× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

উৎপল দাশগুপ্ত

প্রকাশিত: মে ১০, ২০২৬, ০১:৪৪ এএম

এনসিটিবির জালে ৭ প্রেস

উৎপল দাশগুপ্ত

প্রকাশিত: মে ১০, ২০২৬, ০১:৪৪ এএম

ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

নিয়মানুযায়ী প্রতিনিধিদলের সরেজমিন পরিদর্শন প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে মাতুয়াইলের আমাজন প্রিন্টিং প্রেসকে ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের মাধ্যমিক স্তরের ৯ম শ্রেণির ৬ লাখের বেশি বই ছাপানোর কাজ দেয় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। পরবর্তীতে মুদ্রণকালীন মাতুয়াইলের ওই ঠিকানায় প্রেসের কোনো অস্তিত্ব পায়নি এনসিটিবির প্রতিনিধিদল। প্রতিনিধিদলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিজস্ব প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে কাজ নিয়ে জালিয়াতি করে অন্য প্রতিষ্ঠানে বই ছাপানোর কাজ করেছে প্রেসটি। এনসিটিবি এই কাজকে ‘প্রতারণামূলক’ আখ্যা দিয়ে কারণ দর্শানো নোটিশ দিয়েছে প্রেসটিকে। শুধু আমাজনই নয়, পৃথক পৃথক অভিযোগে আরও ছয়টি প্রেসকে তাদের নানা অনিয়মের বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে কারণ জানতে চেয়েছে এনসিটিবি। উত্তর দেওয়ার জন্য সাত কর্মদিবস সময় দিয়ে গত ৩ মে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় এনসিটিবি। অভিযুক্ত সাত প্রেসের উত্তর যাচাই করে দোষীদের বিরুদ্ধে আর্থিক জরিমানাসহ এনসিটিবির কালো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। কালোতালিকায় পড়া প্রেসগুলো আগামীতে বই ছাপার কাজ করতে পারবে না। এনসিটিবি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

বই ছাপার কাজে এনসিটিবির প্রতিনিধিদল যে সাতটি প্রেসের অনিয়ম পেয়েছে সেগুলো হলো- মাধ্যমিক স্তরে আমাজন প্রিন্টার্স, বর্ণমালা প্রেস, হাক্কানী প্রিন্টার্স, সোহাগী প্রিন্টার্স ও পিবিএস প্রিন্টার্স। অন্যদিকে প্রাথমিক স্তরে রয়েছে টাঙ্গাইল প্রিন্টার্স ও নাহার প্রিন্টিং প্রেস। 

এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) প্রফেসর মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু স্বাক্ষরিত আমাজন প্রিন্টার্সকে দেওয়া কারণ দর্শানোর নোটিশে বলা হয়েছে, ‘২০২৫ শিক্ষাবর্ষের দরপত্র মূল্যায়নের সময় এনসিটিবির প্রতিনিধিদল আপনার প্রদত্ত ঠিকানায় সরেজমনি পরিদর্শন করে মুদ্রণ ও বাঁধাই চালু অবস্থায় দেখতে পায়। পরবর্তীতে মুদ্রণকালীন উক্ত ঠিকানায় প্রেসের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এটি একটি প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড বিধায় পিপিআর বিধি, ২০২৫-এর ১৪৯ (৩) ধারা মোতাবেক আপনার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কেন প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না...?’ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বর্ণমালার বিরুদ্ধে চুক্তি অনুযায়ী দুটি লটের বই ছাপতে না পারা, হাক্কানী প্রিন্টার্সের বিরুদ্ধে কাটার মেশিন না থাকা এবং পরিবেশ ভালো না হওয়া, পিবিএস প্রিন্টার্সের বিরুদ্ধে বই ছাপার চূড়ান্ত সময়ে ওষুধ কোম্পানির লিফলেট ছাপানো, সোহাগী প্রিন্টার্সের ভৌত অবকাঠামো সন্তোষজনক না হওয়া, নাহার প্রেসের বিরুদ্ধে খারাপ বই ছাপা ও টাঙ্গাইল প্রেসের বিরুদ্ধে পুরোনো মেশিনে বই ছাপার অভিযোগ রয়েছে। এনসিটিবির পাঠ্যপুস্তক, শিক্ষা ও সম্পাদনা, বিতরণ ও উৎপাদন শাখা সূত্র এসব তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছে। 

বিতরণ শাখার একটি সূত্র বলেছে, ‘অভিযুক্তদের কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তাদের উত্তর পেলে এনসিটিবির চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো হবে। উত্তরসমূহ যাচাই-বাছাই করে দোষী হলে শাস্তি পাবে। আর কর্তৃপক্ষের কাছে যদি মনে হয় অনিচ্ছাকৃত ভুল অথবা পরিস্থিতির কারণে ঘটেছে, সে ক্ষেত্রে অভিযোগ থেকে মুক্তও হতে পারে।’ অভিযুক্তদের মধ্যে কারো কারো বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়ার যথেষ্ট গ্রাউন্ড আছে বলে মনে করে এই সূত্র। তবে অভিযুক্তদের সরবরাহ করা বইয়ের মান কম-বেশি ভালো ছিল বলেও জানায় এই সূত্র।

অন্যদিকে শিক্ষা ও সম্পাদনা শাখার একটি সূত্র এনসিটিবির প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে অভিযুক্ত একটি প্রেস সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দিয়েছে। এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমি যে প্রেসটি পরিদর্শন করেছি, তার বড় মেশিন নাই, ভৌত অবকাঠামো মোটেই ভালো না। প্রেসের মালিক আগামীতে ভালো করবে বলে একাধিকবার প্রতিশ্রুতি দিলেও একই কাজ করে যায়। এনসিটিবির ছাপার কাজের যে শর্ত তা কোনোভাবেই পূরণ করতে পারেনি প্রেসটি।’ 

অন্যদিকে এনসিটিবির কেন্দ্রীয় মনিটরিং কমিটির একটি সূত্র বলেছে, ‘বর্ণমালা প্রেসের বইয়ের ছাপা ভালো হয়েছে। তবে বই ছাপার শেষমূহূর্তে ওরা দুটি লটের বই ছাপতে পারেনি। ওরা বলেছে, ব্যাংকের টাকা পায়নি, কিন্তু এটা তো এনসিটিবির দেখার বিষয় না। ওরা যেহেতু কাজ পেয়েছে, চুক্তি করেছে, যেভাবেই হোক কাজটা উঠিয়ে দেওয়া তাদেরই দায়িত্ব। প্রায় ৪ লাখ শিক্ষার্থী এ দুই লটের বইয়ের ওপর নির্ভর ছিল।’ তিনি জানান, পরবর্তীতে এনসিটিবি কর্তৃপক্ষ নিজেরা দায়িত্ব নিয়ে অন্য প্রেসের সঙ্গে অ্যারেঞ্জমেন্ট করে এ বই ছাপার কাজ শেষ করে। 

এনসিটিবির কারণ দর্শানো নোটিশ পেয়ে গত বৃহস্পতিবার উত্তর দিয়েছেন বলে জানান আমাজন প্রেসের মালিক মমিনুল হক। তিনি বলেন, ‘আমার প্রেসে তিন মাস কাজ হয়েছে। চার-পাঁচটি ইউনিট কাজ করেছে। এনসিটিবির প্রতিনিধিদল কেন দেখতে পায়নি জানি না।’ 

অন্যদিকে টাঙ্গাইল প্রেসের মালিক এমদাদ বলেন, ‘ওরা (এনসিটিবি) বলছে ছাপার মেশিন পুরোনো। ভৌত অবকাঠামো ভালো না ইত্যাদি।’ তিনি জানান, আজ রোববার এনসিটিবির কারণ দর্শানো নোটিশের উত্তর দেবেন। 

বিগত দুই বছর প্রাথমিক স্তরের বই ছাপার কাজে ব্যাপক গুণগত পরিবর্তন হয়েছে। এই স্তরে মানসম্পন্ন বই দিয়ে প্রশংসিত উৎপাদন নিয়ন্ত্রক প্রফেসর মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু বর্তমানে এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) পদে দায়িত্ব পালন করছেন। ছাপার অনিয়মে প্রেসগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘২০২৭ শিক্ষাবর্ষ সামনে রেখে এনসিটিবির পদক্ষেপে প্রেস সেক্টরে একটি বার্তা যাবে যে, কোনো ধরনের অনিয়ম করে পার পাওয়া যাবে না। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।’ তিনি আর বলেন, ‘আগামী শিক্ষাবর্ষে নতুন তিনটি বই পাবে শিক্ষার্থীরা। সব বই যাতে মানসম্পন্ন হয়, তার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।’ অন্যদিকে প্রাথমিকের ভালো কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আগামী শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের বই অধিকতর মানসম্পন্ন করার ক্ষেত্রে নতুন দায়িত্ব পাওয়া এনসিটিবি এই সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) ভালো করবেন বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে এ বিষয়ে বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, ‘এনসিটিবির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রেস সীমিত। আমরা সবাই এসব প্রেস সম্পর্কে অবহিত। এনসিটিবিও জানে। তার পরও প্রেসগুলো কোন পরিদর্শনের ভিত্তিতে কাজ পায়, সেটাও তদন্তের আওতায় আসা উচিত। বিগত সরকারের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে পুষ্ট হয়ে এনসিটিবির কর্মকর্তা-প্রেস যারাই অনিয়মের  সঙ্গে যুক্ত, তা তদন্ত করে পরিষ্কার করা না হলে গুণগত মানসম্পন্ন বই দেওয়ার আশা কখনোই পূরণ হবে না।’

২০২৫ শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিক থেকে প্রাথমিকের পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সাড়ে ৮ কোটি বই ছাপার কাজ করেছে ৬৭টি প্রেস। অন্যদিকে মাদ্রাসার ইবতেদায়ি স্তরের প্রথম থেকে পঞ্চম ও ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির সাড়ে ২১ কোটি বই ছাপার কাজ করেছে ১০৩টি প্রেস। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পুরো বই ছাপার কাজ ৮১৪টি লটে ভাগ করে দেওয়া হয়। প্রথাগত নিয়ম অনুযায়ী উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে লটপ্রতি সর্বনিম্ন দরদাতাকে ছাপার কাজ দেওয়ার সুপারিশ করে এনসিটিবির দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি। এর আগে সংশ্লিষ্ট লটের বই ছাপার জন্য মনোনীত সর্বনিম্ন দরদাতার প্রেস কাজটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করতে পারবে কি না, তা সরেজমিন পরিদর্শন করে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটিকে প্রতিবেদন দেয় এনসিটিবির কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত মনিটরিং কমিটি বা প্রতিনিধিদল। পরবর্তীতে বই ছাপার কাজ শুরু হওয়ার পর এনসিটিবির মনিটরিং কমিটি প্রেসগুলো সরেজমিন পরিদর্শন করে কাজ সুষ্ঠুভাবে হচ্ছে কি না, সেই প্রতিবেদন দেয়। 

জানা গেছে, বই ছাপার কাজ নজরদারির জন্য এনসিটিবির কর্মকর্তাদের নিয়ে মাধ্যমিক স্তরে ৩৪টি ও প্রাথমিক স্তরে প্রায় সমপরিমাণ কমিটি গঠন করা হয়। দুই সদস্যবিশিষ্ট প্রতিটি কমিটি এনসিটিবির স্পেসিফিকেশন (কাগজ, কালি ও ছাপা) অনুযায়ী বই ছাপছে কি না, কিংবা কাজ পাওয়ার আগে এনসিটিবিতে জমা দেওয়া প্রেসের ভৌত অবকাঠামো তখনো কার্যকর কি না, প্রেসগুলো বই ছাপার কাজ ফেলে রেখে অন্য কিছু ছাপছে কি না ইত্যাদি নজরদারিসহ সার্বিকভাবে বই ছাপার জন্য প্রেসের পরিবেশ সহায়ক কি না, তা নজরদারি করে প্রতিবেদন জমা দেয়। 

প্রসঙ্গত, মনিটিরিং কমিটির বাইরেও বইয়ের কাজ তদারকির জন্য দুই ধাপে তৃতীয়পক্ষ হিসেবে দুটি ইন্সপেকশন এজেন্ট নিয়োগ দেয় এনসিটিবি। বই ছাপা শুরু থেকে সরবরাহ পর্যায় পর্যন্ত প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশন (পিডিআই) ও জেলা-উপজেলা পর্যায়ে বই সরবরাহের পর পোস্ট ল্যান্ডিং ইন্সপেকশন (পিএলআই) এজেন্ট বইয়ের মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করে। ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পিডিআই প্রতিবেদন বই ছাপা ও সরবরাহের সময়ই পেয়েছে এনসিটিবি। তবে প্রাথমিকের পিএলআই ইতিমধ্যে শেষ হলেও মাধ্যমিক স্তরের পিএলআইয়ের কাজ এখনো চলছে। 

আরও উল্লেখ্য, এনসটিবির সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী প্রেসগুলো বই সরবরাহের সময়ে ৮০ শতাংশ বিল উত্তোলন করতে পারে। বাকি ২০ শতাংশ বিল পিএলআই এজেন্টের প্রতিবেদনের পর পায় প্রেসগুলো। পিএলআই এজেন্টের প্রতিবেদনে কাজের ভালো-মন্দের বিবরণ যাচাই-বাছাই করে এনসটিবি প্রেসের বকেয়া ২০ শতাংশ বিল ছাড় করে। 

জানা গেছে, অন্যান্য সময়ের তুলনায় ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের বই গুণে-মানে ভালো ছিল। এর প্রধান কারণ ছিল এনসিটিবির সার্বক্ষণিক নজরদারির পাশাপাশি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পিডিআই ইন্সপেকশন এজেন্টদের সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন। এনসটিবির তথ্য-উপাত্ত থেকে দেখা গেছে, প্রাথমিকের বই ছাপার সময় সময় পিডিআই ইন্সপেকশন এজেন্ট খারাপ কাগজ বাতিল করেছে ২ হাজার ৮০৪ টন, যা দিয়ে প্রায় ৫০ লাখ কপি বই তৈরি হতো। অন্যদিকে মাধ্যমিক স্তরে প্রায় ৪৬১২ টন খারাপ কাগজ প্রেসগুলো থেকে অসারণ করা হয়েছে, যা দিয়ে ২৫ লাখ কপি বই তৈরি করা হতো।   

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!