ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি: কমল পাল্টা শুল্ক, বাড়ল পোশাক রপ্তানির সুযোগ

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২৬, ০৩:১৫ এএম
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যচুক্তি সই হয়েছে। সোমবার বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় এই চুক্তিতে স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে আরোপিত পাল্টা শুল্ক ১ শতাংশ কমানো হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্কহার ২০ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ১৯ শতাংশে।

চুক্তির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো—যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করলে সেসব পণ্যের ওপর আর কোনো পাল্টা শুল্ক দিতে হবে না। অর্থাৎ, মার্কিন কাঁচামালে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ এখন শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পক্ষে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে দেশটির বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার চুক্তিতে সই করেন। তবে চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটায় এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে চুক্তির বিস্তারিত তুলে ধরা হবে।

চুক্তির মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে শুল্কহার হ্রাস এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাঁচামালে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধাকে বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন পোশাক খাতের শীর্ষ রপ্তানিকারকেরা। যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে দেশের অন্যতম বড় প্রতিষ্ঠান হা–মীম গ্রুপ এই সুবিধাকে সম্ভাবনাময় বলে মনে করছে।

এ বিষয়ে হামীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ বলেন, এই চুক্তির খবর তাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানির পরিমাণ এখন আরও বাড়বে, কারণ সেই তুলা দিয়ে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে আর কোনো পাল্টা শুল্ক দিতে হবে না। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে তিনি আশাবাদী।

উল্লেখ্য, চুক্তি স্বাক্ষরের সময় বাংলাদেশের বাণিজ্য উপদেষ্টা ও বাণিজ্যসচিব ওয়াশিংটনে সরাসরি উপস্থিত ছিলেন না। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান, বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান ঢাকায় অবস্থান করেই ভার্চ্যুয়ালি অনুষ্ঠানে যুক্ত হন। প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ সহকারী লুৎফে সিদ্দিকীও অনলাইনে অংশ নেন।

তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব খাদিজা নাজনীনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল সশরীরে ওয়াশিংটনে উপস্থিত ছিল। দলে আরও ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দুই যুগ্ম সচিব ফিরোজ উদ্দিন আহমেদ ও মোস্তাফিজুর রহমান, সিনিয়র সহকারী সচিব শেখ শামসুল আরেফীন এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কমিশনার রইছ উদ্দিন খান।

চুক্তির বিষয়টি নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন নীতিনির্ধারণী গবেষকেরা। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চুক্তির শর্তাবলি এখনো প্রকাশ না হওয়ায় এর প্রকৃত লাভ–লোকসান নির্ধারণ করা কঠিন। তার মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এমন চুক্তি করা প্রশ্নের জন্ম দেয়, কারণ এর বাস্তবায়নের দায়িত্ব পড়বে পরবর্তী সরকারের ওপর। তিনি মনে করেন, চুক্তির শর্ত ও দায়বদ্ধতা স্পষ্ট না হলে এটিকে নিঃশর্ত অর্জন হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল বাংলাদেশসহ ১০০টি দেশের পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। শুরুতে বাংলাদেশের জন্য এই হার ছিল ৩৭ শতাংশ। পরে কয়েক দফা আলোচনা ও সময় বাড়ানোর পর ধাপে ধাপে এই হার কমে আসে। সর্বশেষ এই চুক্তির ফলে পাল্টা শুল্ক আরও ১ শতাংশ কমানো হলো।

বর্তমানে পাল্টা শুল্ক ও বিদ্যমান শুল্ক মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর মোট শুল্কহার দাঁড়িয়েছে ৩৪ শতাংশে।

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৮০০ কোটি ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ রপ্তানি করে ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য, আর আমদানি করে ২০০ কোটি ডলারের। এই বাণিজ্যঘাটতি কমাতে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম, ভুট্টা, সয়াবিন তেল, তুলা, এলএনজি, উড়োজাহাজ ও এর যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি বাড়িয়েছে।