গত ১১ জুন শুরু হয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসর ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ। টুর্নামেন্ট শুরুর আগ থেকেই বাংলাদেশের সড়কজুড়ে বিভিন্ন দেশের রঙিন পতাকার ছড়াছড়ি দেখা যায়। খেলা শুরু হওয়ার পর সেই উন্মাদনা যেন আরও বেড়ে গেছে। নিজ নিজ প্রিয় দলের প্রতি সমর্থন জানাতে ভক্তরা বাড়ি, ছাদ, সড়ক ও বিভিন্ন স্থাপনায় বিদেশি পতাকা টাঙাচ্ছেন। প্রথমে বিষয়টি স্বাভাবিক সমর্থন বা ফুটবলপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ মনে হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি পতাকা টাঙাতে গিয়ে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।
১৭ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ- ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের জন্য যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। তবুও দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটিতেই ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার মতো ফুটবল পরাশক্তির লাখো একনিষ্ঠ সমর্থক রয়েছে।
মে মাস থেকেই ফুটবলপ্রেমীরা নিজেদের পছন্দের দলের বিশাল পতাকা টাঙিয়ে একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। এটি এমন এক বিরল সময়, যখন প্রবল দেশপ্রেমী বাংলাদেশিরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিদেশি পতাকা ধারণ করেন। রাজধানীর গুলশানসহ বিভিন্ন এলাকায় লিওনেল মেসির বিশাল কাট-আউট দেখা গেছে। একই সঙ্গে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের রেপ্লিকা জার্সি কিনতে ক্রীড়াপণ্য বিক্রির দোকানগুলোতে ভিড় করছেন সমর্থকেরা।
বাংলাদেশের সঙ্গে বিশেষ কোনো ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার প্রতি এই ভালোবাসা বহু প্রজন্মের। বিশ্বকাপ এলেই সেই আবেগ বন্ধু, আত্মীয় কিংবা প্রতিবেশীদের মধ্যেও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার রূপ নেয়।
চলতি মাসের শুরুতে হবিগঞ্জে একটি স্থানীয় ফুটবল ম্যাচকে কেন্দ্র করে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে কয়েক ডজন মানুষ আহত হন। অন্যদিকে শরীয়তপুরের একদল তরুণ ঘোষণা দিয়েছেন, ব্রাজিল নতুন করে বিশ্বকাপ না জিতা পর্যন্ত তারা বিয়ে করবেন না।
যদিও ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থকই সবচেয়ে বেশি, তবুও বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া অন্যান্য দেশের প্রতিও অনেকের আগ্রহ রয়েছে। ৭২ বছর বয়সী আমজাদ হোসেন নিজের জমির একটি অংশ বিক্রি করে ৭.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ জার্মানির পতাকা তৈরি করেছেন। তার ইচ্ছা, একদিন এই বিশাল পতাকাটি জার্মানির কোনো জাদুঘরে স্থান পাবে।
এবার ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা নরওয়েও বাংলাদেশের ফুটবল উন্মাদনাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে। দেশটির দূতাবাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে বাংলাদেশের সমর্থকদের ভাইকিংদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানায়। তারা স্মরণ করিয়ে দেয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর স্বীকৃতি প্রদানকারী প্রথম দিকের দেশগুলোর একটি ছিল নরওয়ে। পোস্টে বলা হয়, ‘দুর্বলদের সমর্থন করার সময় এসেছে, একসঙ্গে বড় স্বপ্ন দেখার সময় এসেছে।’
এবারের বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশ নিচ্ছে। ফলে টুর্নামেন্টটি রেকর্ড ১০৪টি ম্যাচে সম্প্রসারিত হয়েছে, যা ১৯ জুলাই পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় অনুষ্ঠিত হবে।
২০২২ সালের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ফুটবল উন্মাদনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোচনার জন্ম দেয়। ফিফা এবং আর্জেন্টিনা দলের খেলোয়াড়রাও বাংলাদেশের সমর্থনের কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছিলেন। আর এই ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দুতে দীর্ঘদিন ছিলেন কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনা।
ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশরা কলকাতায় ফুটবলের প্রচলন করে। পরবর্তীকালে ষাট ও সত্তরের দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় অনেক তরুণ ব্রাজিল দলের নান্দনিক ফুটবলে অনুপ্রাণিত হন। পেলে হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের এক প্রজন্মের ক্রীড়া আইকন।
আশির দশকে টেলিভিশনের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ফুটবল বিশ্বকাপের জনপ্রিয়তাও বাড়তে থাকে। অনেক বাংলাদেশির জন্য ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপই ছিল প্রথম রঙিন টেলিভিশনে বিশ্বকাপ দেখার অভিজ্ঞতা। সেই আসরে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দিয়েগো ম্যারাডোনার ঐতিহাসিক গোল দুটি অনেকের কাছে কেবল ফুটবল নয়, বরং এক সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তির বিপক্ষে প্রতীকী বিজয় হিসেবেও প্রতিধ্বনিত হয়।
বর্তমান প্রজন্মের আর্জেন্টিনা সমর্থকদের আবেগের কেন্দ্র লিওনেল মেসি, আর ব্রাজিল সমর্থকদের কাছে নেইমার অন্যতম প্রিয় তারকা।
তবে এই উন্মাদনা অনেক সময় সহিংসতায় রূপ নেয়। এক সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২২ সালের বিশ্বকাপ চলাকালে প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের সংঘর্ষে ২৩ জন নিহত হন। এছাড়া ২০১৪ সালে বৈদ্যুতিক তারে পতাকা টাঙাতে গিয়ে অন্তত তিনজনের মৃত্যু হয়। ২০১৮ সালে ব্রাজিলের পতাকা টাঙানোর সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে এক ১২ বছর বয়সী শিশুর মৃত্যু হয় এবং প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের মিছিলের সংঘর্ষে এক ব্যক্তি ও তার ছেলে গুরুতর আহত হন।
বাংলাদেশ বিশ্বকাপে অংশ নিতে না পারলেও ফুটবলকে ঘিরে মানুষের আবেগ ও উন্মাদনা বিশ্বদরবারে এক অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে। তবে সেই আবেগ যেন কোনোভাবেই সহিংসতা বা প্রাণহানির কারণ না হয়—এমন প্রত্যাশাই সচেতন মহলের।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন