আকাশছোঁয়া দ্রব্যমূল্য আর সীমিত আয়ের টানাপোড়েনে দেয়ালে পিঠ ঠেকেছে সাধারণ মানুষের। বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য ‘পহেলা বৈশাখ’ দোরগোড়ায় কড়া নাড়লেও মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তের মনে আগের সেই স্বস্তি নেই। উৎসবের আনন্দ এবার বাজারের ফর্দ মেলাতেই কর্পূরের মতো উবে যাচ্ছে।
পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের উৎসব হলেও বর্তমান বাজার পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তের জন্য এটি এখন বড় এক চ্যালেঞ্জ।
বাজারের আগুনে পুড়ছে পান্তা-ইলিশের স্বপ্ন
এক সময় পহেলা বৈশাখ মানেই ছিল পান্তা-ইলিশের ধুম। কিন্তু বর্তমান বাজারে ইলিশ যেন সাধারণ মানুষের জন্য ‘সোনার হরিণ’। আকারভেদে এক জোড়া ইলিশের দাম মধ্যবিত্তের মাসিক বাজারের বাজেটের সমান। শুধু মাছ নয়, চাল, ডাল, পেঁয়াজ থেকে শুরু করে প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী। রমজানের ধকল কাটিয়ে ওঠার আগেই বৈশাখী কেনাকাটা যেন মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এক কর্মজীবী আক্ষেপ করে বলেন, “গত বছরও ছেলে-মেয়ের জন্য নতুন পোশাক আর ঘরে ভালো খাবারের আয়োজন করেছিলাম। এবার ঘর ভাড়ার টাকা জমিয়ে উৎসব করা বিলাসিতা ছাড়া আর কিছু নয়। ইলিশ তো দূরের কথা, সাধারণ রুই মাছ কিনতেই এখন হিমশিম খেতে হচ্ছে।”
কাপড়ের দোকানে কেবলই দীর্ঘশ্বাস
পহেলা বৈশাখের চিরচেনা লাল-সাদা পোশাকের বাজারেও মন্দা ভাব। কাপড়ের দাম গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে বলে অভিযোগ ক্রেতাদের। রাজধানীর ফুটপাত থেকে শুরু করে শপিং মল-সবখানেই ভিড় থাকলেও বিক্রির হার কম। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের অভিভাবকরা নিজেদের শখ বিসর্জন দিয়ে কেবল সন্তানের জন্য একটি জামা কিনতেই শেষ সম্বলটুকু খরচ করছেন।
ফিকে হচ্ছে লোকজ মেলা
বৈশাখী মেলার মাটির পুতুল, বাঁশি কিংবা নাগরদোলার সেই পুরনো আমেজও এখন ব্যয়বহুল। মেলায় ঘুরতে যাওয়া মানেই পকেটে টান পড়া। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এখন উৎসবে বাইরে যাওয়ার চেয়ে ঘরে বসে অতি সাধারণ আয়োজনে দিনটি পালনের পরিকল্পনা করছে। অনেকে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে আবেগ প্রকাশ করে বলছেন- “উৎসবের রঙ এখন কেবল ধনীদের জন্য, আমাদের জন্য এটি শুধুই ক্যালেন্ডারের পাতা পরিবর্তন।”
অস্তিত্ব সংকটে ঐতিহ্য
আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান যখন পাহাড়সম, তখন উৎসবের চেয়ে জীবন বাঁচানোই বড় হয়ে দাঁড়ায়। অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতির এই লাগামহীন দৌড় সাধারণ মানুষের সাংস্কৃতিক স্বত্বায় আঘাত হানছে। উৎসব যদি কেবল সামর্থ্যবানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তবে বাঙালির এই চিরায়ত মিলনমেলা অদূর ভবিষ্যতে প্রাণহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।


