ধারাবাহিক গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে পরিচালন ব্যয় বেড়ে গেলেও দীর্ঘ প্রায় ১১ বছর ধরে সিএনজি বিক্রির কমিশন (মার্জিন) না বাড়ানোয় দেশের সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলো চরম সংকটে পড়েছে বলে দাবি করেছেন ব্যবসায়ীরা। বারবার দাবি জানিয়েও সাড়া না পাওয়ায় আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্শন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন।
দাবি আদায় না হলে আগামী ৩০ জুলাই দেশব্যাপী এক দিনের প্রতীকী ধর্মঘট পালন করবেন সিএনজি স্টেশন মালিকরা। এরপরও সমাধান না এলে ২৩ আগস্ট থেকে সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য সব সিএনজি ফিলিং স্টেশন বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) দুপুরে রাজধানীর বিজয়নগরের আকরাম টাওয়ারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গঠিত স্টিয়ারিং কমিটির আহ্বায়ক আমিরুজ্জামান চৌধুরী লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। এ সময় সংগঠনের সভাপতি মনোরঞ্জন ভক্ত, মহাসচিব ফারহান নূরসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে প্রতি ঘনমিটার সিএনজি বিক্রিতে কমিশন ৮ টাকা নির্ধারিত রয়েছে, যা গত প্রায় ১১ বছরে আর বাড়ানো হয়নি। এ সময়ে দেশে মূল্যস্ফীতি, সরকারি ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, ডলারের দাম, ব্যাংক গ্যারান্টি কমিশন, সুদের হার এবং পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে লোকসান দিয়ে স্টেশন পরিচালনা করতে হচ্ছে বলে দাবি করেন মালিকরা।
এ পরিস্থিতিতে সরকারের কাছে চার দফা দাবি তুলে ধরে সংগঠনটি।
দাবিগুলো হলো—
১. বর্তমান ৮ টাকার পরিবর্তে প্রতি ঘনমিটার সিএনজি বিক্রিতে কমিশন ১৩ টাকা ৯৬ পয়সা নির্ধারণ।
২. ভবিষ্যতে সিএনজি উৎপাদনে ব্যবহৃত জ্বালানির মূল্য বাড়লে কমিশন বা মার্জিনও আনুপাতিক ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বয় করা।
৩. গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির কারণে পুরোনো গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত জামানত নেওয়ার প্রথা বাতিল করা।
৪. সড়ক ও জনপথের ভূমি বা সংযোগ সড়কের ইজারা মাশুলসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের লাইসেন্স ও নবায়ন ফি যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা।
কর্মসূচি
সংগঠনটি জানায়, ৩০ জুলাই সকাল ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত দেশব্যাপী সব সিএনজি ফিলিং স্টেশন প্রতীকীভাবে বন্ধ থাকবে। তবে এ সময় সরকারের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
আলোচনায় সমাধান না এলে ২৩ আগস্ট থেকে সারা দেশের সব সিএনজি ফিলিং স্টেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখা হবে।
কমিশন বাড়ানোর যৌক্তিকতা
সংবাদ সম্মেলনে কমিশন ৮ টাকা থেকে ১৩ টাকা ৯৬ পয়সা করার দাবির পক্ষে দুটি প্রধান কারণ তুলে ধরা হয়।
প্রথমত, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি। ২০১৫ সালের পর সরকার সাতবার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ৩ জুন মূল্যবৃদ্ধির ফলে প্রতিটি সিএনজি স্টেশনের মাসিক বিদ্যুৎ বিল প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে যাবে। এ ব্যয় সমন্বয়ে কমিশন ২ টাকা ৪৬ পয়সা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, মূল্যস্ফীতি ও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি। বর্তমান বাজার পরিস্থিতি, শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বৃদ্ধির কারণে পরিচালন ব্যয় মেটাতে আরও ৩ টাকা ৫০ পয়সা কমিশন বাড়ানোর দাবি জানানো হয়।
এক দশক ধরে ফাইলবন্দি
সংগঠনের নেতারা বলেন, কমিশন বৃদ্ধির দাবি নতুন নয়। এর আগে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং পেট্রোবাংলার গঠিত উচ্চপর্যায়ের টেকনিক্যাল কমিটি কমিশন ২ টাকা ৯৮ পয়সা বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ২০১৫ সালে মাত্র ১ টাকা বৃদ্ধি করে, বাকি ১ টাকা ৯৮ পয়সা বৃদ্ধির সুপারিশ দীর্ঘ এক দশক ধরে বাস্তবায়ন করেনি বলে অভিযোগ করেন তারা।
‘৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ’ ঝুঁকিতে
সংবাদ সম্মেলনে নেতারা বলেন, সিএনজির ক্রয় ও বিক্রয়মূল্য সরকার নির্ধারণ করে দেওয়ায় বাড়তি পরিচালন ব্যয় গ্রাহকদের ওপর চাপানোর সুযোগ নেই। ফলে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার পরিবেশবান্ধব এ খাতে বিনিয়োগ এখন লোকসানের মুখে পড়েছে।
তারা আরও অভিযোগ করেন, নিজেদের দাবি তুলে ধরতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যানের সঙ্গে একাধিকবার সাক্ষাতের চেষ্টা করেও সফল হননি। সাধারণ মানুষের ভোগান্তি এড়াতে সরকারের প্রতি দ্রুত দাবি বাস্তবায়নের আহ্বান জানান সংগঠনের নেতারা।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন