পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মূখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বাংলাদেশবিষয়ক বক্তব্য ও তৎপরতা থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ‘পুশ ইন’ বা লোক ঠেলে দেওয়ার অভিযোগের প্রেক্ষাপটে আবারও নতুন একটি দাবি সামনে এনেছেন, যা নতুন করে আলোচনা ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। গত মঙ্গলবার (২৩ জুন) পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় তিনি দাবি করেন, রাজ্য সরকারের উদ্যোগে এ পর্যন্ত মোট ১০ হাজার ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারীকে’ বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তাঁর এই দাবিকৃত পরিসংখ্যান স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্নের অবতারণা করেছে।
পশ্চিমবঙ্গের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বাহ্বা পাওয়ার মতোন বয়ান। কিন্তু এটি যে কার্যত অভিনব এক চাতুরি ও স্ট্যান্টবাজি সেটি বুঝতে মহাপণ্ডিত হওয়ারও প্রয়োজন নেই মোটেও। বিশেষ করে শুভেন্দু এমন এক সময় এমন আজগুবি সংখ্যায় অপপ্রচারকে বাড়বাড়ন্ত করেছেন যখন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সীমান্তের প্রতি ইঞ্চি মাটি আঁকড়ে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টার বিশাল কর্মযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন। গ্রামবাসীকে সচেতন করে তাদের সঙ্গে নিয়ে সীমান্তের প্রতিটি পয়েন্টে একের পর এক ঠেকিয়ে দিচ্ছে পুশ ইন। কথা বলছে চোখে চোখ রেখে। প্রতিরোধ করছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) অপতৎপরতা। বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, দেশের প্রতিটি সীমান্তে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে; সীমান্তে যেকোনো ধরনের অনুপ্রবেশ বা পুশ-ইনের চেষ্টা সফলভাবে প্রতিহত করা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কিছু তৎপরতা রাজনৈতিক এজেন্ডার অংশ হতে পারে।’
আদতে শুভেন্দুর পুশ ইন বা বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার অপকৌশলের ছক বরবাদ করে দিয়েছে বিজিবি। কথায় আছে—‘উচিত কথায় মাওই বেজার, ডাইল ভাতে বিড়াল বেজার।’ শুভেন্দুরও হয়েছে তাই। দাদাগিরি দেখানোর ইচ্ছা থেকেই তার ভাবসাব ছিল এমন-আওয়াজ তুললেই সম্ভবত বিজিবি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাবে। কিন্তু ভুল সময়ে ভুল কাজটিই করে বসেছেন। কারও রক্তচক্ষুকে পরোয়া না করা শির উঁচু করে পথচলা বিজিবি উচিত কথা বলতে এখন আর কাউকে ছাড় দিচ্ছে না। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পবিত্র দায়িত্ব পালনে অসামান্য আত্মবিশ্বাস ও সৎসাহসের পারদকে করেছে উর্ধ্বমুখী। ‘পুশ ব্যাক’ করতে বিজিবির দৃঢ়তায় খেই হারিয়েই সম্ভবত মিথ্যা বয়ান ফেরি করে আত্মতৃপ্তি পেতে চাচ্ছেন শুভেন্দু। দেশের সাধারণ মানুষও গ্রাহ্য করেনি তাঁর বক্তব্য। বিজিবি ও সীমান্তবাসীর অভিন্ন প্রত্যাশা আর প্রত্যয় শেষ করে দিয়েছে তাঁর কিচ্ছার ফানুস।
বিজিবি ও বিএসএফ’র মধ্যে বিস্তর ফারাক যেখানে
প্রতিবেশী দেশের এমন বৈরী মনোভাবের চূড়ান্ত শুরু হয়েছে চলতি বছরের মে মাসে। ওই সময় থেকে এখন পর্যন্ত সীমান্তের বিভিন্ন অংশ দিয়ে বিএসএফ অব্যাহতভাবে লোকজনকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অবৈধভাবে ঠেলে পাঠানোর বা পুশ ইন চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। একবারের জন্যও বিজিবি পিঠ দেখায়নি, বুক দেখিয়ে প্রমাণ করেছে দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোন আপস করতে চায় না তারা। বিএসএফ যেখানে প্রতিটি পুশ ইনের জন্য গভীর রাত বা ভোরবেলাকে বেছে নিচ্ছে তখন বিজিবিও পাল্টা কৌশলে তাদের রুখে দিচ্ছে। বিএসএফ গভীর রাতে সীমান্তের বাতি বন্ধ করলেই আরও সতর্ক হয়ে উঠছে বিজিবি ও গ্রামবাসী। লাঠিসোটা হাতে নিয়ে সাধারণ মানুষের বিজিবির পাশে শক্ত অবস্থানে থাকায় পাততাড়ি গুটাতে বাধ্য হচ্ছে বিএসএফ। নওগাঁ সাপাহার সীমান্ত এলাকায় গত বুধবার (২৪ জুন) ঘটেছে এমনই একটি ঘটনা। ওই রাতে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ৯ জনকে পুশইনের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে নিজ দেশে ফিরিয়ে নিয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)।
এ ছাড়াও সীমান্তের বিভিন্ন পোস্টে বিজিবিকে ভয় দেখাতে সদস্য সংখ্যা বাড়িয়েও কোন সুফল পায়নি বিএসএফ। বিজিবি দেশপ্রেম ও পেশাগত দক্ষতার উচ্চ মানদণ্ডে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে পরাস্ত করছে বারবার। বিজিবি ও বিএসএফর মধ্যকার কৌশল পাল্টা কৌশলে বিএসএফ’র মার খাওয়ার অন্যতম বড় কারণ নেতৃত্ব। বিজিবি পরিচালিত হয় দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে। এটি একটি প্যারা মিলিটারি ফোর্স। অন্যদিকে, বিএসএফ আসে পুলিশ থেকে। তাঁরা কোনভাবেই বিজিবির সঙ্গে পেরে উঠছে না। বিজিবি মহাপরিচালকের বিচক্ষণ নেতৃত্বে অকুতোভয় সদস্যরা বিভিন্ন পয়েন্টে এখন পর্যন্ত ৬০০ এর বেশি অবৈধ পুশ ইন প্রতিহত করেছে।
কাজে এসেছে সীমান্ত সুরক্ষায় বিজিবির শূন্য সহনশীলতার নীতি
ওয়াচ টাওয়ার, পর্যবেক্ষণ পোস্ট, সিসিটিভি ক্যামেরাসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার স্থলসীমান্তকে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হচ্ছে। অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি ও অপারেশনাল কার্যক্রম। এমনকি যশোর, সাতক্ষীরা, জয়পুরহাট ও টেকনাফ সীমান্তে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের জন্য স্থাপিত হয়েছে আধুনিক বর্ডার সার্ভেইল্যান্স সিস্টেম (বিএসএস)। কক্সবাজার অঞ্চলের টেকনাফ, রামু, উখিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকায় দিন-রাত নজরদারি হচ্ছে থার্মাল ইমেজিং সিস্টেমে। চব্বিশের দুনিয়া কাঁপানো জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকেই বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী সীমান্তকে সুরক্ষিত করার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বিজিবির সঙ্গে একাত্ম হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলে সীমান্তের মানুষজনও। সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হচ্ছে। পুশ ইন ঠেকানো, কাঁটাতার স্থাপন, মাদক ও মানবপাচার প্রতিহত করা, দক্ষিণ-পূর্বে মায়ানমার সীমান্তের অস্থিতিশীলতা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে জানিয়ে দিয়েছে- দিন বা রাত বলে কোন কথা নেই! সীমান্তের নির্ভীক প্রহরীরা সতর্ক সর্বোচ্চ। এক্ষেত্রে তাঁরা অবলম্বন করছে শূন্য সহনশীলতার নীতি।
বিজিবি ও গ্রামবাসীর ঐক্যবদ্ধতায় রক্তচক্ষু দেখানোর দিন শেষ
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও সীমান্তের গ্রামের সাধারণ মানুষের পুশ ইন ঠেকাতে সংকল্পের দৃঢ়তা পাল্টে দিয়েছে সব দৃশ্যপট। ২৪ ঘণ্টা টহলের মাধ্যমে মাইকিং করে বিজিবি জাগ্রত করছে গ্রামবাসীকে। বিজিবি আর গ্রামবাসীর সম্মিলিত প্রতিরোধে বিএসএফ’র পুশ ইন অপচেষ্টা সফল হচ্ছে না। বিজিবির পাশাপাশি গ্রামের মানুষ রাত জেগে সীমান্ত পাহারা দিচ্ছে। পিছু হটছে বিএসএফ। সীমান্ত প্রহরীদের সঙ্গে গ্রামবাসীর এমন অভূতপূর্ব ঐক্য জানান দিচ্ছে- ‘মা তোর বদনখানি মলিন হলে, ও মা, আমি নয়নজলে ভাসি’।
বিজিবি ও সীমান্তবাসীর ভালোবাসা ও একাত্মতায় অনির্বাণ বাংলার সীমান্তে সার্বভৌমত্ব বিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে দীপ্তি ছড়ানো উচ্চারণ তাই এক বিজিবি সদস্যের কণ্ঠে-‘বাঁশি মারলে চইলা আসবেন, যা আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বো।’ সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া এমনই একটি রিলস (ভিডিও) আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে বাংলা মায়ের দামাল ছেলেদের ঐক্যবদ্ধতার আহ্বান বুঝিয়ে দিয়েছে সীমান্তে বিএসএফ’র রক্তচক্ষু দেখানোর দিন শেষ। পাশাপাশি নিজেদের মধ্যকার দৃঢ় ঐক্য প্রদর্শনের এসব সারি সারি চিত্রপট নিশ্চিত করেছে- দেশ বিরোধী কোন ষড়যন্ত্রই আর হালে পানি পাবে না। কোথাও কোথাও বিজিবি-বিএসএফ সদস্যরা বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েছেন। সেখানেও বিএসএফকে ছেড়ে কথা বলছে না বিজিবি।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, সাধারণত একটি ভালোবাসাপূর্ণ সম্পর্ক যখন মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়ায় মূলত সেখানে যদি থাকে পারস্পরিক বোঝাপড়া, বিশ্বাস এবং শ্রদ্ধা। সময়ে নিজেরা তখন হয়ে ওঠে এক আশ্রয় ও অনন্য নির্ভরতা। বিজিবি-জনতার বন্ধুত্ব পানির মতো টলটলে পরিষ্কার। ভালোবাসার রঙে রাঙানো এক সস্পর্ক। অবিচ্ছেদ্য এই বন্ধনই এখন উল্টো ভয়ের কারণ বিএসএফ’র।
সম্প্রতি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) বিতর্কিত কর্মকাণ্ড পুশ ইন। আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি এবং মানবিক রীতিনীতি উপেক্ষা করে বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকার বিস্তীর্ণ পথ দিয়ে জোর করে নারী, পুরুষ, শিশু নির্বিশেষে বাংলাদেশে পুশইন করা বা ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশ সরকার শুরু থেকেই জোরালো ভাষায় এই ইস্যুতে শক্ত কথা বলছে, প্রতিবাদ করছে। অতীতের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির পরিবর্তে সরকার মেরুদণ্ড সোজা করে কথা বলায় খবরদারি বা দাদাগিরি মাঠে মারা পড়ছে। ইতোমধ্যেই সীমান্তে বিজিবির সাহসী ও দায়িত্বশীল ভূমিকার প্রশংসা করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও। তিনি বলেছেন, ‘বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কঠোর নজরদারির কারণে দেশের সীমান্তে একজনকেও অবৈধভাবে পুশ-ইন হতে দেওয়া হয়নি।’
পুশ ইনের অন্যায্য তৎপরতা ঠেকাতে সক্রিয় বাংলাদেশ সরকারও। বাংলাদেশে অস্থিরতা তৈরির ছক কষে প্রতিবেশী দেশটি রাজনৈতিকভাবে ফায়দা হাসিল করতে চায় বলেও অভিযোগ রয়েছে। দু’ দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে অবৈধ পুশ ইন নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পুশ ইন বন্ধে ভারত সরকারকে একাধিকবার চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা আরও কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন। পুশইন না করে বাংলাদেশি নাগরিক হলে যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে হস্তান্তর করার বার্তা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, ‘ভারতের কাছে যদি অবৈধভাবে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের তালিকা থাকে, তাহলে তা কূটনৈতিক বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশকে জানাতে পারে। এরপর বাংলাদেশ সরকার নিয়মতান্ত্রিকভাবে তাদের জাতীয়তা যাচাই করে আইনি প্রক্রিয়ায় দেশে ফিরিয়ে আনবে।’
লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

