ক্ষমতা সভ্যতার অপরিহার্য অনুষঙ্গ। কিন্তু ইতিহাসের দীর্ঘ পথচলা আমাদের আরেকটি সত্যও শিখিয়েছে—ক্ষমতার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ তার জবাবদিহি। রাষ্ট্র যখন নাগরিকের ওপর কর্তৃত্ব প্রয়োগ করে, তখন সেই কর্তৃত্বকে ন্যায়, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ রাখা গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত। অন্যথায় উন্নয়ন অবকাঠামো নির্মাণ করতে পারে, কিন্তু আস্থা নির্মাণ করতে পারে না; আইন প্রতিষ্ঠা করতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে না।
এই প্রেক্ষাপটে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম সফল ও নীরব প্রাতিষ্ঠানিক উদ্ভাবন হলো ওমবাডসম্যান (Ombudsman)—একজন স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং জনগণের পক্ষে দাঁড়ানো সাংবিধানিক বা আইনগত অভিভাবক, যার প্রধান কাজ প্রশাসনিক অন্যায়, অবহেলা, স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতি এবং নাগরিক হয়রানির বিরুদ্ধে প্রতিকার নিশ্চিত করা।
আজ যখন বিশ্বজুড়ে “Good Governance”, “Open Government”, “Citizen-Centric Administration” এবং “Institutional Accountability” উন্নয়নের কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয়, তখন ওমবাডসম্যান আর কোনো বিলাসিতা নয়; এটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অপরিহার্য নিরাপত্তা-ভালভ।
শব্দের ভেতরের দর্শন
"Ombudsman" শব্দটির জন্ম সুইডিশ ভাষায়। "Ombud" অর্থ প্রতিনিধি বা অভিভাবকসুলভ প্রতিনিধি, আর "man" অর্থ ব্যক্তি। আক্ষরিক অর্থে Ombudsman হলেন জনগণের প্রতিনিধি, যিনি প্রশাসনের বিরুদ্ধে জনগণের অভিযোগ শুনবেন এবং তদন্ত করবেন।
তবে শব্দটির অর্থ কেবল অভিধানিক নয়; এর ভেতরে লুকিয়ে আছে আধুনিক গণতন্ত্রের এক গভীর দর্শন—রাষ্ট্রের সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকও যেন সবচেয়ে শক্তিশালী আমলার বিরুদ্ধে ন্যায়সঙ্গত প্রতিকার চাইতে পারেন।
১৮০৯ সালে সুইডিশ সংবিধানের মাধ্যমে বিশ্বের প্রথম Parliamentary Ombudsman প্রতিষ্ঠিত হয়। ফরাসি বিপ্লব, সাংবিধানিক সংস্কার এবং রাজকীয় ক্ষমতার সীমারেখা নির্ধারণের যুগে সুইডেন উপলব্ধি করেছিল যে আদালত ও সংসদের পাশাপাশি এমন একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান দরকার, যা সরাসরি নাগরিকের অভিযোগ শুনবে।
দুই শতাব্দী পরে সেই ধারণা বিশ্বব্যাপী এক গণতান্ত্রিক মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে স্ক্যান্ডিনেভিয়া থেকে লাতিন আমেরিকা, ইউরোপ থেকে আফ্রিকা, এশিয়া থেকে ওশেনিয়া—১৫০টিরও বেশি দেশে বিভিন্ন নামে ওমবাডসম্যান ব্যবস্থা কার্যকর।
প্রহরীদের প্রহরী
প্রাচীন রোমান কবি Juvenal-এর বিখ্যাত প্রশ্ন— "Quis custodiet ipsos custodes?"
"প্রহরীদের প্রহরা দেবে কে?"
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে এই প্রশ্নের অন্যতম প্রাতিষ্ঠানিক উত্তর হলো ওমবাডসম্যান।
কারণ গণতন্ত্রে আদালত বিচার করে, সংসদ আইন প্রণয়ন করে, নির্বাহী বিভাগ প্রশাসন পরিচালনা করে; কিন্তু নাগরিক যখন প্রশাসনিক জটিলতা, হয়রানি, বিলম্ব, অবহেলা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের শিকার হন, তখন তার জন্য সহজ, দ্রুত, কম ব্যয়বহুল এবং নিরপেক্ষ প্রতিকারব্যবস্থা প্রয়োজন। ওমবাডসম্যান সেই শূন্যস্থান পূরণ করে।
স্ক্যান্ডিনেভিয়ার আস্থার স্থাপত্য
বিশ্বে দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ ও নাগরিকবান্ধব রাষ্ট্রের তালিকায় সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্ক ও ফিনল্যান্ড ধারাবাহিকভাবে শীর্ষে থাকে। এটি কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়।
Transparency International-এর Corruption Perceptions Index এবং World Bank-এর Governance Indicators দেখায় যে শক্তিশালী Ombudsman প্রতিষ্ঠান, তথ্যের স্বাধীনতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং উন্মুক্ত সরকারি সংস্কৃতি—এই দেশগুলোর সাফল্যের প্রধান ভিত্তি।
সুইডিশ সাংবিধানিক পণ্ডিত Nils Herlitz একবার লিখেছিলেন— "The Ombudsman is not merely an institution; it is a culture of accountability."
অর্থাৎ, এটি শুধু একটি অফিস নয়; এটি জবাবদিহির সংস্কৃতি।
আয়ারল্যান্ড: প্রশাসনকে মানবিক করার গল্প
আয়ারল্যান্ডের Ombudsman Office আধুনিক ইউরোপে একটি রোল মডেল।
কর প্রশাসন, স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন, সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা এবং স্থানীয় সরকারে লক্ষাধিক নাগরিক অভিযোগের নিষ্পত্তি করে প্রতিষ্ঠানটি প্রশাসনকে আরও মানবিক ও জবাবদিহিমূলক করেছে।
সাবেক Irish Ombudsman এবং বর্তমান European Ombudsman Emily O’Reilly-এর বিখ্যাত মন্তব্য— "Good administration is not a luxury; it is a democratic necessity."
আয়ারল্যান্ডে Ombudsman-এর সুপারিশে বহু সরকারি নীতি পরিবর্তিত হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিকরা ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন, এবং সরকারি সেবার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে।
নিউজিল্যান্ড: তথ্যের স্বাধীনতার দুর্গ
Open Government Partnership এবং OECD-এর মূল্যায়নে নিউজিল্যান্ডকে বিশ্বের সবচেয়ে স্বচ্ছ রাষ্ট্রগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এখানে Ombudsman শুধু অভিযোগ নিষ্পত্তি করে না; সরকারি তথ্য গোপন রাখার বিরুদ্ধে নাগরিকের অধিকারও রক্ষা করে।
ফলাফল—সরকারি গোপনীয়তা কমেছে, নাগরিক আস্থা বেড়েছে এবং নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকা: ক্ষমতার শীর্ষে জবাবদিহি
দক্ষিণ আফ্রিকার Public Protector প্রতিষ্ঠান দেখিয়েছে, জবাবদিহি কেবল নিম্নপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য নয়; রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাকেন্দ্রও এর আওতার বাইরে নয়।
নেলসন ম্যান্ডেলার ভাষায়— "A critical, independent and investigative institution is the lifeblood of democracy." এই দর্শনই আধুনিক Ombudsman ব্যবস্থার প্রাণশক্তি।
লোকপাল, পাবলিক প্রটেক্টর, ওমবাডসম্যান: ভিন্ন নাম, একই দর্শন
ভারতে "লোকপাল", পাকিস্তানে "ফেডারেল ওমবাডসম্যান", দক্ষিণ আফ্রিকায় "পাবলিক প্রটেক্টর", স্পেনে "ডিফেন্সর দেল পুয়েবলো", ইউরোপীয় ইউনিয়নে "ইউরোপিয়ান ওমবাডসম্যান"—নাম ভিন্ন হলেও লক্ষ্য একটিই: রাষ্ট্রক্ষমতার মুখোমুখি নাগরিককে একা না রাখা।
বিশ্বব্যাপী দুর্নীতির বিরুদ্ধে নীরব অস্ত্র— LuxLeaks, Panama Papers, Paradise Papers, FinCEN Files এবং Pandora Papers আমাদের দেখিয়েছে যে দুর্নীতি কেবল উন্নয়নশীল দেশের সমস্যা নয়; এটি বৈশ্বিক সমস্যা।
বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দুর্বল জবাবদিহি কাঠামো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ এবং সামাজিক আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
এই বাস্তবতায় Ombudsman প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি দমন কমিশনের বিকল্প নয়, বরং একটি প্রতিরোধমূলক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিকারব্যবস্থা।
বাংলাদেশের সংবিধান: একটি অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি
বাংলাদেশের সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে Ombudsman প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পরও সেই সাংবিধানিক অঙ্গীকার বাস্তব রূপ পায়নি।
এটি কেবল একটি প্রশাসনিক ঘাটতি নয়; এটি নাগরিক-রাষ্ট্র সম্পর্কের একটি অপূর্ণ অধ্যায়।
কেন এখনই সময়?
স্মার্ট বাংলাদেশ, ডিজিটাল গভর্ন্যান্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ই-সেবা, ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা, অনলাইন ট্যাক্সেশন—রাষ্ট্র দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।
কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়ে গেছে: কোনো নাগরিক যদি প্রশাসনিক হয়রানি, অযৌক্তিক বিলম্ব, ডিজিটাল বৈষম্য বা ক্ষমতার অপব্যবহারের শিকার হন, তবে তিনি কোথায় যাবেন?
কার কাছে ন্যায়সঙ্গত, দ্রুত এবং নিরপেক্ষ প্রতিকার চাইবেন? এই প্রশ্নের উত্তরই Ombudsman।
বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য সুফল
একটি কার্যকর Ombudsman— প্রশাসনিক দুর্নীতি ও অপব্যবহার কমাবে, আদালতের মামলার চাপ হ্রাস করবে, সরকারি সেবার মান উন্নত করবে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে, তথ্য অধিকার ও নাগরিক অধিকারকে শক্তিশালী করবে ও জনগণ ও প্রশাসনের মধ্যে আস্থার সেতুবন্ধন গড়ে তুলবে।
উন্নয়নের পরবর্তী মাইলফলক
একটি জাতির প্রকৃত শক্তি তার সামরিক সক্ষমতা, অবকাঠামো বা প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে এককভাবে পরিমাপ করা যায় না। প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে তার প্রতিষ্ঠানগুলোর নৈতিক দৃঢ়তা, স্বচ্ছতা এবং নাগরিকের প্রতি জবাবদিহির ওপর।
বাংলাদেশ যখন উন্নয়নের নতুন উচ্চতায় আরোহণ করছে, তখন সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদের সুপ্ত প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবায়ন করা কেবল একটি প্রশাসনিক সংস্কার নয়; এটি গণতন্ত্রকে আরও পরিপক্ব, মানবিক এবং নাগরিককেন্দ্রিক করার জাতীয় অঙ্গীকার।
ওমবাডসম্যান তাই কোনো দপ্তর নয়, কোনো আমলাতান্ত্রিক সংযোজনও নয়; এটি রাষ্ট্রের বিবেক, নাগরিকের আশ্রয় এবং সুশাসনের নীরব কিন্তু অপরিহার্য প্রহরী।
কাজী জিয়া উদ্দিন লেখক, কলামিস্ট, সাবেক ডিআইজি

