ঢাকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টা- মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে একজন মেডিকেল ইন্টার্ন থেকে আন্তর্জাতিক গবেষণা অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে ওঠার গল্প এটি। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সাবেক ইন্টার্ন চিকিৎসক ডা. ইফতেখার আহমেদ সাকিব বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমোরি ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের সংক্রামক রোগ বিভাগে ক্লিনিক্যাল রিসার্চ কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কর্মরত। তিনি বর্তমানে HIV নিরাময়, চিকিৎসা বৈষম্য এবং বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার সঙ্গে যুক্ত।
২০২৩ সাল থেকেই মেডিকেল শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি HIV নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষের জন্য বৈষম্যহীন, মানবিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতেন ডা. সাকিব। একই সঙ্গে বাংলাদেশে HIV সেবার জন্য একটি আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যও ছিল তার। সেই স্বপ্নপূরণের পথে বড় এক মাইলফলক আসে ২০২৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি, যখন মেডিকেল ইন্টার্নশিপের শেষ দিনেই তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে নিয়োগপত্র পান।
যুক্তরাষ্ট্রে যোগদানের পরপরই তাকে HIV বিষয়ক দুটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা— BARI-CURE এবং BARI-CNS— প্রকল্পে নেতৃত্বের দায়িত্ব দেওয়া হয়। বর্তমানে ব্যবহৃত অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল ওষুধ HIV-কে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হলেও ভাইরাসকে সম্পূর্ণরূপে শরীর থেকে দূর করতে পারে না। কারণ HIV শরীরের কিছু কোষে সুপ্ত অবস্থায় থেকে যায় এবং ওষুধ বন্ধ করলে পুনরায় সক্রিয় হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ডা. সাকিবের গবেষণার মূল লক্ষ্য হলো HIV শরীরের কোথায় লুকিয়ে থাকে, কীভাবে দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকে এবং কীভাবে একদিন সেটিকে সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করা সম্ভব হতে পারে তা খুঁজে বের করা। Baricitinib নামের একটি ওষুধ ব্যবহার করে এই সুপ্ত ভাইরাস নির্মূলের সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে।
গবেষণাটি সফল হলে HIV-এর একটি “Functional Cure” বা কার্যকর নিরাময়ের পথে বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জিত হতে পারে বলে আশা করছেন গবেষকরা।
গবেষকদের মতে, BARI-CURE এর মতো গবেষণা শুধু HIV আক্রান্ত মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সহায়ক হবে না, বরং বিশ্বকে HIV-মুক্ত ভবিষ্যতের আরও কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে। একজন বাংলাদেশি তরুণ চিকিৎসক হিসেবে ডা. সাকিব বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে এই গবেষণায় কাজ করছেন।
HIV গবেষণার পাশাপাশি তিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ COVID-19 গবেষণা উদ্যোগ RECOVER Study-এর Lead Coordinator হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের National Institutes of Health (NIH)-এর অর্থায়নে পরিচালিত RECOVER (Researching COVID to Enhance Recovery) প্রকল্পের লক্ষ্য হলো Long COVID-এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ এবং সংক্রমণের অনেক মাস বা বছর পরও কেন কিছু মানুষ বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক জটিলতায় ভোগেন, তার কারণ অনুসন্ধান করা।
এই প্রকল্পে ডা. সাকিব Long COVID-এর ঝুঁকির কারণ, রোগের জৈবিক প্রক্রিয়া এবং সম্ভাব্য চিকিৎসা পদ্ধতি শনাক্ত করার কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
বর্তমান অবস্থানে পৌঁছানোর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সাত বছরের নিরলস পরিশ্রম, নেতৃত্ব ও আত্মত্যাগের গল্প। মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই তিনি নিজেকে শুধু একজন চিকিৎসক নয়, বরং একজন যুব নেতা ও জনস্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেন।
তিনি বাংলাদেশ মেডিকেল স্টুডেন্টস’ সোসাইটির (BMSS) সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সংগঠনটিকে দেশের অন্যতম সক্রিয় ও প্রভাবশালী মেডিকেল শিক্ষার্থী সংগঠনে পরিণত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তার নেতৃত্বে BMSS বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), UNFPA, UNICEF, UNAIDS, UNDP, DGHS, DGME, DGFP এবং বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তোলে।
তার সময়ে হাজার হাজার মেডিকেল শিক্ষার্থী গবেষণা, জনস্বাস্থ্য, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য, HIV, তামাক নিয়ন্ত্রণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রশিক্ষণ ও প্রকল্পে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছেন। অনেকের মতে, শিক্ষাজীবনে এই বিস্তৃত নেতৃত্ব ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতাই তাকে আন্তর্জাতিক গবেষণা অঙ্গনে কাজ করার জন্য প্রস্তুত করেছে।
কঠোর মেডিকেল পড়াশোনা, ওয়ার্ড, পেশাগত পরীক্ষা ও ইন্টার্নশিপের পাশাপাশি তিনি প্রতিদিনের গবেষণা, প্রশিক্ষণ, প্রকল্প ও স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম সমানতালে চালিয়ে গেছেন। তিনি UNESCO-এর Individual Specialist হিসেবে মাতৃ মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক জাতীয় গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন, Public Health Foundation-এর Research Fellow হিসেবে কাজ করেছেন, জাতিসংঘের Youth Advisory Group-এর সদস্য ছিলেন এবং বর্তমানে Johns Hopkins Bloomberg School of Public Health-এর Ascend Fellow হিসেবে যুক্ত আছেন।
উল্লেখ্য, তার অধিকাংশ কাজই ছিল স্বেচ্ছাসেবাভিত্তিক। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, পড়াশোনার বাইরে অতিরিক্ত সময় দিলে চিকিৎসা শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে ডা. সাকিব সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন।
HIV, মাতৃস্বাস্থ্য, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন, তামাক নিয়ন্ত্রণ, মেডিকেল শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা রাখার পাশাপাশি তিনি HIV আক্রান্ত ব্যক্তি, যৌনকর্মী, হিজড়া সম্প্রদায়, রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা ও মানবিক অধিকার নিয়ে কাজ করেছেন।
বাংলাদেশে মেডিকেল শিক্ষার্থী থাকাকালেই তিনি HIV, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য, মাইগ্রান্ট জনগোষ্ঠী, রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করেছেন। HIV সচেতনতা বৃদ্ধি, মেডিকেল শিক্ষার্থীদের ART Center ও Drop-in Center পরিদর্শন এবং সংক্রামক রোগ নিয়ে গবেষণার সংস্কৃতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তিনি ভূমিকা রাখেন।
বর্তমানে HIV Cure Research, Long COVID Research এবং অন্যান্য সংক্রামক রোগবিষয়ক গবেষণায় তার সম্পৃক্ততা দেখায়, কীভাবে বাংলাদেশের একজন তরুণ চিকিৎসক স্থানীয় পর্যায়ের জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম থেকে বৈশ্বিক গবেষণার অগ্রভাগে পৌঁছাতে পারেন।
বর্তমানে তিনি এমোরি ইউনিভার্সিটি, Atlanta Veterans Affairs Medical Center, Emory Hospital এবং Grady Hospital-এর বিভিন্ন গবেষণা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। মাত্র ২৫ বছর বয়সে এমোরি ইউনিভার্সিটির সংক্রামক রোগ গবেষণা দলে যুক্ত হতে পারা তার জন্য যেমন একটি বড় অর্জন, তেমনি আন্তর্জাতিক গবেষণা অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
HIV গবেষণার ক্ষেত্রে এমোরি ইউনিভার্সিটি বিশ্বব্যাপী অন্যতম প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। গত চার দশকে HIV চিকিৎসা, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল, অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি এবং HIV আক্রান্ত মানুষের দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিতে প্রতিষ্ঠানটির গবেষকদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।
একইভাবে Grady Hospital যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম HIV সেবা কেন্দ্রগুলোর একটি এবং Atlanta Veterans Affairs Medical Center দেশটির সাবেক সামরিক সদস্যদের জন্য বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা ও গবেষণা পরিচালনা করে।
যে বয়সে অধিকাংশ তরুণ চিকিৎসক তাদের পেশাগত জীবন শুরু করেন, সেই বয়সেই বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় HIV, COVID-19 এবং সংক্রামক রোগবিষয়ক গবেষণা প্রকল্পে যুক্ত হয়ে ডা. ইফতেখার আহমেদ সাকিব এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছেন, যেখানে তার কাজ ভবিষ্যতে লাখ লাখ মানুষের চিকিৎসা ও জীবনমান উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে।
গবেষণার প্রতি তার আগ্রহের অন্যতম কারণ বাংলাদেশের মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য গবেষণার সীমিত সুযোগ। তাঁর মতে, দেশের অধিকাংশ মেডিকেল শিক্ষার্থী কঠোর একাডেমিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করলেও গবেষণা, বৈজ্ঞানিক লেখালেখি বা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম পান।
এই বাস্তবতা পরিবর্তনের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণার পাশাপাশি তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন “Young Researchers on Infectious Diseases” প্ল্যাটফর্ম। এর মাধ্যমে দেশের প্রায় ২০০ জন মেডিকেল ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে গবেষণার হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ, মেন্টরশিপ এবং বাস্তব গবেষণা প্রকল্পে অংশগ্রহণের সুযোগ দিচ্ছেন সম্পূর্ণ বিনা পারিশ্রমিকে।
ডা. সাকিব বলেন, “একসময় HIV মানেই ছিল ভয়। আমি স্বপ্ন দেখি আগামী ৩০ বছরে HIV হয়তো গুটিবসন্তের মতো অতীতের একটি আতঙ্ক হয়ে যাবে।”
আজ যখন তিনি আটলান্টার গবেষণাগারে বসে HIV নিয়ে কাজ করছেন, তখনো তার পরিচয়ের সবচেয়ে বড় অংশ বাংলাদেশ। তার বিশ্বাস, “Humanity should prevail, and research is the only way to save humanity।”
একজন তরুণ বাংলাদেশি চিকিৎসকের এই পথচলা আজ দেশের হাজারো শিক্ষার্থীর জন্য নতুন স্বপ্ন দেখার অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন