ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

দুই মায়ের বুকভাঙা আহাজারিতে ‘দগ্ধ’ বুধবার

জুবায়ের দুখু
প্রকাশিত: মে ২০, ২০২৬, ১০:২৬ পিএম
ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে—এ নির্মম ঘটনা এখন পুরো দেশ জানে। আজই হয়তো তাকে কবরে শুইয়ে রেখে সবাই নিজ নিজ জীবনে ফিরে যাবে। কিন্তু কেউ কি জানে রামিসার মায়ের খবর? কিংবা চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লালানগর ইউনিয়নের বন্দেরাজার পাড়ার সেই হতভাগ্য চার ভাইয়ের মায়ের খবর?

আজ বুধবার (২০ মে) দিনটিকে কেবল 'ভারাক্রান্ত' বললেও হয়তো কম বলা হয়। একদিকে ওমান থেকে এক সঙ্গে দেশে ফিরেছে চার সহোদরের মরদেহ। অন্যদিকে রাজধানীর পল্লবীর সেকশন-১১ এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে উদ্ধার করা হয়েছে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসার নিথর দেহ।

এমন বিষাদময় দিনে জীবনানন্দ দাশের সেই বিখ্যাত লাইন মনে পড়ে যায়—

‘মুখ লুকাবো আজ বিষণ্ন বিকেলের কাছে,
কেউ যেন দেখে না চোখের ভাঙা নদী।’

‘মা’ পৃথিবীর অন্যতম গভীর ও পবিত্র একটি শব্দ। এই শব্দকে ঘিরে তৈরি হয়েছে অসংখ্য সাহিত্য, সিনেমা আর গান। কিন্তু যে মায়ের বুক খালি হয়েছে, সেই মা-ই কেবল জানেন তিনি কী হারিয়েছেন।

সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর থেকেই রামিসার মা বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। জ্ঞান ফিরলেই মেয়েকে খুঁজে আহাজারি করছেন। বুকফাটা আর্তনাদে বলছেন, ‘আমার রামিসা কোথায়? ওকে এনে দাও।’

কখনো আবার প্রলাপের মতো বলছেন, ‘আমার মেয়েটা কই? ও স্কুলে যাবে, ভাত খাবে। ও তো একা খেতে পারে না...’

রামিসাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানের গ্রামের বাড়িতে। সেখানেই চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে তাকে। আর এভাবেই চোখের সামনে শেষ হয়ে যাবে আরও একটি অধ্যায়—যেমন একদিন হারিয়ে গিয়েছে মাগুরার আছিয়া। কেমন আছে আছিয়ার মা? রাত হলে কি এখনো মেয়ের জন্য কাঁদেন? ঠিক সেই জায়গাগুলোতে দাঁড়িয়ে কি এখনো হাতড়ান স্মৃতি, যেখানে আছিয়া এসে মায়ের কাছে ভাত চাইত?

কেউ আর সেই খবর রাখে না। দিন পেরোলেই যান্ত্রিক এই শহর আবার ব্যস্ত হয়ে ওঠে। ভুলে যায় রামিসা কিংবা আছিয়াদের। হয়তো নতুন কোনো ভিকটিম চলে আসে নিউজফিডের পাতায়।

এবার আসি চট্টগ্রামের ঘটনায়। ওমান থেকে চার ভাই ফিরেছেন বাড়িতে—তবে জীবিত নয়, নিথর লাশ হয়ে। প্রবাসী চার ভাইয়ের বৃদ্ধা মা খাদিজা বেগম এখনো জানেন না, তার চার ছেলের কেউই আর এই পৃথিবীতে বেঁচে নেই। তিনি শুধু জানেন, ছেলেরা অসুস্থ। কেবল সেই অসুস্থতার খবর শুনেই তিনি বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন।

নিহত চার ভাই হলেন- মুহাম্মদ রাশেদ (৪০), মুহাম্মদ সাহেদ (৩৫), মুহাম্মদ সিরাজ (২৮) ও মুহাম্মদ শহিদ (২৪)। তাদের আরও এক ভাই জীবিত আছেন, যিনি গ্রামেই থাকতেন মায়ের কাছে। সেই ভাই তাদের জানাজা পড়িয়েছেন।

জানা গেছে, মৃত্যুর ঠিক আগে রাশেদ তার মাকে ফোন করে জানিয়েছিলেন, গাড়ির ভেতরে তাদের নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। তারা হাসপাতালের দিকে যাচ্ছেন। সেই ফোনকলের মাত্র ১০ মিনিট পর থেকেই চার ভাইয়ের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এর প্রায় আধা ঘণ্টা পর ওমানের মুলাদ্দা এলাকার একটি হাসপাতালের সামনে একটি গাড়ির ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় তাদের নিথর মরদেহ।

সেই মরদেহই আজ ভোরে ফিরেছে আপন নীড়ে। স্বজনরা জানিয়েছেন, বিদেশে যেমন তারা এক  সঙ্গে ছিলেন, দেশে ফিরেও একই বাড়িতে থাকার স্বপ্ন ছিল চার ভাইয়ের। কথাটি শুনতে নির্মম শোনালেও, শেষ পর্যন্ত তারা এক সঙ্গেই রইলেন—তবে পাশাপাশি চিরনিদ্রার কবরে।

জানা যায়, খুব ছোটবেলায় এই পাঁচ ভাইয়ের বাবা আবদুল মজিদ মারা যান। মা খাদিজা বেগম অসীম কষ্ট আর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সন্তানদের মানুষ করেছিলেন। কিন্তু এভাবে এক সঙ্গে চারটি বুকের ধন হারিয়ে যাবে- কোনো মা কি কখনো এমন পাহাড়সম শোক সহ্য করতে পারেন?