ঢাকা শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬

রায়গঞ্জে ৬ বছরেও চালু হয়নি ২৬ কোটি ১৫ লাখ টাকার জলাধার

রায়গঞ্জ (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুন ২০, ২০২৬, ০৮:৪৯ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ পৌরবাসীর জন্য বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রায় ২৬ কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি বৃহৎ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পের আওতায় ছয় লাখ লিটার ধারণক্ষমতার একটি জলাধার নির্মাণ করা হয়েছে। ২০২০ সালে কাজ শুরু হয়ে ২০২২ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও এটি এখনো চালু হয়নি। ফলে পানি সরবরাহের আশায় সংযোগ নেওয়া শত শত গ্রাহক চরম হতাশায় রয়েছেন।

সরেজমিনে রায়গঞ্জ পৌর শহরের ধানগড়া পালপাড়া এলাকায় দেখা যায়, বিশাল আকৃতির জলাধারের অবকাঠামোগত কাজ প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। পাইপলাইন ও গ্রাহক সংযোগও স্থাপন করা হয়েছে। তবে পুরো প্রকল্পটি এখনো অচল অবস্থায় পড়ে আছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বিদ্যুৎ সংযোগ না পাওয়ায় পানি সরবরাহ চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।

প্রকল্পের আওতায় দুই হাজার গ্রাহককে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে প্রায় ৭০০ পরিবার সংযোগ নিয়েছে। সংযোগ বাবদ প্রতিটি গ্রাহকের কাছ থেকে ৫২০ টাকা জামানত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রতি এক হাজার লিটার পানির জন্য ১৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিটি সংযোগে মিটারও স্থাপন করা হয়েছে।

তবে সংযোগ নেওয়ার পর বছর পার হলেও কোনো গ্রাহক এখনো এক ফোঁটা পানিও পাননি।

স্থানীয় বাসিন্দা দিজেন পাল বলেন, ‘পানি পাওয়ার আশায় টাকা জমা দিয়ে সংযোগ নিয়েছিলাম। তখন বলা হয়েছিল দ্রুত পানি সরবরাহ শুরু হবে। কিন্তু ছয় বছরেও কোনো সেবা পাইনি। বাধ্য হয়ে নিজ খরচে সাবমার্সিবল পাম্প বসিয়েছি।’

গৃহবধূ ছবি পাল বলেন, “বিশুদ্ধ পানির জন্য সংযোগ নিয়েছিলাম। কিন্তু শুধু আশ্বাসই পেয়েছি। পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে শেষ পর্যন্ত আলাদা নলকূপ বসাতে হয়েছে।”

রনজিৎ দাস বলেন, ‘সংযোগ আছে, কিন্তু পানি নেই। দীর্ঘ অপেক্ষার পর নিজেরাই পানির ব্যবস্থা করেছি। এখন এই সংযোগের প্রয়োজনীয়তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।’

একই ধরনের ক্ষোভ প্রকাশ করেন ভানু রাম পাল। তিনি বলেন, “এখন এলাকার বেশিরভাগ মানুষ নিজস্ব ব্যবস্থায় পানির সমস্যা সমাধান করেছে। তাই এতদিন পর প্রকল্প চালু হলেও মানুষ কতটা আগ্রহ দেখাবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।”

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, দেশের ৩০টি পৌরসভায় বাস্তবায়নাধীন পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় রায়গঞ্জ পৌরসভায় এ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।

এ প্রকল্পে জলাধার নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১০ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এছাড়া ২ হাজার ৮০০ মিটার ড্রেন নির্মাণে প্রায় ১২ কোটি টাকা এবং পাইপলাইন স্থাপনে আরও ৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রকল্পের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৬ কোটি ১৫ লাখ টাকা।

কাজটি বাস্তবায়ন করছে ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স এন অ্যান্ড সি কেটি (জেভি)। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ না হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ইতোমধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রায়গঞ্জে বড় ধরনের পানিসংকট না থাকলেও প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এখন দীর্ঘসূত্রতায় এর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের রায়গঞ্জ উপজেলার উপসহকারী প্রকৌশলী মেহেদী হাসান বলেন, এটি একটি বড় প্রকল্প। বিভিন্ন প্রশাসনিক ও কারিগরি জটিলতার কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। এজন্য প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

প্রকল্পের ঠিকাদার নুরুল আলম টিটু বলেন, প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সংযোগ না পাওয়ায় জলাধারটি চালু করা যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ সংযোগ পেলেই পানি সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হবে।

রায়গঞ্জ পৌরসভার প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, সরকার প্রয়োজনীয়তা যাচাই করেই প্রকল্পটি অনুমোদন দিয়েছে। দ্রুত প্রকল্প চালুর জন্য পৌরসভার পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হচ্ছে।

ভুইয়াগাঁতী পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসের ডিজিএম মো. নিজামুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পে বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদানের কাজ শুরু হয়েছে। খুব শিগগিরই মিটার স্থাপন করা হবে।

প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতে আর বেশি সময় বাকি নেই। অথচ এখনো শুরু হয়নি পানি সরবরাহ। এ অবস্থায় কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত জলাধার প্রকল্পটি আদৌ কার্যকর হবে কি না, পর্যাপ্ত গ্রাহক পাওয়া যাবে কি না এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে কি না—এমন প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে রায়গঞ্জ পৌরবাসীর মনে। ছয় বছরের অপেক্ষার পরও বিশুদ্ধ পানির সুবিধা না পাওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা দিন দিন বাড়ছে।