দায়িত্ব গ্রহণের আগেই বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ আরও সহজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশে ভারতের নবনিযুক্ত হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী। বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের পর তিনি বলেছেন, দুই দেশের মানুষের মধ্যে সম্পর্ক আরও গভীর করতে ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতা দূর করার বিষয়ে আশাবাদী তিনি। পারস্পরিক ভালোবাসা, আস্থা ও আন্তরিকতার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন ভারতের এই জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক।
শুক্রবার (১২ জুন) দুপুরে যশোরের শার্শা উপজেলার বেনাপোল-পেট্রাপোল স্থলবন্দর হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন দিনেশ ত্রিবেদী ও তার সহধর্মিণী মৃণাল ত্রিবেদী। সীমান্তে তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়। পরে ইমিগ্রেশন ও আনুষ্ঠানিকতা শেষে তিনি সড়কপথে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন।
বাংলাদেশে পা রেখেই সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে নতুন হাইকমিশনার বলেন, ‘ভারত ও বাংলাদেশ কেবল প্রতিবেশী নয়, আমরা একটি বৃহৎ পরিবারের অংশ। আমাদের আকাশ এক, বাতাস এক, ইতিহাস এক এবং অনেক চ্যালেঞ্জও অভিন্ন। তাই দুই দেশের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে আমরা একসঙ্গে কাজ করব। ভিসাসহ যেসব বিষয়ে মানুষের ভোগান্তি রয়েছে, সেগুলোর সমাধানও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই সম্ভব।’
তিনি বলেন, ‘আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দুই দেশের জনগণের সম্পর্ক। সরকার আসে-যায়, কিন্তু জনগণের বন্ধন অটুট থাকে। আমরা সবাই ভাই-বোনের মতো। ভালোবাসা ও আন্তরিকতা থাকলে কোনো সমস্যাই অমীমাংসিত থাকে না।’
দিনেশ ত্রিবেদী আরও বলেন, বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক শুধু সীমান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সংস্কৃতি, ভাষা, ইতিহাস ও আত্মিক বন্ধনের মধ্য দিয়েও দুই দেশের মানুষ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। এই সম্পর্ককে আরও দৃঢ় ও অর্থবহ করে তোলাই হবে তার প্রধান লক্ষ্য।
বেনাপোল-পেট্রাপোল নোম্যান্স ল্যান্ডে নবনিযুক্ত হাইকমিশনারকে স্বাগত জানান বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার পবন কুমার তুলসীদাস এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি চিফ অব প্রটোকল কর্মকর্তা আরিফ মাহমুদ। এ সময় বেনাপোল পোর্টের পরিচালক শামীম হোসেন, শার্শা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফজলে ওয়াহিদ, ইমিগ্রেশনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সৈয়দ মোর্তজা আলী, বেনাপোল পোর্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আশরাফ হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান আঞ্চলিক ও দ্বিপাক্ষিক বাস্তবতায় দিনেশ ত্রিবেদীর নিয়োগ বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। সাধারণত ভারতীয় পররাষ্ট্র ক্যাডারের কূটনীতিকদের হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও এবার ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিয়েছে নয়াদিল্লি। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সাবেক মন্ত্রী এবং পশ্চিমবঙ্গের ব্যারাকপুর লোকসভা আসনের সাবেক সংসদ সদস্য দিনেশ ত্রিবেদীকে গত এপ্রিলে ঢাকায় ভারতের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫৫ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো সক্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে পাঠানো হলো। ফলে তার নিয়োগকে কেবল কূটনৈতিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
৭৫ বছর বয়সী দিনেশ ত্রিবেদী ভারতের সাবেক রেলমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। পর্যবেক্ষকদের ধারণা, তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও আঞ্চলিক বাস্তবতা সম্পর্কে গভীর জ্ঞান দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং জনগণের পারস্পরিক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে ভূমিকা রাখতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি। পাশাপাশি সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সংযোগ অবকাঠামো, নিরাপত্তা সহযোগিতা, নদীর পানি বণ্টন এবং জনগণের যাতায়াতসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হিসেবে রয়েছে। নতুন হাইকমিশনার দায়িত্ব গ্রহণের পর এসব বিষয়ে আলোচনা ও সহযোগিতার নতুন গতি আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ঢাকায় পৌঁছে দিনেশ ত্রিবেদী শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন এবং বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শুরু করবেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন