ঢাকা শুক্রবার, ০৩ জুলাই, ২০২৬

সংকট সমাধানে পদ্মা ব্যারাজ সরকারের যুগান্তকারী পদক্ষেপ  

এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান
প্রকাশিত: জুলাই ৩, ২০২৬, ০৭:৫৬ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

পদ্মার বুকে ধূ ধূ বালুচর। সেই কবেই হারিয়েছে নাব্যতা, যৌবন আর ঐতিহ্য। বর্ষায় ভয়াবহ ভাঙনে বিলীন গ্রামের পর গ্রাম আর শুষ্ক মৌসুমে অস্বাভাবিক মরুকরণ। কোথাও কোথাও তলদেশের পানি দেখা যায় যতসামান্য। পড়শি দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের কারণে পদ্মার পানিশূন্যতায় নিদারুণ খরায় সেই সত্তরের দশক থেকেই মাতম করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। মাছ না থাকায় বেকার হাজার হাজার জেলে। ছাড়তে হচ্ছে বাপ-দাদার পুরোনো পেশা। আজও বরেন্দ্র অঞ্চলে ঘরদুয়ার সামলানো নারীকে নিরাপদ পানি সংগ্রহে হাঁটতে হয় মাইলের পর মাইল। এ যেন দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের নিত্যকার এক যন্ত্রণার দগদগে ক্ষত।

কমেছে পদ্মার পানি সমতলের উচ্চতাও। গত ৫১ বছরে পদ্মায় পানি প্রবাহ কমতে কমতে ঠেকেছে ৭১ শতাংশে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ৮ কোটি মানুষ। ভারতের পানি আগ্রাসনের প্রতিবাদে জীবদ্দশায় ফারাক্কা লংমার্চ করেছিলেন মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাব নিয়ে গর্জে উঠেছিলেন। তার সেই গর্জন এখনও দেশের মানুষের জন্য বড় অনুপ্রেরণা।

প্রায় ২৫ বছর আগে বিএনপি চেয়ারপার্সন প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সরকারের সময়ে একবার পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়েছিল। বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজও শুরু হয়েছিল। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর প্রতিবেশীদের কূটকৌশলে এই উদ্যোগ আর আলোর মুখ দেখেনি। শুধু আলোচনার বৃত্তেই ঘুরপাক খেয়েছে। ফারাক্কার বিপরীতে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি ছিল বর্তমান সরকারপ্রধান তারেক রহমানের নির্বাচনি ওয়াদা। নদী, কৃষি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার মাধ্যমে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে প্রায় সাড়ে ছয় দশকের মরুকরণক্রের ইতি ঘটাতে প্রায় মাস দেড়েক আগে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছেন পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প। মওলানা ভাসানী যে স্বপ্নের গোড়াপত্তন করেছিলেন সেটি বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে তারেক রহমানের হাত ধরে। 

৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকার এই প্রকল্পের জন্য প্রথম ধাপে ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। এই বছর থেকে শুরু করে ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো)। বহুল কাঙ্ক্ষিত এই ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে পদ্মা নদীতে প্রায় দুই হাজার ৯০০ মিলিয়ন বা ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। সংরক্ষিত পানিতে পুনরুজ্জীবিত হবে পদ্মার শাখা গড়াই-মধুমতী, কুমারসহ হিসনা-মাথাভাঙ্গা, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদী। শুষ্ক মৌসুমে এই ব্যারাজের মাধ্যমে পরিকল্পনা রয়েছে প্রতি সেকেন্ডে ন্যূনতম ৫৭০ ঘনমিটার পানি ছাড়ার। এছাড়াও যশোর, খুলনা, বরিশাল, বৃহত্তর কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের প্রায় ২৮ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে নিশ্চিত হবে সেচ সুবিধা। এসবের মাধ্যমে দশকের পর দশকের বহমান সংকট নিরসনে বড় ধরনের কার্যকর এক উদ্যোগ গ্রহণ করলেন সরকারপ্রধান।

এই প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনীতিতেও হতে পারে ‘গেম চেঞ্জার’। ১৯৭৬ সালের ১৭ মে ফারাক্কা লংমার্চের সমাপনী ভাষণে নদীর হকের কথা বলেছিলেন। প্রতিবেশীরা সেই হক তো দূরের কথা বাংলাদেশের মানুষের অধিকারও যেন গ্রাস করেছেন। কিন্তু নিজের সময়োচিত ও দূরদর্শী এক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে নিঃস্ব এসব মানুষের বেঁচে থাকার ও ভাগ্য বদলের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই মেগা প্রকল্পে উপকৃত হবে দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ। যার মাধ্যমে তিনি আশা জাগিয়েছেন কৃষিতেও। মৎস্য ও পরিবেশেও আসবে ইতিবাচক পরিবর্তন। লবণাক্ততার পরিবর্তে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনেও বাড়বে মিষ্টি পানির প্রবাহ। বিশ্বের পৃথিবীর সর্ববৃহৎ এই ম্যানগ্রোভ বনে প্রতিবেশব্যবস্থার ভারসাম্যও রক্ষা পাবে। পুরো প্রকল্পে ব্যারাজ ও গড়াইয়ের মুখে টারবাইন বসিয়ে ১১৩ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার দু’টি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। সবকিছু মিলিয়ে বছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। 

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য বলছে, পদ্মা নদীর বাংলাদেশ অংশের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৪১ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রতিবছর বিভিন্ন স্থানে নদীভাঙনের কারণে কয়েক হাজার হেক্টর কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়। গত দুই দশকে পদ্মা নদী বিধৌত বিভিন্ন এলাকায় আনুমানিক ৮ থেকে ১০ হাজার হেক্টরের বেশি কৃষিজমি নদীভাঙনের কবলে পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৃহৎ এই অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে পাঁচটি নদীর সিস্টেম পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে তিন জেলা সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ হ্রাস; স্বাদু পানি সরবরাহ নিশ্চিত করে সুন্দরবন ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য পুনরুদ্ধার, জীববৈচিত্র্য ও বনসম্পদ সংরক্ষণ করা হবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোর পলি অপসারণ করে যশোরের ভবদহসহ অন্যান্য এলাকার জলাবদ্ধতা হ্রাস ও পদ্মানির্ভর এলাকার নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হবে। একই সঙ্গে পদ্মানির্ভর এলাকার প্রধান পাঁচ নদী-সিস্টেম পুনরুজ্জীবিতকরণের পাশাপাশি নদী পুনর্খনন ড্রেজিং ও রেগুলেটর দেওয়া হবে।

একনেকে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প অনুমোদনের পর এখন সরকারের পুরো নজর প্রকল্পটি বাস্তবায়নে। এ লক্ষ্য সামনে রেখে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় নিজেদের কর্মতৎপরতা বাড়িয়েছে। এতে রাজবাড়ী জেলার পাংশা পয়েন্টে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। যেখানে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট, যার প্র্রতিটির প্রস্থ ১৮ মিটার, ১৮টি আন্ডার স্লুইসগেট, ১৪ মিটার প্রশস্ত একটি নেভিগেশন লক, দুটি ২০ মিটার প্রশস্ত ফিস পাস এবং ব্যারাজের ওপর দিয়ে একটি রেলওয়ে সেতু। গত রোববার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি এই সম্পর্কিত একটি সুসংবাদ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের দরপত্রপ্রক্রিয়া শিগগির শুরু হবে। একই দিনে সংসদে বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেছেন, ‘পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প ইতোমধ্যে একনেকে অনুমোদন পেয়েছে। প্রকল্পের প্রথম ধাপে ১৯ জেলার ১২০টি উপজেলা উপকৃত হবে। প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে ২৬ জেলার ১৬৩টি উপজেলা এবং দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ এর সুফল ভোগ করবে।’

এক সময়ের খরস্রোতা পদ্মাকে বাঁচাতে এগিয়ে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পদ্মার হক আদায়ে আর কোন অন্তরায় নয়। নয় কোন জিয়ন কাঠির গল্প পদ্মাকে ঘিরে। ফারাক্কার প্রভাবে বিনষ্ট প্রাকৃতিক ভারসাম্য ফেরাতে উদ্যোগী, দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ তাঁর সরকার। পদ্মার সাগরের সঙ্গে মিলনের অধিকার ফিরিয়ে দিতে স্বপ্নপূরণের পথে বড় এমন অগ্রগতিতে আশায় বুক বাঁধছে পদ্মাপাড়ের মানুষ। পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প এখন তাদের কাছে নদীভাঙন, শুষ্ক মৌসুমে সেচ সংকট ও আঞ্চলিক বৈষম্যের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন এক স্বপ্নের নাম। দরপত্র প্রক্রিয়া শুরুর মধ্যে দিয়ে যে স্বপ্ন এখন হতে চলেছে বাস্তব।

লেখক : এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।