সরকার বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত, অপসারিত, অব্যাহতি পাওয়া এবং বরখাস্ত হওয়া মোট ১৫০ জন সাবেক কর্মকর্তাকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি, বকেয়া বেতন-ভাতা এবং বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে চাকরিজীবনে বৈষম্য ও প্রশাসনিক অবিচারের শিকার হয়েছেন এমন অভিযোগের ভিত্তিতে আবেদন পর্যালোচনা করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বুধবার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। প্রতিরক্ষাসচিব মো. আশরাফ উদ্দিন স্বাক্ষরিত ওই প্রজ্ঞাপনে নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সুবিধাপ্রাপ্তদের মধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১১৫ জন, নৌবাহিনীর ২১ জন এবং বিমানবাহিনীর ১৪ জন কর্মকর্তা রয়েছেন।
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অনেক কর্মকর্তার বাধ্যতামূলক বা অকালীন অবসর বাতিল করে তাদের চাকরি নির্ধারিত বয়সসীমা পর্যন্ত বহাল ছিল বলে গণ্য করা হয়েছে। একই সঙ্গে অনেককে ভূতাপেক্ষভাবে লেফটেন্যান্ট জেনারেল, মেজর জেনারেল, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও কর্নেল পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট পদমর্যাদার ভিত্তিতে তারা বকেয়া বেতন-ভাতা ও বিধি অনুযায়ী অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পাবেন।
এ ছাড়া কয়েকজন কর্মকর্তার জন্য বিশেষ আর্থিক ও প্রশাসনিক সুবিধাও অনুমোদন করা হয়েছে। কারও জন্য ৫০ লাখ টাকা এবং কারও জন্য সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা পর্যন্ত বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বয়স ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সরকারি কিংবা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের সুযোগও রাখা হয়েছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটির সুপারিশ এবং তিন বাহিনীর সদর দপ্তরের মতামত পর্যালোচনা করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে প্রত্যেক কর্মকর্তার সংশোধিত অবসরের ধরন, পদোন্নতি, চাকরির মেয়াদ এবং প্রাপ্য সুবিধার বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে।
সুবিধাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন মেজর জেনারেল সৈয়দ ফাতেমী আহমেদ রুমী। ২০০৯ সালে তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হলেও নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তার অবসর ২০১৩ সালে স্বাভাবিক অবসর হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ফলে তিনি ওই সময়ের মেজর জেনারেল পদমর্যাদার বকেয়া বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা পাবেন।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহিল আমান আযমীকেও বড় ধরনের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ২০০৯ সালে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হলেও নতুন সিদ্ধান্তে তাকে ২০১১ সালে ভূতাপেক্ষ মেজর জেনারেল এবং ২০১৪ সালে অবসরের আগে ভূতাপেক্ষ লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। তিনি সংশ্লিষ্ট পদগুলোর বকেয়া বেতন-ভাতা, অন্যান্য আর্থিক সুবিধা, এক কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা এবং সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের সুযোগ পাবেন।
এ ছাড়া ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আনিসুজ্জামান ভূঁইয়াকে ভূতাপেক্ষ মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করে তার চাকরির মেয়াদ ২০১৮ সাল পর্যন্ত গণ্য করা হয়েছে। এতে তিনি অতিরিক্ত দুই বছরের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা লাভ করবেন।
নৌবাহিনীর রিয়ার অ্যাডমিরাল মোস্তাফিজুর রহমানের ক্ষেত্রেও চাকরির মেয়াদ বাড়িয়ে ২০১৫ সাল পর্যন্ত স্বাভাবিক অবসর হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ফলে অতিরিক্ত পাঁচ বছরের বকেয়া বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা তার প্রাপ্য হবে।
বিমানবাহিনীর এয়ার ভাইস মার্শাল মুহাম্মদ দেলোয়ার হোসেনের চাকরির মেয়াদও ছয় বছর বাড়িয়ে ২০১৫ সাল পর্যন্ত গণ্য করা হয়েছে। এর ফলে ওই সময়ের বকেয়া বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য প্রাপ্য সুবিধা তিনি পাবেন।
সরকার জানিয়েছে, জনস্বার্থে জারি করা এ আদেশ বাস্তবায়ন করবে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ। একই সঙ্গে এ বিষয়ে চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারির পূর্ববর্তী প্রজ্ঞাপন বাতিল করা হয়েছে।
জানা গেছে, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে তিন বাহিনীতে বৈষম্য ও প্রশাসনিক হয়রানির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলো পৃথক পর্যালোচনা বোর্ড গঠন করে। পরে প্রধান উপদেষ্টার প্রতিরক্ষা ও জাতীয় সংহতিবিষয়ক বিশেষ সহকারীর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির চূড়ান্ত সুপারিশের ভিত্তিতেই সরকার এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। কমিটির মতে, অতীতে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও প্রশাসনিক বৈষম্যের শিকার কর্মকর্তাদের মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।


