ঢাকা শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬

কুবিতে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ শুধু কাগজে-কলমে, আইন মানে না কেউ!

আলী আকবর, কুবি প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুন ২০, ২০২৬, ০৮:১৬ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ, অন্যদিকে ক্যাম্পাসে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য রাজনৈতিক তৎপরতা—এই দ্বৈত বাস্তবতায় চলছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা ও আইনি বিধান সত্ত্বেও ক্যাম্পাসে মিছিল, সংবাদ সম্মেলন, সদস্য সংগ্রহ কার্যক্রমসহ নানা কর্মসূচিতে সক্রিয় দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনকে। ফলে ‘রাজনীতি নিষিদ্ধ’ সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা ও বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ২০০৭ সালের প্রথম সিন্ডিকেট সভা এবং ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত ১০০তম (জরুরি) সিন্ডিকেট সভায় ক্যাম্পাসে সব রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ক্যাম্পাসে কোনো রাজনৈতিক দলের অঙ্গ সহযোগী বা ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন প্রকাশ্যে বা গোপনে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালাতে পারবে না।

এ ছাড়া, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় আইন ৪৩ (ঘ) ধারা অনুযায়ী, কোনো শিক্ষক, কর্মকর্তা বা কর্মচারী কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে পারবে না। কেউ এই নীতিমালা ভঙ্গ করলে, শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রয়েছে। তবে বিধান থাকলেও এই আইনের তোয়াক্কা করেছেন না কেউ। বিভিন্ন সময় মিছিল, মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন ও সাংগঠনিক কর্মসূচির মাধ্যমে সরব উপস্থিতি নিয়ে জানান দিচ্ছে রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠনগুলো। ফলে ‘রাজনীতি নিষিদ্ধ’ সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে আধিপত্য বিস্তার করেছিল ছাত্রলীগ। নিয়োগ বাণিজ্য, টেন্ডার, শিক্ষার্থীদের নির্যাতন, হল দখল, আঞ্চলিক সংগঠনের শীর্ষপদসহ সব শাখায় নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করেছিল তারা। তবে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ক্যাম্পাস থেকে পালিয়ে যায় কুবি শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

এরপর ক্যাম্পাসে সক্রিয় হয় ছাত্রদল ও শিবির। আগে থেকে কুবি শাখা ছাত্রদলের কমিটি প্রকাশিত থাকলে ৫ আগস্টের প্রথম প্রকাশ্যে আসে কুবি শাখা ছাত্রশিবিরের কমিটি। তারা উভয় দলই পুরোদমে রাজনীতি শুরু করেছে ক্যাম্পাসে। শুরু থেকে উভয় দলই নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের জন্য নানানভাবে জানান দিচ্ছে ক্যাম্পাসে।

ছাত্রদল কুবি শাখার আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয় ২০২১ সালের ১৭ জুন। প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো সেই আহ্বায়ক কমিটির মাধ্যমেই চলছে সংগঠনটির কার্যক্রম। ওই কমিটির আহ্বায়ক লোক-প্রশাসন বিভাগের ২০০৭-০৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মামুন, যার ছাত্রত্ব শেষ হয়েছে প্রায় এক দশক আগে। সদস্য সচিব ইংরেজি বিভাগের ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোস্তাফিজুর রহমান শুভর ছাত্রত্বও শেষ হয়েছে প্রায় নয় বছর আগে।

আবদুল্লাহ আল মামুন ও মোস্তাফিজুর রহমান শুভর নেতৃত্বে ছাত্রদলের রাজনৈতিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তাদের নেতৃত্বে ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে বিভিন্ন সময় দলীয় কর্মসূচি, সদস্য সংগ্রহ, ফরম বিতরণ, মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হতে দেখা গেছে। সর্বশেষ গত ৭ মে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্যের পদত্যাগসহ ৯ দফা দাবিতে প্রশাসনিক ভবনের সামনে সংবাদ সম্মেলন করেন তারা। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভা বন্ধ রাখতে উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ ও রেজিস্ট্রার দপ্তরে গিয়ে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও ওঠে দলটির বিরুদ্ধে। এছাড়াও গত ১৫ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কুমিল্লায় আগম উপলক্ষে আনন্দ মিছিল করেছে সংগঠনটি।

অন্যদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনীতি নিষিদ্ধ ক্যাম্পাসে শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতৃত্ব তিনবার পরিবর্তন হয়েছে। সর্বশেষ চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি নতুন কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সভাপতি ইংরেজি বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোজাম্মেল হোসেন আবির এবং সেক্রেটারি লোক-প্রশাসন বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম রয়েছেন। তাদেরও ছাত্রত্ব শেষ হয়েছে। তবে কমিটির অন্য সদস্যদের নাম প্রকাশ করেনি সংগঠনটি।

সংগঠনটি ছাত্রদলের মতো প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা না করলেও বেশ সক্রিয় আছে ক্যাম্পাসে। অভিযোগ রয়েছে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে সংগঠনটি। ইতোমধ্যে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিকট বিভিন্ন দাবি-দাওয়া উপস্থাপন করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ভর্তি পরীক্ষার সময় হেল্প ডেস্ক, নবীন বরণ, ইফতার সামগ্রী বিতরণ, রান উইথ সিওইউ শিবিরসহ নানান কর্মসূচি দলীয় ব্যানারে পালন করেছে সংগঠনটি।

এ ছাড়াও, এনসিপির ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তি সক্রিয় এবং বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রআন্দোলনকেও বিভিন্ন কাজ করতে দেখা গেছে।

এ বিষয়ে শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মোস্তাফিজুর রহমান শুভ বলেন, ‘রাজনীতি করা বা না করা সম্পূর্ণ শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। কেউ চাইলে নিজের আদর্শ অনুযায়ী রাজনীতিতে যুক্ত হতে পারে, আবার না চাইলে দূরে থাকতে পারে।’

তবে তিনি শিক্ষার্থীদের গুপ্ত রাজনীতি ও ‘মব কালচার’ থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানান। এ ছাড়াও, বর্তমান সিন্ডিকেট ও প্রশাসনকে ছাত্রদল বৈধ মনে করে না। কুকসু গঠনের বিষয়ে প্রশাসন ছাত্রদলের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু কুকসু গঠনে ছাত্রদল সহযোগিতা করবে বলেও জানান তিনি।

শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি মোজাম্মেল হোসেন আবির বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনকে সম্মান জানিয়ে ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে তারা কোনো রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন না। তবে ক্যাম্পাসের বাইরে শিক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।’

তাদের বিরুদ্ধে ‘গুপ্ত রাজনীতি’র অভিযোগকে ভিত্তিহীন দাবি করে তিনি বলেন, ‘অতীতে দমন-পীড়নের কারণে সংগঠনকে আড়ালে কাজ করতে হলেও বর্তমানে তারা প্রকাশ্যেই শিক্ষার্থীবান্ধব কর্মসূচি পরিচালনা করছে। তার দাবি, ছাত্রশিবিরের অধিকাংশ কার্যক্রমই ব্যক্তি গঠন ও শিক্ষামূলক।’

ছাত্র সংসদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিতে সবচেয়ে সোচ্চার সংগঠনগুলোর একটি ছাত্রশিবির। এ দাবিতে তারা মন্ত্রণালয় পর্যন্ত যোগাযোগ করেছে বলেও জানান তিনি।

অন্যদিকে, ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি অব্যাহত থাকায় বিপাকে পড়ছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তাদের অভিযোগ, লেজুড়বৃত্তি রাজনীতির কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। রাজনৈতিক দলগুলো শিক্ষার্থীদের অধিকারের কথা বললেও বাস্তবে নিজেদের সংগঠন শক্তিশালী করতেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (কুকসু) গঠনের দাবি জানিয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

এ বিষয়ে আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মো. বায়েজিদ হাসান বলেন, ‘প্রশাসনের নীরবতা পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করছে। তিনি দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে নিরাপদ ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতের দাবি জানান।’

এ বিষয়ে প্রক্টর অধ্যাপক ড. আব্দুল হাকিম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ রয়েছে।’ তিনি জানান, ক্যাম্পাসে মিছিল-মিটিং বা রাজনৈতিক কার্যক্রম প্রশাসনের নজরে এলে পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

কুকসুর গঠনতন্ত্র অনুমোদনের অগ্রগতি সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘গঠনতন্ত্রটি বর্তমানে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ের জন্য আটকে রয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং সম্পন্ন হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে জানাবে।’

এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরিফুল করিম বলেন, ‘সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত কি সেটা আমাকে আগে দেখতে হবে। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ, কোন কিছু দেখার সুযোগ হয়নি। সবার সঙ্গে কথা বলারও সুযোগ হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় খুললে সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত কি সেটা দেখে মন্তব্য করা যাবে।’ 

আইন অমান্য করে কোন কাজ করলে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘যে কোন আইন অমান্য করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা কমিটি ব্যবস্থা নিবে।’