অনলাইন ও প্রচলিত জুয়া নিয়ন্ত্রণে সরকার যে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে, তার খসড়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাকে পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জুয়াসংক্রান্ত অপরাধে জড়িত থাকার যৌক্তিক সন্দেহ থাকলেই এই ক্ষমতা প্রয়োগ করা যাবে বলে খসড়ায় উল্লেখ রয়েছে।
‘বেটিং ও জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ শীর্ষক প্রস্তাবিত আইনে জুয়াসংক্রান্ত অপরাধগুলোকে অজামিনযোগ্য এবং আপসের অযোগ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সন্দেহভাজনদের তথ্য সংরক্ষণের জন্য একটি জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট গঠনের কথাও বলা হয়েছে।
তবে আইন বিশেষজ্ঞ ও প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের একটি অংশের আশঙ্কা, নজরদারি ও সন্দেহের ভিত্তিতে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ থাকায় আইনের কিছু ধারা অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাদের মতে, বিলটি সংসদে তোলার আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নিয়ে বিতর্কিত ধারাগুলো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
খসড়ার ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ১৮৬৭ সালের প্রচলিত জুয়া আইন বর্তমান সময়ের অনলাইন বেটিং, ভার্চুয়াল ক্যাসিনো, ক্রিপ্টোকারেন্সিনির্ভর জুয়া এবং ডিজিটাল আর্থিক প্রতারণা মোকাবিলায় কার্যকর নয়। এ কারণেই নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, পুরোনো আইনি কাঠামো দিয়ে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর জুয়া ও বেটিং নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, নতুন আইন প্রণয়নের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং আগামী সংসদ অধিবেশনেই এটি বিল আকারে উপস্থাপন করা হতে পারে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন আইনের মাধ্যমে অনলাইন জুয়া দমনে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
খসড়ার ৩৭ ধারায় আইনের আওতাভুক্ত সব অপরাধকে আমলযোগ্য, অজামিনযোগ্য ও আপস-অযোগ্য হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এছাড়া ৩৬ ধারায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এসব অপরাধের বিচার পরিচালনার সুযোগ রাখা হয়েছে, ফলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাৎক্ষণিক শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা পাবেন।
৩৯ ধারায় বলা হয়েছে, জুয়াসংক্রান্ত অপরাধের সন্দেহ দেখা দিলে পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তার করা যাবে। এ ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, এনএসআই, ডিজিএফআই, সিআইডি, র্যাবসহ অন্যান্য তদন্তকারী সংস্থার কর্মকর্তারা।
আইনের ৪৩ ধারায় জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট তৈরির কথা বলা হয়েছে, যেখানে এনআইডি নম্বর, মোবাইল নম্বর, ব্যাংক ও মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব, ডিজিটাল ওয়ালেট, ব্যবহৃত ডিভাইস, ডোমেইন, আইপি ঠিকানা, ওয়েবসাইট ও অ্যাপসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করা হবে। তবে কারা এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবেন, কতদিন তথ্য রাখা হবে বা ভুলবশত নাম যুক্ত হলে কীভাবে তা সংশোধন করা যাবে—এসব বিষয়ে খসড়ায় স্পষ্ট নির্দেশনা নেই।
৪৪ ধারায় জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল সিম এবং আর্থিক হিসাবের তথ্য সমন্বিতভাবে যাচাইয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ফেসিয়াল রিকগনিশন ও বায়োমেট্রিক যাচাই প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগও প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে একজন ব্যক্তির পরিচয়, যোগাযোগ ও আর্থিক লেনদেন একসঙ্গে পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হবে।
এছাড়া ৪৭ ধারায় ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগ ও তথ্যপ্রবাহ পর্যবেক্ষণে ডিপ প্যাকেট ইনস্পেকশন (ডিপিআই) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষমতা সরকারের হাতে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিপিআই ব্যবহারের মাধ্যমে ইন্টারনেট ট্রাফিকের গভীরতর তথ্যও বিশ্লেষণ করা সম্ভব।
বর্তমান সাইবার সুরক্ষা আইন অনুযায়ী অনলাইন জুয়া পরিচালনা বা প্রচারের জন্য কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান থাকলেও নতুন খসড়ায় শাস্তি আরও কঠোর করা হয়েছে। একই ধরনের অপরাধে ৭ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকা জরিমানার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
খসড়ায় জুয়ায় আসক্তদের পুনর্বাসন ও কাউন্সেলিং, ম্যাচ ও স্পট ফিক্সিংকে পৃথক অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশের ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রযুক্তি গবেষক আসিফ শাহরিয়ার সুস্মিতের মতে, আইনটি কেবল পুরোনো জুয়া আইনের আধুনিক সংস্করণ নয়; এর বিভিন্ন ধারা বিশ্লেষণ করলে একটি বিস্তৃত নজরদারিনির্ভর কাঠামোর ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তার আশঙ্কা, জুয়া দমনের লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবে এটি ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, জুয়া ও বেটিং-সংশ্লিষ্ট অপরাধ দমন অবশ্যই প্রয়োজনীয়। তবে বিচারিক তদারকি বা পরোয়ানা ছাড়াই বিভিন্ন সংস্থাকে ব্যাপক অনুসন্ধান ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হলে মানবাধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। তিনি মনে করেন, সংসদে বিল উত্থাপনের আগে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত নিয়ে খসড়াটি আরও পর্যালোচনা করা উচিত।

