ঢাকা শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬

মতামত

দেশব্যাপী স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে মহাকর্মযজ্ঞ

আহসান হাবিব বরুন
প্রকাশিত: জুলাই ১১, ২০২৬, ০৮:০৭ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

একটি রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো তার নাগরিকদের সুস্বাস্থ্য এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক চিকিৎসাব্যবস্থার নিশ্চয়তা। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তার একাধিক গবেষণায় দেখিয়েছেন, মানবসম্পদ উন্নয়নের সবচেয়ে কার্যকর বিনিয়োগ নিহিত রয়েছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ওপর। বাংলাদেশ যখন উন্নয়নশীল দেশের কাতার থেকে উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার রূপকল্প বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন স্বাস্থ্য খাতের কাঠামোগত রূপান্তর কেবল একটি জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ নয়; এটি অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মানবিক রাষ্ট্র গঠনের অপরিহার্য শর্ত।

সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে জারি করা একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত দেশের স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। দেশের ৪১৮টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করা এবং নতুন ১৩টি উপজেলায় ১০১ শয্যাবিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স স্থাপনের সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। একই সঙ্গে বিভাগীয় ও জেলা শহরের পাঁচটি নবনির্মিত শিশু হাসপাতালকে বিশেষায়িত হাসপাতাল হিসেবে ঘোষণার উদ্যোগ এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বৃদ্ধির নির্দেশনা স্বাস্থ্যখাতকে আরও কার্যকর ও জনমুখী করার লক্ষ্যে সরকারের অঙ্গীকারেরই বহিঃপ্রকাশ।

এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য হলো বৈশ্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনার আলোকে বাংলাদেশের এই কাঠামোগত সংস্কারের সম্ভাবনা, গুরুত্ব এবং বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ বিশ্লেষণ করা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) Universal Health Coverage (UHC)-এর মূল দর্শন হলো—কোনো নাগরিক যেন আর্থিক দুর্ভোগে না পড়ে প্রয়োজনীয় ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করতে পারেন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই লক্ষ্য অর্জনের অন্যতম বড় বাধা ছিল স্বাস্থ্যসেবার অতিমাত্রায় কেন্দ্রীকরণ। রাজধানী ও বিভাগীয় শহরের হাসপাতালগুলোতে রোগীর অস্বাভাবিক চাপ দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাসেবাকে দুর্বল করে আসছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে ৩১ বা ৫০ শয্যা থেকে সরাসরি ১০১ শয্যায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করবে। এতে জটিল নয় এমন বহু রোগের চিকিৎসা স্থানীয় পর্যায়েই সম্ভব হবে। ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, প্রসূতি জটিলতা কিংবা মাঝারি ধরনের দুর্ঘটনার রোগীদের আর অপ্রয়োজনীয়ভাবে জেলা বা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটতে হবে না।

রাজধানীর বড় হাসপাতালগুলোতে রোগীদের বারান্দা কিংবা মেঝেতে চিকিৎসা নেওয়ার যে দীর্ঘদিনের বাস্তবতা, তার অন্যতম কারণ তৃণমূলের রেফারেল ব্যবস্থার দুর্বলতা। উপজেলা পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ ১০১ শয্যার হাসপাতাল গড়ে উঠলে এই রেফারেল ব্যবস্থা আরও কার্যকর হবে। ফলে তৃতীয় স্তরের বিশেষায়িত হাসপাতালগুলো জটিল রোগ, গবেষণা এবং উচ্চতর চিকিৎসাসেবায় অধিক মনোযোগ দিতে পারবে।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG-3) অর্জনের অন্যতম সূচক হলো শিশুমৃত্যু ও নবজাতকের মৃত্যুহার কমানো এবং উন্নত শিশুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা। রংপুর, খুলনা, কুষ্টিয়া, রাজশাহী ও বরিশালে নবনির্মিত শিশু হাসপাতালগুলোকে বিশেষায়িত হাসপাতাল হিসেবে ঘোষণা নিঃসন্দেহে একটি সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল কেবল উন্নত চিকিৎসা নয়, গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক শিশুস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনারও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

বিশেষায়িত মর্যাদা পাওয়ার ফলে এসব হাসপাতালে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ দ্রুত হবে, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হবে এবং আন্তর্জাতিক চিকিৎসা প্রটোকল অনুসরণের সুযোগ বাড়বে। এর মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুরাও উন্নত চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রে সমান সুযোগ লাভ করবে।

স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ এবং কাঠামোগত সংস্কারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় একদিকে যেমন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, অন্যদিকে এখনো কিছু বড় চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার কমাতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করলেও চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ এখনো জনগণকে নিজেদের পকেট থেকেই বহন করতে হয়। এই ব্যয় অনেক পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করে দেয়।

উপজেলা পর্যায়ে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের ফলে এই পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতে পারে। যখন একজন গ্রামীণ নাগরিক নিজের এলাকায় শয্যা, ওষুধ, প্রাথমিক অস্ত্রোপচার, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা পাবেন, তখন চিকিৎসাজনিত দারিদ্র্যের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
তবে অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি তিনটি বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

প্রথমত, দক্ষ জনবল নিশ্চিত করা। শুধু ভবন নির্মাণ বা শয্যা বৃদ্ধি করলেই স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত হয় না। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট এবং সহায়ক জনবল ছাড়া একটি হাসপাতাল কখনোই কার্যকর হতে পারে না। উপজেলা পর্যায়ে অ্যানেসথেসিওলজিস্ট, সার্জন, গাইনোকোলজিস্ট, শিশু বিশেষজ্ঞসহ প্রয়োজনীয় সব বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের স্থায়ী পদ সৃষ্টি ও নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা। উন্নত অপারেশন থিয়েটার, এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাফি, আইসিইউ, ল্যাবরেটরি এবং অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতে দক্ষ বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং সাপোর্ট অপরিহার্য। দেশের বহু হাসপাতালে মূল্যবান যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন অচল অবস্থায় পড়ে থাকার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

তৃতীয়ত, চিকিৎসকদের আবাসন, নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ। গ্রামীণ এলাকায় দক্ষ চিকিৎসক ধরে রাখতে মানসম্মত আবাসন, নিরাপত্তা, সন্তানের শিক্ষাব্যবস্থা এবং যাতায়াত সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসকেরা যদি কর্মস্থলে স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তা অনুভব না করেন, তাহলে অবকাঠামোগত উন্নয়নের সুফল পুরোপুরি পাওয়া কঠিন হবে।

এই মহাকর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নের পথে কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জও রয়েছে।

প্রথমত, উন্নয়ন প্রকল্প (ডিপিপি) প্রণয়ন ও অনুমোদনের দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। ৪১৮টি হাসপাতালের উন্নয়নকাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে একটি বিশেষ ফাস্ট-ট্র্যাক বাস্তবায়ন কাঠামো গঠন কার্যকর হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, মান নিয়ন্ত্রণ ও সংক্রমণ প্রতিরোধ। শয্যা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে প্রতিটি হাসপাতালে কার্যকর মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা সম্প্রসারণ। টেলিমেডিসিন, কেন্দ্রীয় ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য রেকর্ড (EHR) এবং ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা গেলে উপজেলা হাসপাতালের চিকিৎসকেরা প্রয়োজনে তাৎক্ষণিকভাবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারবেন। এতে রোগীর ভোগান্তি যেমন কমবে, তেমনি চিকিৎসার মানও উন্নত হবে।

পরিশেষে বলা যায়, দেশের ৪১৮টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করা, নতুন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স স্থাপন এবং বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার এই সমন্বিত উদ্যোগ বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের জন্য একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হওয়ার সম্ভাবনা বহন করে। এটি শুধু চিকিৎসাসেবার সম্প্রসারণ নয়; বরং গ্রামীণ ও শহুরে স্বাস্থ্যবৈষম্য কমানো, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিরও একটি শক্তিশালী ভিত্তি।

তবে এই মহাপরিকল্পনার প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর। ইট-পাথরের অবকাঠামোর সঙ্গে যদি মানবিক সেবা, দক্ষ জনবল, আধুনিক প্রযুক্তি এবং কার্যকর প্রশাসনের সমন্বয় ঘটানো যায়, তাহলে এই মহাকর্মযজ্ঞ সত্যিই বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে নতুন যুগের সূচনা করবে। সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার অভিযাত্রায় বাংলাদেশ আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে—এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক