সদ্য শেষ হওয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় অর্জন করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে এই বড় রাজনৈতিক ম্যান্ডেট দলটিকে সংবিধান সংশোধনসহ নীতিনির্ধারণের ব্যাপক ক্ষমতা প্রদান করেছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী এই প্রথম নির্বাচনে দলটির ওপর জনগণের প্রত্যাশা পূরণের চাপও সবচেয়ে বেশি।
জনগণের প্রত্যাশা ও শঙ্কা
বিপর্যস্ত অর্থনীতি এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর এই নির্বাচনকে ঘিরে দেশের সাধারণ মানুষের প্রধান প্রত্যাশা ছিল স্থিতিশীলতা ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। ভোটের ফলাফলে মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এলেও দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনকারী দলের ‘কর্তৃত্ববাদী’ হয়ে ওঠার একটি প্রচ্ছন্ন শঙ্কাও বিশ্লেষকদের মধ্যে রয়েছে, যার উদাহরণ হিসেবে শেখ হাসিনার শাসনকালকে সামনে আনা হচ্ছে। তবে তারেক রহমান স্পষ্ট করেছেন, বিভেদের রাজনীতি পরিহার করে ঐক্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করাই হবে তাদের সরকারের মূল লক্ষ্য।
প্রধান চ্যালেঞ্জ
আইনশৃঙ্খলা
গণঅভ্যুত্থানের পর ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনর্গঠন করাই নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। পুলিশ বাহিনীকে কার্যকর ও আস্থাশীল করে তোলা এবং মব জাস্টিস বা দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা রোধ করা তাদের জন্য কঠিন হবে বলে মনে করন মানবাধিকার কর্মীরা।
অর্থনীতি
দ্বিতীয় প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানোকে চিহ্নিত করেছে বিএনপি। ব্যাংক খাতের ভঙ্গুর দশা এবং বিনিয়োগ স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানো অপরিহার্য।
নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ ও জামায়াত
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বসছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট। নির্বাচনি প্রচারে দুই দলের বৈরিতা স্পষ্ট হলেও সংস্কারের ইস্যুসহ বিভিন্ন বিষয়ে জামায়াত বিএনপিকে চাপে রাখার চেষ্টা করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে, নিষিদ্ধ বা রাজনীতি থেকে দূরে থাকা আওয়ামী লীগ ভবিষ্যতে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করলে নতুন সরকার তাদের কতটা জায়গা দেবে, তা নিয়েও রয়েছে জনমনে প্রশ্ন।
সাংবিধানিক ও কাঠামোগত সংস্কার
ক্ষমতার ভারসাম্য : সংসদ ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করার কোনো বিকল্প নেই।
রাষ্ট্রপতিশাসিত/সংসদীয় ব্যবস্থার পর্যালোচনা : প্রয়োজনে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠা বা সংবিধানে মৌলিক পরিবর্তনের জন্য গণভোট বা বিশেষ কমিশন গঠনের প্রস্তাবনাও ছিল ইতিবাচক।
বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশন : নির্বাচন কমিশন এবং বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও স্বাধীন করার প্রক্রিয়া কার্যকর করার তাগিদ অনুভব করছেন রাষ্ট্রসংশ্লিষ্টরা।
গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের বিচার : জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করার বিষয়টি নতুন সরকারের কার্যতালিকায় প্রথম স্থানে রাখার মত দিয়ে সাধারণ মানুষের।
রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার : বিগত সময়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা হয়রানি ও মামলার বিচার বিভাগীয় বিবেচনায় নিয়ে তা পর্যালোচনা করে প্রত্যাহারের বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসতে হবে।
সুশাসন প্রতিষ্ঠা
দুর্নীতিবিরোধী অভিযান : ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে। এর মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি খাতের দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরার কোন বিকল্প নেই।
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ : নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা। অতীতের সরকার দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের ব্যপারে নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লেখ করলেও তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এ জন্য বাজার সিন্ডিকেট সমূলে উৎপাটন করতে হবে।
মব জাস্টিস বন্ধ : দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা বা 'মব জাস্টিস' সম্পূর্ণ বন্ধ করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সময়ের দাবি।
ভূ-রাজনীতি : ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ
আন্তর্জাতিক মহলে এই নির্বাচনের দিকে কড়া নজর ছিল। বিএনপি সরকারের জন্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বজায় রাখা একটি বড় পরীক্ষা।
ভারত : সাবেক কূটনীতিকদের মতে, আওয়ামী লীগের পতনের পর তলানিতে ঠেকে যাওয়া ভারতের সাথে সম্পর্কের উন্নয়নে দুই পক্ষই তাগিদ অনুভব করছে। ভারতের সাথে সম্পর্ক ভালো করার পাশাপাশি পাকিস্তানের সাথে নতুন সম্পর্কের মেরূকরণ কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, তা দেখার বিষয়।
চীন ও পশ্চিমা বিশ্ব : চীনের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সাম্প্রতিক ট্যারিফ চুক্তি মাথায় রেখে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখা নতুন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জিং হবে।
বিএনপি নেতারা অবশ্য আত্মবিশ্বাসী। দলের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, 'সবার আগে বাংলাদেশ' নীতিতে নিজ দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব বজায় রেখে তারা সব দেশের সাথে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক রক্ষা করবেন।


