ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১৫০ হজযাত্রীর লাগেজ কেটে মালামাল চুরির অভিযোগ উঠেছে। তবে, এ অভিযোগকে সত্য নয় বলে দাবি করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ।
বুধবার (৩ জুন) মোস্তফা কামাল পলাশ নামের এক হজযাত্রীর ছেলে ফেসবুক পোস্টে এ অভিযোগ করেন। পোস্টের সঙ্গে তিনি লাগেজ কাটার একটি ছবিও যুক্ত করেন।
তার দাবি অনুযায়ী, মঙ্গলবার (২ জুন) দিবাগত রাতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ৪১৯ জন হজযাত্রী দেশে ফেরেন। পরে প্রায় ১৫০ জন হাজির লাগেজ কাটা অবস্থায় পাওয়া যায়। অভিযোগে বলা হয়, এসব লাগেজ থেকে মূল্যবান জিনিসপত্রও খোয়া গেছে। এ ঘটনায় তিনি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন বলেও উল্লেখ করেন।
এ ধরনের অভিযোগের পর ফেসবুক পোস্টটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। পরে বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোসরা ইসলাম এ বিষয়ে একটি তদন্ত প্রতিবেদন সাংবাদিকদের কাছে পাঠান। প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেন বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও এয়ারপোর্ট সার্ভিসেস বিভাগের মহাব্যবস্থাপক শাহনূর আহমাদ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২ জুন জেদ্দা থেকে ৪১৯ জন হজযাত্রী নিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিশেষ হজ ফ্লাইট বিজি-৩১০৪ ঢাকায় অবতরণ করে। পরে ‘মোস্তফা কামাল পলাশ’ নামে একটি ফেসবুক আইডি থেকে দাবি করা হয়, ওই ফ্লাইটে আসা প্রায় ১৫০ জন হজযাত্রীর লাগেজ কেটে মালামাল চুরি করা হয়েছে।
এ অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিমান ও বিমানবন্দরের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলে কর্তৃপক্ষের নির্দেশে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং টিম তাৎক্ষণিকভাবে একটি বিস্তারিত অভ্যন্তরীণ তদন্ত পরিচালনা করে।
তদন্তে দেখা যায়, ফ্লাইটটি রানওয়েতে অবতরণের পর রাত ২টা ৫২ মিনিটে চেক অন হয়। মাত্র ১৩ মিনিটে রাত ৩টা ৫ মিনিটে প্রথম ব্যাগ এবং রাত ৩টা ৫১ মিনিটে (মাত্র ৫৯ মিনিটে) ফ্লাইটের মোট ৮৩৬ পিস ব্যাগের সবকটি ডেলিভারি বেল্টে দেওয়া সম্পন্ন হয়।
উড়োজাহাজের হোল্ড থেকে কনটেইনার, প্যালেট এবং ট্রলি-ডলির মাধ্যমে লাগেজগুলো যখন ব্যাগেজ ডেলিভারি এরিয়াতে আনা হয়, তখন পুরো পথটি সম্পূর্ণভাবে সিকিউরিটি গার্ডের প্রত্যক্ষ উপস্থিতিতে নিয়ে আসা হয়।
এয়ারপোর্ট সিকিউরিটি অথরিটির কর্মকর্তাদের সরাসরি উপস্থিতিতে ট্রলি-ডলি হতে ব্যাগগুলো লাগেজ ডেলিভারি বেল্টে ড্রপ করা হয়। জাহাজ থেকে ব্যাগ নামানোর সময় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং স্টাফদের গায়ে থাকা ‘বডি অন ক্যামেরা’ এবং বিমানবন্দরের রানওয়ে ও সোর্টিং এরিয়ার সিসিটিভি ফুটেজ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করা হয়। পরে মাত্র ৫ থেকে ৬ জন যাত্রী তাদের ব্যাগ ছেঁড়া বা কাটা অবস্থায় পেয়েছেন বলে কর্তব্যরত গ্রাউন্ড স্টাফদের নিকট মৌখিকভাবে জানান। কিন্তু কেউ লিখিত অভিযোগ দেননি।
আক্রান্ত যাত্রীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, উক্ত লাগেজগুলোর ভেতরে জমজমের পানি, বিভিন্ন প্রসাধন সামগ্রী (শ্যাম্পু ও লোশন) এবং খেজুর ছিল। যাত্রীদের ব্যাগ থেকে মূল্যবান কোনো সামগ্রী খোয়া যায়নি। তবে একজন যাত্রী তার ব্যাগের ভেতর থেকে একটি মানিব্যাগ হারানোর কথা মৌখিকভাবে উল্লেখ করেন। কর্তব্যরত বিমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং স্টাফরা উক্ত যাত্রীদেরকে বিমানবন্দরের ‘লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ডে’ ডেস্কে গিয়ে অফিশিয়াল লিখিত অভিযোগ দায়ের করার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু যাত্রীরা কোনো প্রকার লিখিত অভিযোগ দায়ের না করেই বিমানবন্দর এলাকা ত্যাগ করেন।
বিমানের পর্যবেক্ষণ
ওই তথ্যাদি, সিসিটিভি ফুটেজ, বডি অন ক্যামেরার রেকর্ড, আইটা রেগুলেশন এবং সৌদি আরবের সিভিল এভিয়েশন জেনারেল অথরিটির নিরাপত্তা বিধিমালা পর্যালোচনা করে বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ করেছে বিমান।
১. সৌদি আরবের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো হাজি বা যাত্রী মূল চেক-ইন লাগেজের ভেতরে কোনো অবস্থাতেই জমজমের পানি এবং যথাযথভাবে সিলগালা না করা তরল প্রসাধন সামগ্রী (শ্যাম্পু লোশন ইত্যাদি) বহন করতে পারবেন না।
২. জেদ্দা কিং আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ স্ক্যানিংয়ের সময় এ নিষিদ্ধ তরল পদার্থের উপস্থিতি ধরা পড়লে, সৌদি বিমানবন্দর সিকিউরিটি কর্তৃপক্ষ নিয়মানুযায়ী লাগেজ খুলে বা কেটে তা বাজেয়াপ্ত করে থাকে।
৩. আন্তর্জাতিক নিয়মানুযায়ী নগদ টাকা বা মানিব্যাগ বুকিং লাগেজে দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ডিক্লারেশন ছাড়া এই ধরনের সামগ্রী লাগেজে রাখা এভিয়েশন বিধিমালার পরিপন্থি।
৪. ঢাকা বিমানবন্দরে বিজি৩১০৪ এ যাত্রী ব্যাগেজ মিসহ্যান্ডলিং/কাটা/ছেঁড়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
৫. সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত ‘১৫০ জন হাজির লাগেজ কেটে মালামাল চুরি’-এর দাবিটি সত্য নয়।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন