ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

মূত্রনালিতে পাথর: কারণ, লক্ষণ ও আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: এপ্রিল ২৯, ২০২৬, ০১:৫১ পিএম
মূত্রনালিতে পাথর: কারণ, লক্ষণ ও আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা। ছবি : সংগৃহীত

দেহের বর্জ্য নিষ্কাশন প্রক্রিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মূত্রনালি। কিন্তু বিভিন্ন কারণে এই নালিতে খনিজ পদার্থ জমে পাথরের মতো শক্ত দানা তৈরি করতে পারে, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘ইউরিনারি স্টোন’ নামে পরিচিত। সময়মতো চিকিৎসা না করালে এটি কিডনির মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

মূত্রনালিতে পাথর (Urinary Tract Stones) বর্তমানে একটি অত্যন্ত সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা। খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে অনেকেই এই যন্ত্রণাদায়ক সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন।

মূত্রনালিতে পাথর হওয়ার প্রধান কারণসমূহ
বিশেষজ্ঞদের মতে, মূলত প্রস্রাব যখন ঘন হয়ে যায়, তখন খনিজ পদার্থগুলো দানা বাঁধতে শুরু করে। এর প্রধান কিছু কারণ হলো:

পর্যাপ্ত পানি পান না করা: শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পানি পান না করলে প্রস্রাব ঘন হয়ে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

অতিরিক্ত লবণ ও প্রোটিন গ্রহণ: খাবারে অতিরিক্ত লবণ (সোডিয়াম) এবং রেড মিট বা প্রাণিজ প্রোটিন পাথরের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

বংশগত কারণ: পরিবারের কারো এই সমস্যা থাকলে অন্যদের হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

ইউরিন ইনফেকশন: বারবার মূত্রনালিতে সংক্রমণ (UTI) পাথরের সৃষ্টি করতে পারে।

মেটাবলিক রোগ: শরীরে ক্যালসিয়াম বা ইউরিক অ্যাসিডের ভারসাম্য নষ্ট হলে পাথর হয়।

পাথর হওয়ার লক্ষণসমূহ
পাথর মূত্রনালির কোথায় অবস্থান করছে এবং এর আকার কত বড়, তার ওপর ভিত্তি করে লক্ষণ ভিন্ন হতে পারে:

১. তলপেটে বা কোমরের দুই পাশে তীব্র ব্যথা যা কুঁচকি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

২. প্রস্রাব করার সময় জ্বালাপোড়া বা প্রচণ্ড ব্যথা।

৩. প্রস্রাবের রঙ লালচে বা গোলাপি হওয়া (রক্তের উপস্থিতি)।

৪. প্রস্রাব করতে গিয়ে বারবার বেগ হওয়া কিন্তু পর্যাপ্ত না হওয়া।

৫. বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া।

৬. সংক্রমণ থাকলে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসা।

ঘরোয়া প্রতিকার ও প্রতিরোধ
প্রতিরোধই হলো এই সমস্যার সেরা সমাধান। এর জন্য করণীয়:

প্রচুর পানি পান: দৈনিক অন্তত ৩-৪ লিটার পানি পান করতে হবে যাতে প্রস্রাব পরিষ্কার থাকে।

লবণ নিয়ন্ত্রণ: পাতে বাড়তি লবণ খাওয়ার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে।

সাইট্রাস ফল: লেবু বা কমলালেবুর রস পান করা উপকারী, কারণ এতে থাকা সাইট্রেট পাথর জমতে বাধা দেয়।

ক্যালসিয়াম ও অক্সালেট: অতিরিক্ত অক্সালেট সমৃদ্ধ খাবার (যেমন: পালং শাক, বিট, চকোলেট) পরিমিত খাওয়া উচিত।

আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা
পাথরের আকার ও অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা নেওয়া হয়:

ওষুধ: পাথরের আকার ছোট (৫ মিমি-এর কম) হলে প্রচুর পানি ও নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের মাধ্যমে তা প্রস্রাবের সাথে বের করে দেওয়া সম্ভব।

লিথোট্রিপসি (ESWL): কোনো অস্ত্রোপচার ছাড়াই বাইরে থেকে শক ওয়েভ দিয়ে পাথর ভেঙে গুঁড়ো করে দেওয়া হয়।

ইউরেটারোস্কোপি (URS): লেজার রশ্মি ব্যবহার করে নালির ভেতর থেকেই পাথর ধ্বংস করা হয়।

অস্ত্রোপচার: পাথর খুব বড় হলে বা জটিল জায়গায় থাকলে ল্যাপারোস্কোপিক বা ওপেন সার্জারির প্রয়োজন হতে পারে।

প্রস্রাবের রঙ পরিবর্তন বা অসহ্য ব্যথা অনুভূত হলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের (ইউরোলজিস্ট) শরণাপন্ন হতে হবে। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার মাধ্যমে কোনো জটিলতা ছাড়াই এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।