ইরান-ইসরায়েলের সংঘাতের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে গোটা বিশ্বে। এর প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। আর এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। জ্বালানি সংকটের আতঙ্ক এখন দেশজুড়ে। এমন পরিস্থিতিতে প্রত্যেকটি ফিলিং স্টেশন সরবরাহ করতে পারবে, ভোক্তাদের মধ্যে কারা কতটুকু জ্বালানি তেল সংগ্রহ করতে পারবেন- সেটি নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
তবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) এ নির্দেশনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে নানা মহলে। কীভাবে কার্যকর হবে এ নির্দেশনা? নির্দেশনায় উল্লিখিত তেলের পরিমান কতটুকু যৌক্তিক?- এমন প্রশ্ন ঘুরছে জনমনে।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, ‘দেশে পর্যাপ্ত তেল মজুত আছে। উদ্বিগ্ন হয়ে মজুত না করে, যার যতটুকু প্রয়োজন তাই কিনুন।’
তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি পেয়েছে, চাপ সামলাতে বাংলাদেশে দাম সমন্বয় করা হতে পারে। যতটুকু সম্ভব তেলের দাম না বাড়ানোর চেষ্টা করবে সরকার।’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদে যাতে দেশে জ্বালানির সংকট না হয়, সেজন্য আগামী রোববার থেকে রেশনিং পদ্ধতিতে জ্বালানি তেল বিক্রি করা হবে।’
রাজধানীর মিরপুর-১১ এর বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম উবার এ্যাপসের মাধ্যমে বাইক রাইড করেন। তিনি বলেন, শুক্রবার (৬ মার্চ) দুপুর পর্যন্ত রাজধানীর তিনটি ফিলিং স্টেশন ঘুরে মাত্র ৫০০ টাকার পেট্রোল নিতে পেরেছেন তিনি। এর মধ্যে একটি স্টেশন থেকে ২০০ টাকার এবং আরেকটি স্টেশন থেকে ৩০০ টাকার তেল পেয়েছেন।
বিশ্লেষকরা জানান, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান যুদ্ধের প্রভাবের কারণে তেল সরবরাহে সমস্যা দেখা দিয়েছে। গত তিন দিন ধরে ফিলিং স্টেশনগুলো চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছে না। ফলে পাম্পগুলোও গ্রাহকদের চাহিদামতো তেল দিতে পারছে না। ইতোমধ্যে কয়েকটি ফিলিং স্টেশন তেল না থাকায় সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। যেসব স্টেশনে তেল রয়েছে, সেগুলোতেও সীমিত পরিমাণে বিক্রি করা হচ্ছে। মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হওয়ায় তেল কেনার হিড়িক পড়েছে। কেউ নিয়মিত বাইক ব্যবহার না করলেও অতিরিক্ত তেল কিনে রাখার চেষ্টা করছেন। আবার যারা বেশি বাইক চালান তারা একাধিক পাম্পে ঘুরে ট্যাংকি ভরে বাড়িতে সংরক্ষণ করছেন। এতে সংকট আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) নির্দেশনায় বলা হয়েছে, দেশের ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশ বিদেশ হতে আমদানি করতে হয়। বৈশ্বিক সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশের জ্বালানি তেলের আমদানি ব্যবস্থাপনা মাঝেমধ্যে বাধাগ্রস্ত/বিলম্বিত হয়। চলমান বৈশ্বিক সংকট পরিস্থিতিতে বিভিন্ন গণমাধ্যম/সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জ্বালানি তেলের মজুত পরিস্থিতি নিয়ে নেতিবাচক সংবাদ প্রচার হওয়ায় ভোক্তা/গ্রাহকদের মধ্যে অতিরিক্ত চাহিদার প্রবণতা লক্ষ্যে করা যাচ্ছে। অতিরিক্ত চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে ডিলারেরা বিগত সময়ের চেয়ে অতিরিক্ত পরিমাণ জ্বালানি তেল ডিপো থেকে সংগ্রহের চেষ্টা করছেন।
এতে বলা হয়েছে, কিছু কিছু ভোক্তা ও ডিলার ফিলিং স্টেশন হতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে অননুমোদিতভাবে মজুত করার চেষ্টা করছেন মর্মে খবর প্রকাশ হচ্ছে, যা জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং বিপিসিসহ সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হয়েছে।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য বিদেশ হতে আমদানি কার্যক্রম/সূচি নির্ধারিত রয়েছে। নিয়মিতভাবে চালান দেশে আনা হচ্ছে। পাশাপাশি ডিলারদের সাময়িকভাবে প্রধান স্থাপনা হতে সারা দেশের সকল ডিপোতে নিয়মিতভাবে রেল ওয়াগণ/ট্যাংকারের মাধ্যমে তেল পাঠানো হচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে, স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশে জ্বালানি তেলের বাফার স্টক (পর্যাপ্ত মজুত) গড়ে উঠবে।
এতে বলা হয়েছে, একটি মোটরসাইকেলে দিনে ২ লিটার পেট্রল বা অকটেন নিতে পারবে। ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে নেওয়া যাবে ১০ লিটার তেল। স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিক্যাল বা এসইউভি (যা জিপ নামে পরিচিত) ও মাইক্রোবাস দিনে পাবে ২০ থেকে ২৫ লিটার তেল। পিকআপ বা লোকাল বাস দিনে ডিজেল নিতে পারবে ৭০ থেকে ৮০ লিটার। আর দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান বা কনটেইনার ট্রাক দৈনিক ২০০ থেকে ২২০ লিটার তেল নিতে পারবে।
নির্দেশনায় জ্বালানি তেল সরবরাহ গ্রহণ/প্রদানের ক্ষেত্রে কয়েকটি শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। শর্তগুলো হল-
১. ফিলিং স্টেশন থেকে জ্বালানি তেল গ্রহণের সময় ভোক্তাকে আবশ্যিকভাবে তেলের ধরন, পরিমাণ ও মূল্য উল্লেখ করে ক্রয় রশিদ প্রদান করতে হবে।
২. ফিলিং স্টেশন থেকে প্রতিবার জ্বালানি তেল গ্রহণের সময় পূর্ববর্তী ক্রয় রশিদ/বিল প্রদর্শন করতে হবে।
৩. ডিলাররা বরাদ্দ ও নির্দেশনা অনুযায়ী ক্রয় রশিদ গ্রহণ করে ভোক্তা প্রান্তে জ্বালানি তেল সরবরাহ করবে।
৪. ফিলিং স্টেশনগুলো জ্বালানি তেলের মজুত ও বিক্রয় সংক্রান্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ডিপোতে প্রদান করে জ্বালানি তেল উত্তোলন করবে।
৫. তেল বিপণন কোম্পানিগুলো ডিলারদের জ্বালানি তেল সরবরাহ দেওয়ার পূর্বে বর্তমান বরাদ্দের আলোকে মজুত ও বিক্রয় সংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনা করবে, কোনোভাবেই বরাদ্দের বেশি দেওয়া যাবে না।


সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন