ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই, ২০২৬

মতামত

গণতন্ত্র ও নাগরিক দায়বদ্ধতা

এ ইউ দৌলা
প্রকাশিত: জুলাই ৮, ২০২৬, ০৮:০৩ পিএম
প্রতীকী ছবি

একটি সুন্দর, সমৃদ্ধ এবং নিরাপদ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি আমরা। আমাদের শহর এবং রাস্তাঘাট যেন উন্নত বিশ্বের মতো সুশৃঙ্খল হয়, এটিই আমাদের আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছি, এই স্বপ্নের পথে আমাদের সবচেয়ে বড় বাধা কোনটি? রাজনৈতিক জটিলতা কিংবা অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কথা আমরা প্রায়ই বলি, কিন্তু একটি রাষ্ট্রের মুল ভিত্তি যে নাগরিকদের আচরণের সাথেই সবথেকে বেশি যুক্ত, সেই বিষয়টি প্রায়ই ভুলে থাকি। উন্নয়নের মূলমন্ত্র রাষ্ট্রের অবকাঠামো নয়, সত্যিকার উন্নয়ন জনগণের অভ্যাসের সাথে সম্পর্কিত।

বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ রিচার্ড থেলার এবং ক্যাস সানস্টাইন তাদের Nudge তত্ত্বে দেখিয়েছেন, মানুষের আচরণের সামান্য পরিবর্তন কীভাবে বড় ধরনের সামাজিক উন্নয়ন ঘটাতে পারে। জাপানের মতো দেশ যেখানে মানুষ একে অপরের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও পাবলিক স্পেসে শৃঙ্খলার প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল, সেখানে সামাজিক সংহতি ও জাতীয় উন্নতি অনেক বেশি। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যে সমাজে ‘পারস্পরিক আস্থার হার’ বেশি, সেখানে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অন্যদের তুলনায় প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পায়।

এই তত্ত্বকে ভিত্তি করে যদি আমরা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যদি শুধু অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার গ্রহণের অভ্যাস ত্যাগ করার সচেতনতা সৃষ্টি করা যায় তবে রাষ্ট্রের জন্য এর প্রভাব হতে পারে সুদূরপ্রসারী। বর্তমানে বাংলাদেশ চিনি আমদানিতে বছরে প্রায় ১২,৬০০ কোটি টাকা ব্যয় করে। চিনির ব্যবহার  অভ্যাস কমিয়ে আনতে পারলে বিশাল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। আবার সাশ্রয়কৃত অর্থ স্বাস্থ্যখাতসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নমূলক কাজে বিনিয়োগ করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশে বর্তমানে ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। চিনির ব্যবহার কমানোর মাধ্যমে ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের মতো ব্যাধির প্রাদুর্ভাব উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। শিশুদের অতিরিক্ত ওজনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি কমবে, যা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনকে করবে আরও কর্মক্ষম। নাগরিক জীবনযাত্রার মান উন্নত হলে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে সমাজের প্রতিটি স্তরে, যা পরোক্ষভাবে জাতীয় অর্থনীতিকে ত্বরান্বিত করবে।

ঢাকার যানজট আর ট্রাফিক জ্যামের একটি বড় কারণ হলো ট্রাফিক আইন না মেনে গাড়ি চালানো। প্রকৌশলীদের মতে, যদি চালকরা লেন মেনে চলেন এবং একে অপরকে সহানুভূতি দেখান, তবে রাস্তার যানজট প্রায় ৪০ শতাংশ কমে যেতে পারে। এটি কোনো বড় প্রযুক্তি বা মেগা প্রজেক্টের সমাধান নয়, এটি কেবল চালকদের মানসিকতা, ধৈর্য এবং আচরণের পরিবর্তন।

আমাদের সামজিক জীবনের বাস্তবতা হল, ‘নিজের সুবিধা আগে’ এই মানসিকতা। আমরা  অন্যদের অধিকারকে ছোট করে দেখি, কিংবা পেশা দেখে মানুষের সম্মান ও মর্যাদা বিচার করি। যখন কোন একজন গাড়ি চালক ফুটপাতে গাড়ি তুলে দেয় কিংবা উল্টো লাইনে গাড়ি নিয়ে যায়, তখন সে কেবল নিয়ম ভাঙছে এমন নয়, সে আসলে একটি মনস্তাত্ত্বিক সিগন্যাল দিচ্ছে যে, “অন্যের সময়ের চেয়ে তার সময় বেশি মূল্যবান।” একজন চালক যখন অনবরত হরন বাজাচ্ছে, সে আসলে বলছে, সামনের মানুষেরা সব অপদার্থ আর উজবুক। এই যে অন্যদের তুচ্ছ করার মানসিকতা, এটি আসলে একটি সামাজিক অভ্যাসের সংকট।

আরেকটি উদাহরণ হলো পাবলিক প্লেসে ময়লা ফেলা। আমরা নিজের ঘরের ভেতরে ময়লা সহ্য করি না, কিন্তু রাস্তার ধুলোবালি বা ময়লা আমাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হয়। সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা লি কুয়ান ইউ যখন রাষ্ট্র গড়ে তুলছিলেন, তিনি প্রথমেই জোর দিয়েছিলেন ‘ক্লিন অ্যান্ড গ্রিন’ ক্যাম্পেইনের ওপর। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, পরিবেশের প্রতি নাগরিকের দায়িত্ববোধই হলো রাষ্ট্রের মর্যাদার প্রথম প্রমাণ। যে জাতি নিজের শহরকে পরিষ্কার রাখতে জানে, সেই জাতিই বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। আতসম্মানি নাগরিকই কেবল নিয়ম মানতে অভ্যস্ত থাকেন। আত্মসম্মানি জনগণই কেবল গ্যাস, পানি আর বিদ্যুত অপচয় রোধ করেন।  আত্মসম্মানি মানুষ কখনও পাব্লিক প্লেসে হৈচৈ করে অন্যদের কষ্ট সৃষ্টি করেন না।

অনেকেই মনে করেন, আত্মসম্মান মানে হলো অহংকার বা বড়াই। কিন্তু প্রকৃত আত্মসম্মানবোধ হলো নিজের কাজের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা। আপনি যখন লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন, তখন আসলে আপনি প্রমাণ করছেন যে আপনি একজন সভ্য নাগরিক। যখন কেউ দেখছে না, তবুও আপনি সঠিক কাজটি করছেন, এটিই হলো একজন মানুষের আসল চারিত্রিক শক্তি।

সমাজে আজ যে অস্থিরতা, তার অন্যতম প্রধান কারণ হলো সামাজিক শৃঙ্খলার প্রতি ক্রমবর্ধমান অনীহা। সামাজিক নিয়মকানুনগুলো মূলত একটি সেতুবন্ধন, যা প্রতিটি নাগরিকের অধিকারকে সুরক্ষিত রাখে। তাই যখনই কেউ এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটান, তিনি মূলত অন্যের অধিকারকেই ক্ষুণ্ণ করেন। একজনের অনিয়মের দৃষ্টান্ত দেখে অন্যরাও নিয়ম মানার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এভাবেই একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়, যা আমাদের সামাজিক অস্থিরতাকে আরও ত্বরান্বিত করছে।

এই গোলকধাঁধা থেকে বের হওয়ার পথ আমাদের হাতেই। আমরা যখন অন্যের অধিকারকে সম্মান জানাব, সেই ইতিবাচক প্রভাব শেষ পর্যন্ত আমাদের নিজেদের জীবনেই ফিরে আসবে। সমাজে যখন নিয়ম মানার সংস্কৃতি গড়ে উঠবে, তখন প্রতিটি নাগরিকই তার প্রাপ্য অধিকার ফিরে পাবেন। এই ইতিবাচক পরিবর্তনের গতি ত্বরান্বিত করতে আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসের পরিবর্তন প্রয়োজন। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা এবং নিজ নিজ কাজে সততা বজায় রাখা, এই মূল্যবোধগুলো যখন আমাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠবে, তখনই একটি সুশৃঙ্খল সমাজ গঠন করা সম্ভব হবে।

কেন আমরা এই পরিবর্তন আনতে পারছি না? এর কারণ হলো দর্শক হওয়ার প্রবণতা। আমরা মনে করি, “সবাই তো নিয়ম ভাঙছে, আমি মেনে চললে কী হবে?” এই নেতিবাচক চিন্তাই আমাদের সামাজিক উন্নতির পথে বড় বাধা। যখন কেউ নিয়ম মানতে চায়, তখন চারপাশের মানুষেরা প্রায়ই তাকে পাগল বলে উপহাস করে। এই পরিস্থিতি ভাঙার জন্য প্রয়োজন সাহসিকতা। মনে রাখতে হবে, কোনো জাতিই একদিনে বদলে যায় না। শত শত ছোট ছোট  ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্মিলিত রূপই হলো একটি উন্নত দেশ।

আমরা যদি ছোটখাটো অনিয়মগুলোকে স্বাভাবিক মেনে নেওয়া বন্ধ করি, তবেই বড় পরিবর্তন সম্ভব। আমরা যখন রাস্তা পার হওয়ার সময় জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার করি, কিংবা লাইনে দাঁড়িয়ে নিজের সুযোগের অপেক্ষায় থাকি, তখন আমরা  নিজেকে একজন সম্মানিত নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করি। আত্মসম্মানবোধের আসল পরিচয় তখনই পাওয়া যায়, যখন কেউ দেখছে না, তবুও আমি সঠিক কাজটি করছি। নাগরিক হিসেবে আমাদের অধিকার যেমন আছে, তেমনি দায়বদ্ধতাও আছে। রাষ্ট্র আমাদের জন্য কী করল, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আমি রাষ্ট্রকে কী দিচ্ছি? চিন্তা করা দরকার, আমার আচরণ কি আমার দেশকে সুন্দর করছে, না কি আরও বিশৃঙ্খল করে দিচ্ছে?

তাই চলুন নিজের দেশ নিজেই গড়ি, সবার আগে আমিই সঠিক কাজটি করি। চলুন নিজেকে বলি, ‘আমি যদি নিয়ম না মানি তবে এই দেশে আমার চেয়ে আত্মসম্মানি মানুষ আর কে আছে যে নিয়ম মানবে?  কাজটি শুরু করতে চলুন আজ থেকে আর পাবলিক প্লেসে (বাস, ট্রেন, দোকান, ব্যাংক বা অফিস) কোনোভাবেই নিয়ম না ভাঙ্গার শপথ নিই। কেউ যদি নিয়ম ভঙ্গ করতে চায় তবে, তাকে বিনয়ের সাথে বলি, “ভাই, সবাই নিয়ম মেনে চললে সবারই অধিকার রক্ষা হয়।”

করিডোরে কেউ কাগজ বা পানির বোতল ফেলে রাখলে  যদি আপনি সেটি তুলে ডাস্টবিনে ফেলেন তবে আপনি নিজেই নিজের কাছে অনেক সম্মানিত অনুভব করবেন। আপনি যখন এমন ভালো কাজ করবেন কিংবা আপনার শিশুদেরকে অভ্যস্ত করাবেন, তখন দেখবেন আপনার আশপাশের মানুষজনও আপনার দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। সুন্দর বাংলাদেশের ছবিটা জগতের অন্য কেউ এসে এঁকে দিবে না, সেটা আমাদেরই আচরণ দিয়ে আঁকতে হবে। চলুন আজ থেকে নিজেকে বলি, আমি আত্মসম্মানি মানুষ, আমি দায়িত্ববান নাগরিক।

লেখক: মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক