একবিংশ শতাব্দীর নির্বাচনব্যবস্থা আর কেবল ব্যালট বাক্স, ভোটকেন্দ্র কিংবা মাইকিংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন সংবাদপোর্টাল ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এখন নির্বাচনি রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই বাস্তবতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই একদিকে যেমন তথ্যপ্রযুক্তির নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে, অন্যদিকে তেমনি এআই-নির্ভর গুজব হয়ে উঠেছে নির্বাচনি পরিবেশের এক ভয়ংকর, অদৃশ্য হুমকি। এই হুমকি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু এর প্রভাব গভীর, দীর্ঘস্থায়ী এবং অনেক সময় অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এআই প্রযুক্তির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো ‘ডিপফেক’। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তির মুখ, কণ্ঠস্বর বা আচরণ এমনভাবে নকল করা যায়, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে সত্য-মিথ্যা যাচাই করা প্রায় অসম্ভব। নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক নেতাদের ভুয়া বক্তব্য, আপত্তিকর ভিডিও বা বিভ্রান্তিকর অডিও ছড়িয়ে দেওয়া হলে মুহূর্তের মধ্যেই জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। একটি পরিকল্পিত ডিপফেক ভিডিও একটি নির্বাচনি এলাকার ভোটারদের মনোভাব বদলে দিতে পারে, সহিংসতা উসকে দিতে পারে কিংবা পুরো নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলতে পারে।
এআই-নির্ভর গুজবের আরেকটি বড় শক্তি হলো এর ব্যাপকতা ও গতি। আগে গুজব ছড়াতে সময় লাগত, মুখে মুখে কিংবা সীমিত পরিসরে তা বিস্তার লাভ করত। কিন্তু এখন একটি ভুয়া তথ্য কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাজারো ফেসবুক গ্রুপ, হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল ও ইউটিউব ভিডিওতে ছড়িয়ে পড়ে। এআই অ্যালগরিদম ব্যবহার করে নির্দিষ্ট শ্রেণি, বয়স বা রাজনৈতিক প্রবণতাসম্পন্ন মানুষের কাছে লক্ষ্যভিত্তিক গুজব পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। ফলে ভোটারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এআই-নির্ভর গুজব ইতোমধ্যে নির্বাচনি গণতন্ত্রকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নির্বাচনের আগে ভুয়া ভিডিও ও কৃত্রিম কণ্ঠস্বরের মাধ্যমে প্রার্থীদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর উদাহরণ রয়েছে। এসব ঘটনায় দেখা গেছে, নির্বাচন শেষ হলেও বিভ্রান্তির রেশ থেকে যায় দীর্ঘদিন। সামাজিক বিভাজন বাড়ে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের আস্থা কমে যায়। বাংলাদেশও এই ঝুঁকির বাইরে নয়; বরং প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার ও ডিজিটাল সচেতনতার ঘাটতির কারণে ঝুঁকি আরও বেশি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এআই-নির্ভর গুজব বিশেষভাবে বিপজ্জনক, কারণ এখানে রাজনৈতিক আবেগ প্রবল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি এখনো দুর্বল। অনেক সময় যাচাই ছাড়াই মানুষ শেয়ার করে বসে, ফলে গুজব সত্যের মতো প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়। নির্বাচনকালীন সময়ে এ ধরনের গুজব প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। সামান্য একটি ভুয়া খবর কেন্দ্র করে সহিংসতা, ভোটকেন্দ্রে উত্তেজনা বা নির্বাচন বর্জনের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
এআই-নির্ভর গুজবের প্রভাব শুধু ভোটের ফলাফলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে ক্ষয় করে, যুক্তিবোধকে দুর্বল করে এবং সমাজকে মেরুকরণ করে তোলে। মানুষ যখন আর কোনো তথ্যের ওপর আস্থা রাখতে পারে না, তখন ‘সবই সাজানো’—এই মানসিকতা জন্ম নেয়। এর ফলাফল হিসেবে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, যা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
এই সংকট মোকাবিলায় প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব রাষ্ট্রের। নির্বাচন কমিশন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এআই-নির্ভর ভুয়া কনটেন্ট শনাক্তে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আইনি কাঠামো শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কার্যকর সহযোগিতা জরুরি, যাতে ভুয়া কনটেন্ট দ্রুত অপসারণ করা যায়।
তবে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভোটারদের বুঝতে হবে, সব ভাইরাল ভিডিও বা অডিও সত্য নয়। তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব রয়েছে—সংবাদ প্রকাশের আগে যাচাই, ফ্যাক্ট-চেকিং এবং গুজব প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সিভিল সোসাইটির মাধ্যমে ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানো গেলে এআই-নির্ভর গুজবের প্রভাব অনেকটাই কমানো সম্ভব।
সবশেষে বলা যায়, এআই নিজে কোনো শত্রু নয়; শত্রু হলো এর অপব্যবহার। কিন্তু এই অপব্যবহার যদি নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, তবে নির্বাচন নামক গণতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসব অদৃশ্য এক হুমকির কাছে বন্দি হয়ে পড়বে। এআই-নির্ভর গুজবের বিরুদ্ধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতের নির্বাচন শুধু প্রযুক্তির দখলে যাবে না, বরং জনগণের আস্থাও হারাবে। গণতন্ত্র রক্ষার স্বার্থেই এই অদৃশ্য হুমকিকে দৃশ্যমান করে প্রতিরোধ গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি।
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক



