ঘুম থেরাপি চালু আছে।
শুধু রিসোর্টেই নয়, বিলাসবহুল হোটেল চেইনগুলোও ঘুমবান্ধব প্রোগ্রাম চালু করছে। সিক্স সেন্সেস হোটেল চেইন ঘুমকে কেন্দ্র করে থেরাপি, পরামর্শ ও আরামদায়ক পরিবেশে ভ্রমণকারীদের ঘুমের মান বাড়াতে সহায়তা করছে।
ঘুম পর্যটনের চাহিদা শুধু জনপ্রিয়তাই পায়নি, বাজারও তৈরি হয়েছে। এইচটিএফ মার্কেট ইন্টেলিজেন্স- এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে ঘুম পর্যটনের বাজার ৮ শতাংশ হারে বাড়বে এবং এর বাজারমূল্য ৪০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাবে।
এই ধারাটি প্রমাণ করে যে, ঘুম একটি বিলাস নয়- এটি প্রয়োজন। এমনকি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘুম বিশেষজ্ঞ রেবেকা রবিন্সের গবেষণায় দেখা গেছে, হোটেলে ভালো ঘুম হলে অতিথিরা সেখানে আবার ফিরে যেতে চান। অর্থাৎ, ভালো ঘুমের অভিজ্ঞতা হোটেল ব্যবসার দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এই ঘুমের ছুটির স্বাদ শুধু ভ্রমণেই সীমাবদ্ধ নয়। বাড়িতেও স্লিপ ট্যুরিজমের অভিজ্ঞতা আনা সম্ভব। যেমন- সন্ধ্যায় উজ্জ্বল আলো এড়িয়ে চলা, ঘর ঠান্ডা রাখা, ব্ল্যাকআউট পর্দা ব্যবহার, আরামদায়ক বিছানা তৈরি করা, ধ্যান বা হালকা ব্যায়াম করা, এবং প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া।
আসলে, ছুটি এখন শুধু বাইরে ঘুরে বেড়ানো নয়, বরং নিজের ভেতরকে পুনরুজ্জীবিত করার সময়। স্লিপ ট্যুরিজম তাই শুধু নতুন এক ভ্রমণধারা নয়, বরং আধুনিক জীবনের ক্লান্তি থেকে মুক্তির উপায়।
আপনার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে মতামত লিখুন