ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬

নারী নেতৃত্বের নতুন পাঠ: শক্তির অন্য নাম প্রজ্ঞা

কাজী জিয়া উদ্দিন
প্রকাশিত: জুলাই ২০, ২০২৬, ০৫:৩৭ পিএম
কাজী জিয়া উদ্দিন।

ইতিহাসের পাতায় কিছু নাম কেবল ব্যক্তি হিসেবে বেঁচে থাকে না; তারা হয়ে ওঠে এক একটি মানসিক ভূখণ্ড, এক একটি রাজনৈতিক দর্শন। সময়ের স্রোত পেরিয়ে তাঁদের পদচিহ্ন কেবল ক্ষমতার করিডোরে নয়, জাতির চেতনার গভীরেও অঙ্কিত হয়ে থাকে।

একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে দাঁড়িয়ে বিশ্ব এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে। একদিকে প্রযুক্তির বিস্ময়, অন্যদিকে যুদ্ধের বিভীষিকা; একদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থান, অন্যদিকে মানবিক বোধের সংকট। গণতন্ত্রের ভাষ্য যত জোরালো হয়েছে, নেতৃত্বের মান নিয়ে প্রশ্নও তত বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে নারী নেতৃত্বের প্রশ্নটি আর কেবল প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন নয়; এটি নেতৃত্বের প্রকৃতি, ক্ষমতার নৈতিকতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন নিয়ে এক গভীর পর্যালোচনার বিষয়।

মার্গারেট থ্যাচার এবং গোল্ডা মেয়ার—দুই ভিন্ন ভূখণ্ডের দুই নারী, কিন্তু ইতিহাস তাঁদের একই সারিতে বসিয়েছে। কারণ তাঁরা প্রমাণ করেছিলেন, নেতৃত্বের প্রকৃত পরিচয় লিঙ্গে নয়, সিদ্ধান্তে; জনপ্রিয়তায় নয়, দায়িত্ববোধে।

মার্গারেট থ্যাচার একবার বলেছিলেন—

“Being powerful is like being a lady. If you have to tell people you are, you aren't.”

এই একটি বাক্যের মধ্যেই ক্ষমতার এক অনন্য দর্শন নিহিত আছে। প্রকৃত নেতৃত্ব নিজের শক্তির বিজ্ঞাপন দেয় না; তার প্রভাবই তার পরিচয় বহন করে। আজকের পৃথিবীতে যেখানে অনেক নেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের করতালিকে জনসমর্থন বলে ভুল করেন, সেখানে থ্যাচারের এই উক্তি এক নির্মম কিন্তু প্রয়োজনীয় স্মারক।

তিনি আরও বলেছিলেন—

“Consensus is the absence of leadership.”

উক্তিটি বিতর্কিত হতে পারে, কিন্তু এর অন্তর্নিহিত সত্য উপেক্ষা করা কঠিন। নেতৃত্বের কাজ কেবল জনমত অনুসরণ করা নয়; কখনো কখনো অনিশ্চিত পথের দায় নিজের কাঁধে তুলে নেওয়াও নেতৃত্বের অপরিহার্য কর্তব্য। ইতিহাসের অধিকাংশ যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত প্রথমে জনপ্রিয় ছিল না; কিন্তু পরবর্তীকালে সেগুলোই জাতির গতিপথ নির্ধারণ করেছে।

অন্যদিকে গোল্ডা মেয়ার আমাদের শেখান নেতৃত্বের আরেকটি মাত্রা—অন্তর্গত দৃঢ়তা। তাঁর বিখ্যাত উক্তি—

“Trust yourself. Create the kind of self that you will be happy to live with all your life.”

রাষ্ট্র পরিচালনার সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে কোনো নেতা একা হয়ে যান। তখন পরামর্শদাতা, দল কিংবা জনমতের চেয়েও বেশি প্রয়োজন হয় নিজের বিবেকের প্রতি আস্থা। গোল্ডা মেয়ারের রাজনৈতিক জীবন সেই সত্যেরই এক জীবন্ত দলিল।

ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতা হলো—সংকটের সময়ই প্রকৃত নেতার জন্ম হয়। শান্ত সমুদ্রে সবাই দক্ষ নাবিক; ঝড়ই বলে দেয় কে আসলে হাল ধরতে পারে। ইয়ম কিপুর যুদ্ধের সময় গোল্ডা মেয়ার, ফকল্যান্ড যুদ্ধের সময় থ্যাচার, ইউরোজোন সংকটে অ্যাঞ্জেলা মের্কেল কিংবা ক্রাইস্টচার্চ হামলার পর জেসিন্ডা আরডার্ন—সবাই ভিন্নভাবে একটি অভিন্ন সত্য প্রমাণ করেছেন: নেতৃত্বের আসল পরীক্ষা বক্তৃতামঞ্চে নয়, সংকটের অন্ধকারে।

বিশ্বব্যাপী গবেষণাও ইঙ্গিত করে যে নারী নেতৃত্বের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণমূলক দৃষ্টিভঙ্গি, দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা এবং মানবিক সংবেদনশীলতার সমন্বয়। তবে এই শক্তি কোনো জৈবিক বৈশিষ্ট্যের কারণে নয়; বরং বহু প্রতিকূলতা অতিক্রম করে উঠে আসার অভিজ্ঞতা থেকে গড়ে ওঠা মানসিক দৃঢ়তার ফল।

জেসিন্ডা আরডার্ন একবার বলেছিলেন—

“Because I’m empathetic, it doesn’t mean I’m weak.”

আধুনিক নেতৃত্বের জন্য এর চেয়ে বড় শিক্ষা আর কী হতে পারে? দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে শক্তির সংজ্ঞা ছিল কঠোরতা, আগ্রাসন ও আধিপত্য। কিন্তু আজকের পৃথিবী ধীরে ধীরে উপলব্ধি করছে—সহানুভূতি দুর্বলতা নয়; এটি সভ্যতার অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক সম্পদ। যে নেতা মানুষের বেদনা বুঝতে পারেন না, তিনি শেষ পর্যন্ত মানুষের ভবিষ্যৎও নির্মাণ করতে পারেন না।

বাংলাদেশসহ সমগ্র উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় শিক্ষা নিহিত। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ব্যক্তি-নির্ভরতা প্রায়ই প্রতিষ্ঠানকে ছাপিয়ে যায়, আবেগ অনেক সময় যুক্তিকে পরাজিত করে, আর জনপ্রিয়তার ক্ষণস্থায়ী মোহ দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রস্বার্থকে আড়াল করে ফেলে। অথচ সফল নেতৃত্বের ইতিহাস বারবার বলছে—দূরদর্শিতা, সততা, জবাবদিহি এবং নৈতিক সাহসের কোনো বিকল্প নেই।

জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান যথার্থই বলেছিলেন—

“There is no tool for development more effective than the empowerment of women.”

তবে নারীর ক্ষমতায়নের প্রকৃত অর্থ কেবল সংখ্যাগত প্রতিনিধিত্ব নয়; বরং এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে নেতৃত্বের সুযোগ নির্ধারিত হবে যোগ্যতা, মেধা ও সততার ভিত্তিতে।

ইতিহাস আমাদের একটি গভীর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। পৃথিবী কখনো নেতাদের মনে রাখে না তাঁদের লিঙ্গ, বংশ বা দলের কারণে; ইতিহাস মনে রাখে তাঁদের সিদ্ধান্ত, তাঁদের সাহস এবং তাঁদের রেখে যাওয়া প্রভাবের জন্য।

মার্গারেট থ্যাচারের অদম্য সংকল্প, গোল্ডা মেয়ারের অবিচল আত্মবিশ্বাস, অ্যাঞ্জেলা মের্কেলের স্থির প্রজ্ঞা এবং জেসিন্ডা আরডার্নের মানবিকতা—সব মিলিয়ে আমাদের সময়ের জন্য একটি নতুন নেতৃত্ব-দর্শন নির্মাণ করে।

সেই দর্শনের সারকথা এক বাক্যে বলা যায়—

ক্ষমতা মানুষকে বড় করে না; প্রজ্ঞা, সাহস এবং মানবিকতাই একজন মানুষকে নেতৃত্বের আসনে আসীন করে।

লেখক: কলামিস্ট ও সাবেক ডিআইজি