ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থিতা বাতিলের বিরুদ্ধে আপিল শুনানিতে ব্যাপকভাবে ঝরে পড়ছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। প্রার্থিতা বাতিলের প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে— এক শতাংশ ভোটারের সমর্থন তালিকায় গরমিল, হলফনামায় ত্রুটি, ঋণ বা বিল খেলাপি থাকা, নির্ধারিত ফরম্যাটে তথ্য দাখিল না করা, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ জমা না দেওয়া এবং মামলা সংক্রান্ত তথ্য গোপনের অভিযোগ। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রার্থিতা বাছাইয়ের তালিকা বিশ্লেষণে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারা দেশে মোট ৪৭৮ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন। প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে ইসি ৩৫৬ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করে, যা মোট স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রায় ৭৩ দশমিক ৪ শতাংশ। পরে প্রার্থিতা ফিরে পেতে তাঁরা নির্বাচন কমিশন ট্রাইব্যুনালে আপিল করেন।
গত তিন দিনে অনুষ্ঠিত আপিল শুনানিতে এখন পর্যন্ত ৩৩ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। অন্যদিকে ৩২ জনের আপিল খারিজ হয়েছে এবং ৮ জনের আপিল শুনানি স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অভিযোগ, প্রার্থিতা বাতিলে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব কাজ করছে, যা নির্বাচনের পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
সোমবার নির্বাচন কমিশনে আপিল শুনানিতে প্রার্থিতা ফিরে পাওয়া বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি ও কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসনাত কাইয়ুম সাংবাদিকদের বলেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নির্বাচন থেকে বাদ দিতে মাঠপর্যায়ে সক্রিয়ভাবে কাজ চলছে।
তিনি বলেন, প্রাথমিক যাচাইয়ে বলা হয়েছিল, তার দেওয়া ১০ জন সমর্থনকারীর মধ্যে ছয়জনকে পাওয়া যায়নি। প্রশাসন ও পুলিশের তদন্তে ভোটাররা ভয় পেয়ে তাকে চেনেন না বা স্বাক্ষর দেননি বলে বক্তব্য দেন। পরে আপিল শুনানিতে দুজন ভোটারকে নির্বাচন কমিশনের সামনে হাজির করা হলে কমিশন তাদের বক্তব্য যাচাই করে প্রার্থিতা বহাল রাখে।
হাসনাত কাইয়ুম আরও বলেন, গতকাল স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময়ে দেখা গেছে, অনেকের অভিজ্ঞতা তার চেয়েও ভয়াবহ। এ ধরনের কর্মকর্তাদের দিয়ে নির্বাচন পরিচালনা করলে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়। মাঠপর্যায়ে নির্বাচন কর্মকর্তার বদলে আমলারা নির্বাচন পরিচালনা করছেন।
গোপালগঞ্জ-২ আসনের বাতিল হওয়া স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাডভোকেট উৎপল বিশ্বাস বলেন, ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর সংগ্রহ করা বাস্তবে অত্যন্ত কঠিন। একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তাঁকে ভোটারদের নাম, মোবাইল নম্বর, ভোটার সিরিয়াল নম্বর ও স্বাক্ষর প্রকাশ্যে দিতে হয়েছে। এতে ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্য উন্মুক্ত হয়ে গেছে। পরে যাচাই-বাছাইয়ের নামে কোথাও পুলিশ, কোথাও ম্যাজিস্ট্রেট পাঠিয়ে ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে।
ঝালকাঠি-২ আসনের বাতিল হওয়া স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ রাজ্জাক আলী বলেন, ১ শতাংশ সমর্থন সংগ্রহ করা এক লাখ ভোট পাওয়ার চেয়েও কঠিন। কারণ এখানে প্রকাশ্যে এসে ভোটার আইডি নম্বর, ছবি ও স্বাক্ষর দিতে হয়। এতে বোঝা যায়, কে কাকে সমর্থন করছে।
এ বিষয়ে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন বিশ্লেষক ড. আব্দুল হালিম বলেন, এক শতাংশ ভোটারের সমর্থনের বিধানটি বাতিল করা উচিত। এটি নানাভাবে অপব্যবহার হচ্ছে। সমর্থনকারীদের ভয় দেখিয়ে বলা হয়, তাঁরা মিথ্যা স্বাক্ষর দিয়েছেন। আবার অনেক সময় ইসির সার্ভার সমস্যার কারণে তথ্য যাচাই না করেই প্রার্থিতা বাতিল করা হয়।
তিনি আরও বলেন, এক শতাংশ ভোটার সমর্থনের শর্তে ভোটের গোপনীয়তাও লঙ্ঘিত হয়। কারণ ভোট দেওয়ার আগেই প্রকাশ হয়ে যায়, কে কোন প্রার্থীকে সমর্থন করছেন।
নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান ও সুজনের প্রধান নির্বাহী ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, যাদের প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে, তাদের বড় অংশই স্বতন্ত্র প্রার্থী। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর সংগ্রহের শর্তটি অযৌক্তিক।
তিনি বলেন, সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে ৫০০ ব্যক্তির স্বাক্ষর হলফনামার মাধ্যমে গ্রহণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সেটি আরপিওতে যুক্ত হলে বর্তমান কারসাজির সুযোগ থাকত না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে নির্বাচন কমিশন তা অন্তর্ভুক্ত করেনি।
ইসি সূত্র জানায়, গত ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত রিটার্নিং কর্মকর্তারা ৭২৩ জন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করেন। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইসিতে ৬৪৫টি আপিল আবেদন জমা পড়ে। ৫ জানুয়ারি আপিল গ্রহণ শুরু হয়ে ৯ জানুয়ারি শেষ হয়।
শনিবার থেকে আপিল শুনানি শুরু হয়েছে। ধাপে ধাপে আগামী ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত সব আপিলের শুনানি শেষ করার কথা রয়েছে। শুনানি শেষে ফলাফল মনিটরে প্রদর্শন করা হবে এবং সংশ্লিষ্টদের ই-মেইলে পিডিএফ কপি পাঠানো হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বর্তমানে নিবন্ধিত ৫১টি রাজনৈতিক দলের প্রায় ২ হাজার ৯০ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

