বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী বলেছেন, খেলাধুলা মানুষকে শারীরিক ও মানসিক শক্তি জোগায়। একই সঙ্গে এটি শৃঙ্খলা, আনুগত্য এবং দেশপ্রেম শেখায়।
খেলাধুলার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সুস্থ দেহে সুস্থ মন’, ‘ক্রীড়াই শক্তি, ক্রীড়াই বল’—এই চিরন্তন বাক্যগুলো আমাদের খেলাধুলার গুরুত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। অথচ জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টিকে আমরা বরাবরই উপেক্ষা করে আসছি। স্বাস্থ্য ভালো থাকলে মনও ভালো থাকে। সুস্থ দেহ ও মন কাজের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করে এবং কাজের গতি বাড়ায়। আর দেহ ও মনকে সুস্থ রাখার জন্য খেলাধুলার কোনো বিকল্প নেই। খেলাধুলার মাধ্যমে একজন মানুষ শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার পাশাপাশি ভ্রাতৃত্ববোধ, সহমর্মিতা ও নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন করে।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে হোটেল ইম্পেরিয়াল মিলনায়তনে বাংলাদেশ ফটোজার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ ফটোজার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি একেএম মহসিনের সভাপতিত্বে এবং খোকন শিকদারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনায় আরও বক্তব্য রাখেন সিনিয়র সাংবাদিক এবিএম রফিকুর রহমান, মশিউর রহমান সুমন, সজল ইসলাম, শাহাদাত হোসেন প্রমুখ।
কাদের গনি চৌধুরী বলেন, শিশুর বিকাশের মূলে রয়েছে খেলাধুলা। খেলাধুলা শিশুর শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং নানা উপায়ে শেখা ও বেড়ে উঠতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে এটি শিশুর সৃজনশীলতা ও কল্পনাশক্তি বিকাশেও সহায়তা করে। দুঃখজনক হলেও সত্য, এখন আর শিশুদের খুব একটা খেলার মাঠে দেখা যায় না। সকালে সূর্যের মুখ দেখার আগেই ছেলেমেয়েরা একগাদা বই কাঁধে নিয়ে কিংবা কোচিং সেন্টারের দিকে ছুটে যায়। সারা দিন ক্লাস শেষে ঘরে ফেরা—এটাই তাদের দৈনন্দিন চিত্র। অনেকের কপালে এই সৌভাগ্যটুকুও জোটে না। স্কুল শেষে অনেক ছেলেমেয়েকেই প্রাইভেট বা কোচিংয়ে ছুটতে হয়।
তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের শিশুদের একটি বড় অংশ পড়াশোনার চাপে পিষ্ট হয়ে খেলার মাঠে যাওয়ার সুযোগই পাচ্ছে না। অনেকে খেলাধুলাকে একেবারেই পাশ কাটিয়ে চলছে। ভাবটা এমন—খেলাধুলা করে কীই বা হবে! তার চেয়ে মোবাইলে একটু গেম খেলা কিংবা টেলিভিশন দেখা নাকি ভালো! এভাবে স্মার্টফোন ও আকাশসংস্কৃতি আমাদের আগামী প্রজন্মকে গ্রাস করে ফেলছে।
নিজের শৈশবের স্মৃতিচারণ করে কাদের গনি চৌধুরী বলেন, আমরা স্কুল থেকে ফিরে বই রেখে সামান্য কিছু খেয়েই ছুটে যেতাম খেলার মাঠে। ক্রিকেট, ফুটবল, কাবাডিসহ নানা খেলাই চলত সমানতালে। পরীক্ষার সময়ও এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়তে দেখিনি। বরং যারা খেলাধুলা থেকে দূরে থাকত, তাদেরই দিন দিন পিছিয়ে পড়তে দেখেছি। ছোটবেলায় প্রতিটি স্কুল ও কলেজে মহাধুমধামের সঙ্গে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ আয়োজন হতো, তার আশপাশের এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হতো। মানুষ দলে দলে ছেলেমেয়েদের খেলা দেখতে আসত। এখন গ্রামাঞ্চলের কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আয়োজন থাকলেও শহরের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসব প্রতিযোগিতা আর হয় না। হবে কীভাবে? স্কুলগুলোতে তো খেলার মাঠই নেই। নির্মম সত্য হলো, ধীরে ধীরে দেশে খেলার জায়গা সংকুচিত হয়ে আসছে। অথচ জনসংখ্যা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খেলার মাঠের সংখ্যাও বাড়ানো উচিত ছিল। কিন্তু তা হয়নি। গ্রামাঞ্চলে কিছু মাঠ থাকলেও শহরের অবস্থা অত্যন্ত বেহাল। অপরিকল্পিত নগরায়নে শহরের বুকের শেষ খেলার মাঠগুলোও গিলে খাওয়া হয়েছে। খেলাধুলার জন্য আর জায়গাই অবশিষ্ট নেই। তাহলে কীভাবে আমাদের দেশ থেকে পেলে, ম্যারাডোনা, রোনাল্ডো, নেইমার, মেসি কিংবা ব্রায়ান লারার মতো বিশ্বমানের খেলোয়াড় তৈরি হবে?
সাংবাদিকদের নেতা বলেন, একসময় মানুষ বলত খেলার মাঠ দিন দিন কমে যাচ্ছে, আর এখন বলা যায় খেলার মাঠ খুঁজেই পাওয়া যায় না। প্রতিটি খালি জায়গা দালানকোঠায় পরিণত হচ্ছে। বাচ্চারা যেখানে দৌড়াবে বা খেলবে, এমন জায়গা আর নেই। অথচ জনসংখ্যা বাড়ছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে শিশুর সংখ্যাও। ভবিষ্যতে এই শিশুরা কোথায় খেলবে, সেটাই বড় প্রশ্ন। এখন তরুণ ছেলেরাও খেলাধুলার জন্য মাঠ পায় না। মাঠ আছে মূলত জাতীয় পর্যায়ের খেলার জন্য। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে খেলতে হলে আগে ছোট মাঠেই অনুশীলন করতে হয়—এই বিষয়টি আমরা ভুলে যাচ্ছি। নতুন নতুন স্টেডিয়াম হচ্ছে, কিন্তু শিশু, তরুণ ও যুবকদের জন্য খেলার মাঠ নেই। বাধ্য হয়ে ছোট ছোট ফাঁকা জায়গায় তারা ক্রিকেট ও ফুটবল খেলছে। বর্তমান সময়ে শিশু ও তরুণদের মধ্যে খেলাধুলার আগ্রহ ধীরে ধীরে ধ্বংস করা হচ্ছে, যার জন্য আমরাই দায়ী। এর ফল হিসেবে তরুণ ও যুবসমাজ ফেসবুক ও মাদকনির্ভর হয়ে পড়ছে। খেলাধুলা করতে না পারলে বিকেলের অবসর সময় তারা নানা ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে, যার মধ্যে মাদকাসক্তি অন্যতম। খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ সবারই আছে, কিন্তু মূল সমস্যা হলো—খেলার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, তরুণরা এখন সরু গলি কিংবা ছোট জায়গায় ক্রিকেট ও ফুটবল খেলছে। একদিকে বিষয়টি কষ্টদায়ক, অন্যদিকে খেলাধুলার প্রতি তাদের আগ্রহ দেখে ভালোও লাগে। এখন ছক্কা মারার মতো মাঠ নেই, ফলে শর্টপিচ ধরনের খেলা বেশি হচ্ছে। ফুটবলেও জোরে শট নেওয়ার মতো জায়গা নেই। মিনিবারে ফুটবল খেলা হচ্ছে, যেখানে গোলকিপার নেই—সবাই শুধু পা দিয়ে বল মারছে। বলা যায়, মাঠের স্বল্পতার কারণে খেলার ধরনই বদলে যাচ্ছে। মাঠ ছোট হলে ছক্কা মারা বা জোরে শট নেওয়া সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, সত্যিকারের খেলা খেলতে হলে এখন স্টেডিয়ামে যেতে হয়। কিন্তু স্টেডিয়াম তো জাতীয় দলের জন্য, সাধারণ মানুষের জন্য নয়। এভাবে চলতে থাকলে একসময় আমাদের দেশে ছক্কা মারার মতো মাঠ পুরোপুরি হারিয়ে যাবে, থাকবে শুধু স্টেডিয়াম।
স্কুল থাকবে, কিন্তু মাঠ থাকবে না—শিক্ষার্থীরা খেলতে পারবে না—এটা কি কল্পনা করা যায়? মাঠের অভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে খেলাধুলার চর্চা নেই, নেই সাংস্কৃতিক পরিবেশও। এই দিকে নজর দেওয়ার যেন কারও সময় নেই। শিক্ষার পাশাপাশি এসব চর্চা নিশ্চিত না করলে জাতি শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে।
তিনি সরকারকে এ বিষয়ে আরও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বছরে দুই-চারটি টুর্নামেন্ট আয়োজন করা রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় ছাড়া কিছু নয়। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক শিক্ষার প্রশিক্ষিত শিক্ষক থাকলেও বিষয়টি অবহেলিত, বিশেষ করে কলেজ পর্যায়ে। তাই কলেজ পর্যায়ে শারীরিক শিক্ষা বিষয়টি চালু করা এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের প্রভাষক পদে উন্নীত করা প্রয়োজন।
বর্তমান প্রজন্মের মোবাইল ফোন আসক্তি নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমাদের দেশের স্কুল ও কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীরা এখন মাঠে যেতে চায় না, তারা স্ক্রিনেই বেশি সময় কাটায়। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। এর ফলে ভবিষ্যতে একটি শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ জাতি গড়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, ইন্টারনেটের এই যুগে আমরা স্মার্টফোনে গেম খেলতে খেলতে সত্যিকারের খেলা প্রায় ভুলে গেছি। আমাদের সন্তানেরা অনেক খেলাই চেনে না। খেলাধুলা শুধু শিশুদের জন্য নয়, বড়দের জন্যও সমান প্রয়োজন। তাই শিশুদের খেলাধুলার উপকারিতা বোঝাতে গিয়ে নিজের কথাও ভুলে গেলে চলবে না। ঘর ও কাজের ফাঁকে প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট খেলার জন্য সময় বের করুন এবং পরিবারের সবাইকে এতে উদ্বুদ্ধ করুন। অবশ্যই খেলাকে বাধ্যবাধকতা নয়, শখ হিসেবে নিন। পরিবারের সঙ্গে খেলাধুলা করলে পারিবারিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে, সেই সঙ্গে সময়টাও কাটবে আনন্দে।


