ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

মদ্যপান না করেও মাতাল হওয়ার কারণ খুঁজে পেলেন গবেষকেরা

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জানুয়ারি ১০, ২০২৬, ০৯:৫০ পিএম
ইথানল-উৎপাদনকারী ব্যাকটেরিয়া এসচেরিচিয়া কোলাই। ছবি- সংগৃহীত

ভাবুন এমন একজন মানুষের কথা, যিনি বছরের পর বছর মদের দোকানের ধারেকাছেও যাননি। অথচ ভাত, রুটি বা আলুর মতো সাধারণ খাবার খাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই তার কথা জড়িয়ে যায়, চোখ লাল হয়ে ওঠে, হাঁটাচলায় ভারসাম্য নষ্ট হয়। আশপাশের মানুষ ধরে নেয়, তিনি নিশ্চয়ই মদ্যপান করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন—এই ‘মাতলামি’ কোনো বোতল থেকে নয়, বরং তৈরি হচ্ছে তার নিজের শরীরের ভেতরেই।

অটোব্রুয়ারি সিনড্রোম (এবিএস) নামে পরিচিত এই বিরল ও বিরক্তিকর শারীরিক অবস্থার জন্য গবেষকেরা দীর্ঘদিন ধরে অন্ত্রের অতিরিক্ত ছত্রাক বা ফাঙ্গাসকে দায়ী করে আসছিলেন। তাঁদের ধারণা ছিল, ছত্রাক শর্করাজাতীয় খাবারকে গাঁজন প্রক্রিয়ায় অ্যালকোহলে রূপান্তর করে। 

চিকিৎসা বিজ্ঞানে এই বিরল ও রহস্যময় অবস্থাটির নাম ‘অটো-ব্রুয়ারি সিনড্রোম’ (Auto-Brewery Syndrome)। দীর্ঘদিন ধরে এটি চিকিৎসকদের কাছেও এক ধাঁধার মতোই ছিল। ২০১৯ সালের একটি যুগান্তকারী গবেষণাপত্রে প্রথমবার দেখা যায়, কিছু ক্ষেত্রে অ্যালকোহল উৎপাদনকারী ব্যাকটেরিয়াও এর জন্য দায়ী হতে পারে। তবে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি যুগান্তকারী গবেষণা এই অদ্ভুত রোগের প্রকৃত কারণ উদঘাটন করেছে, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গিতেই বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

পুরোনো ধারণা ভেঙে দিল নতুন গবেষণা

উনিশ শতকের শেষভাগ থেকেই চিকিৎসা সাহিত্যে অটো-ব্রুয়ারি সিনড্রোমে আক্রান্ত রোগীদের বর্ণনা পাওয়া যায়। এতদিন পর্যন্ত চিকিৎসকদের ধারণা ছিল, অন্ত্রে অতিরিক্ত ছত্রাক বা ফাঙ্গাস শর্করা গাঁজন করে অ্যালকোহল তৈরি করে, আর সেখান থেকেই রোগীরা মাতাল হয়ে পড়েন।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ‘নেচার মাইক্রোবায়োলজি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় গবেষণাটি সেই পুরোনো ‘ছত্রাক তত্ত্ব’ কার্যত বাতিল করে দিয়েছে। গবেষকরা নিশ্চিত করেছেন, এই রোগের মূল কারণ আসলে কিছু নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়া, যেগুলো অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে শরীরের ভেতরেই ইথানল বা অ্যালকোহল তৈরি করতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, অটো-ব্রুয়ারি সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের অন্ত্রে উচ্চমাত্রায় পাওয়া যায় ক্লেবসিয়েলা নিউমোনিয়া এবং এশেরিকিয়া কোলাই (ই. কোলাই) নামের ব্যাকটেরিয়া। এরা শর্করা জাতীয় খাবারকে দ্রুত ফারমেন্ট করে বিপজ্জনক মাত্রার অ্যালকোহলে রূপান্তরিত করে।

‘ছত্রাক নয়, ব্যাকটেরিয়াই আসল হোতা’

বেইজিংয়ের ক্যাপিটাল ইনস্টিটিউট অব পেডিয়াট্রিক্সের মাইক্রোবায়োলজিস্ট জিং ইউয়ান বলেন, ‘এই গবেষণা কয়েক দশক ধরে প্রচলিত ছত্রাক-ভিত্তিক ব্যাখ্যাকে চূড়ান্তভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এটি স্পষ্ট যে, সমস্যাটি মূলত ব্যাকটেরিয়াজনিত ইথানল ফারমেন্টেশনের ফল।’

অন্যদিকে, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট বের্ন্ড শ্নাবল বলেন, ‘এই রোগটি আক্রান্ত ব্যক্তি ও তার পরিবারের জন্য ভয়াবহ মানসিক ও সামাজিক সংকট তৈরি করে। অনেক সময় চিকিৎসকরাও বিশ্বাস করতে চান না যে রোগীরা মদ্যপান করেননি।’

সামাজিক অপবাদ থেকে চাকরি হারানোর ভয়

এই রোগের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো এর সামাজিক পরিণতি। দিনের বেলায় ‘মাতাল’ থাকার অভিযোগে অনেক রোগী চাকরি হারিয়েছেন। কেউ কেউ পরিবার ও সমাজে চরম অপমানের শিকার হয়েছেন।

গবেষণায় এমন এক তরুণীর কথাও উঠে এসেছে, যিনি কেবল গ্লুকোজ গ্রহণ করার পরই এতটাই মাতাল হয়ে পড়েছিলেন যে পক্ষাঘাতগ্রস্তের মতো মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। চিকিৎসকরা কড়া পর্যবেক্ষণে পরীক্ষা চালিয়ে দেখেন, কোনো ধরনের মদ্যপান ছাড়াই তার রক্তে অ্যালকোহলের মাত্রা বিপজ্জনক সীমা অতিক্রম করেছে।

লিভারের জন্য মারাত্মক হুমকি

গবেষকদের মতে, সুস্থ মানুষের অন্ত্রেও খুব অল্প পরিমাণে অ্যালকোহল তৈরি হয়, যা শরীর সহজেই সামাল দিতে পারে। কিন্তু অটো-ব্রুয়ারি সিনড্রোমে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে অন্ত্রে এমন এক ব্যাকটেরিয়াল ‘ককটেল’ তৈরি হয়, যা নিয়মিতভাবে উচ্চমাত্রার অ্যালকোহল উৎপাদন করে।

এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে লিভার ক্ষতি, এমনকি লিভার সিরোসিস পর্যন্ত হতে পারে—যা সাধারণত দীর্ঘদিনের মদ্যপানকারীদের মধ্যেই দেখা যায়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এসব রোগী জীবনে কখনো মদ্যপানই করেননি।

চিকিৎসায় আসছে নতুন দিগন্ত

বর্তমানে এই রোগে আক্রান্তদের অ্যান্টিবায়োটিক ও অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধের পাশাপাশি চিনি ও শর্করা জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য একটাই—অ্যালকোহল উৎপাদনকারী অণুজীবগুলোর খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করা।

তবে নতুন এই গবেষণার ফলে বিজ্ঞানীরা আশাবাদী যে, ভবিষ্যতে অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের বিপাক প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে আরও কার্যকর ও নির্দিষ্ট চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবন করা সম্ভব হবে।

হঠাৎ করে মাতাল হয়ে পড়ার অজানা আতঙ্কে বছরের পর বছর যারা ভুগেছেন, তাদের জন্য বিজ্ঞানের এই নতুন আবিষ্কার এক বড় স্বস্তি এবং আশার আলো হয়ে উঠতে পারে।