দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি বহুদিন ধরেই স্থলসীমান্ত, সমুদ্রপথ এবং কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণে আকাশসীমার গুরুত্ব ক্রমশ বেড়ে চলেছে। কার্যত বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় যে রাষ্ট্র নিজের আকাশসীমা রক্ষায় সক্ষম নয়, সে রাষ্ট্রের অর্থনীতি, কূটনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তাও দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির মুখে পড়ে। সেই বাস্তবতা উপলব্ধি করেই বাংলাদেশ সরকার দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চীনের অত্যাধুনিক ২০টি জে-১০সিই (J-10CE) মাল্টিরোল ফাইটার জেট ক্রয়ের উদ্যোগ শুধু একটি সামরিক ক্রয় নয়; এটি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, কৌশলগত আত্মবিশ্বাস এবং আঞ্চলিক অবস্থানকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার এক সাহসী পদক্ষেপ।
দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর আওতায় আধুনিকায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আধুনিক যুদ্ধ প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন এবং দক্ষিণ এশিয়ার ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে আরও শক্তিশালী ও আধুনিক যুদ্ধবিমান সংগ্রহ ছিল সময়ের দাবি। সেই প্রয়োজনীয়তাকেই বাস্তবে রূপ দিয়েছে বর্তমান সরকারের এই সিদ্ধান্ত।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যুদ্ধবিমান ক্রয়ের আলোচনা নতুন গতি দেয়। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর গঠিত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারও জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সেই প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখে। ফলে এটি কোনো দলীয় সিদ্ধান্ত নয়; বরং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা কৌশলের ধারাবাহিকতার প্রতিফলন।
বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষার বাস্তবতা দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি ছিল। বিমান বাহিনীর বহরে থাকা এফ-৭ যুদ্ধবিমানগুলো বহু বছর দেশের নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও আধুনিক আকাশযুদ্ধের বাস্তবতায় সেগুলোর সীমাবদ্ধতা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একইভাবে সীমিত সংখ্যক মিগ-২৯ দিয়ে একটি দ্রুত পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিবেশ মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়ছিল। তাই নতুন প্রজন্মের যুদ্ধবিমান সংগ্রহ ছিল অনিবার্য।
জে-১০সিই সেই প্রয়োজন পূরণের ক্ষেত্রে একটি যুগোপযোগী সমাধান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এটি ৪.৫ প্রজন্মের অত্যাধুনিক মাল্টিরোল ফাইটার জেট, যা একইসঙ্গে আকাশ প্রতিরক্ষা, স্থল হামলা এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা অভিযানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম। উন্নত অ্যাকটিভ ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যানড অ্যারে (AESA) রাডার, আধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বহনের সক্ষমতা এটিকে বিশ্বের অন্যতম কার্যকর যুদ্ধবিমান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বিশেষ করে ২০২৫ সালে ভারত-পাকিস্তান সীমিত আকাশ সংঘাতের সময় পাকিস্তানের ব্যবহৃত জে-১০সি যুদ্ধবিমানের কার্যকারিতা আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তখন থেকেই এই প্ল্যাটফর্মকে ঘিরে বৈশ্বিক আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশের জন্য এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ, কারণ আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত প্রযুক্তির মূল্য সবসময়ই বেশি।
প্রায় ২.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই প্রতিরক্ষা চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর আর্থিক কাঠামো। পুরো অর্থ এককালীন পরিশোধ করতে হবে না; বরং দীর্ঘমেয়াদি সহজ কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে জাতীয় অর্থনীতির ওপর তাৎক্ষণিক চাপ সৃষ্টি না করেই বাংলাদেশ তার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আধুনিক করতে পারবে। শুধু যুদ্ধবিমানই নয়, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ, লজিস্টিক সহায়তা এবং উন্নত অস্ত্র ব্যবস্থাও এই প্যাকেজের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তবে এই সিদ্ধান্তের গুরুত্ব কেবল সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সুদূরপ্রসারী ভূরাজনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক কৌশলগত অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির স্বার্থ এখানে প্রতিনিয়ত একে অপরের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রতিটি বড় কৌশলগত সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করে
ভারত এই চুক্তিকে গভীর আগ্রহের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্তকারী শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’-এর নিরাপত্তা নিয়ে ভারতীয় প্রতিরক্ষা মহলে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে আধুনিক যুদ্ধবিমান মোতায়েনের সম্ভাবনা ভারতীয় কৌশলবিদদের নতুন হিসাব-নিকাশে বাধ্য করেছে।
কিন্তু বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ঢাকা বরাবরই বলে এসেছে যে দেশের প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়; বরং জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার নিরাপত্তা চাহিদা অনুযায়ী প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহের অধিকার রাখে এবং এই সিদ্ধান্ত সেই অধিকারেরই বহিঃপ্রকাশ।
আসলে বর্তমান বিশ্বে সামরিক সক্ষমতা শুধু যুদ্ধ করার জন্য নয়, যুদ্ধ প্রতিরোধের জন্যও অপরিহার্য। শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্ভাব্য হুমকিকে নিরুৎসাহিত করে এবং কূটনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করে। বাংলাদেশের অর্থনীতি যত বড় হচ্ছে, বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক কৌশলগত গুরুত্ব যত বাড়ছে, ততই দেশের আকাশ ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরে বিপুল সামুদ্রিক সম্পদ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথ এবং ভবিষ্যৎ জ্বালানি সম্ভাবনা বাংলাদেশের নিরাপত্তা চিন্তাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। আধুনিক যুদ্ধবিমান শুধু আকাশসীমাই নয়, সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ফলে এই বিনিয়োগকে কেবল সামরিক ব্যয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তারও একটি অংশ।
চীনের সঙ্গে এই চুক্তি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে আরও গভীর করবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে একই সঙ্গে বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক, চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে উন্নয়ন অংশীদারিত্ব—সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশকে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের পথেই এগোতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, জে-১০সিই যুদ্ধবিমান ক্রয়ের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। এটি শুধু নতুন যুদ্ধবিমান কেনার ঘটনা নয়; এটি একটি আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশের প্রতীক, যে বাংলাদেশ তার নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। আজকের পৃথিবীতে শক্তিশালী রাষ্ট্র হওয়ার জন্য শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নিরাপদ আকাশসীমা, সুরক্ষিত সমুদ্রসীমা এবং আত্মবিশ্বাসী প্রতিরক্ষা কাঠামো। সেই বাস্তবতায় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের এই পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী। পাশাপাশি এটি দেশপ্রেমের একটি চূড়ান্ত ও শক্তিশালী দৃষ্টান্ত।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।

