ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬

তারেক রহমানের হাত ধরেই বিশ্বমানের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা

এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান
প্রকাশিত: জুন ১১, ২০২৬, ০৮:০৭ পিএম
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি : সংগৃহীত

শিক্ষার মূল ভিত্তি প্রাথমিক শিক্ষা একেবারেই নড়বড়ে। পরবর্তী উচ্চ শিক্ষার মজবুত বুনিয়াদ হিসেবে কাজ করা এই শিক্ষার প্রসার হলেও শিখনের ভিত এখনও বেশ দুর্বল। শিক্ষক সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গুণগত শিক্ষার মান। পরিকল্পিত ও দীর্ঘ মেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গির অভাবে বছরের পর বছর মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে। এবার প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে উপযুক্ত মানদণ্ড ও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের মাধ্যমে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে জীবনমুখী ও অন্তর্ভূক্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থায় রূপান্তরিত করতে যুগান্তকারী সব পদক্ষেপ বাস্তবায়নের কাজও শুরু হয়েছে পুরোদমে। একজন শিশুর আত্মিক ও দেশের সামগ্রিক আর্থসামাজিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের কার্যকর সূচনায় প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোতে বিশেষভাবে নজর দেওয়া হয়েছে। 

আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে জাতির অগ্রগতি ও টেকসই উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে ভেবেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই আগামীর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চান। রূপান্তরিত করতে চান বিশ্বজয়ী মানবসম্পদে। দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বমানের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সুদূরপ্রসারী চিন্তা থেকে তিনি প্রতিটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। সামগ্রিকভাবে প্রাথমিক শিক্ষার সার্বিক উন্নয়নে পরিকল্পনা করা হয়েছে ১৩টি নতুন প্রকল্পের। অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়ন, খেলাধুলার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণ জোরদারে এসব প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।

শিক্ষার্থীর অনুসন্ধিৎসু হৃদয়কে জ্ঞানের আলোর সঙ্গে পরিচিত করার মধ্যে দিয়ে সৃজনশীল ও আধুনিকতার সমন্বয়ে গড়ে তোলা হবে ‘স্মার্ট এডুকেশন ইকোসিস্টেম’। ডিজিটাল কন্টেন্ট ব্যবহারের মাধ্যমে গড়ে তোলা হবে আধুনিক শ্রেণিকক্ষ। বিশেষভাবে গুরুত্ব পাবে ইন্টারঅ্যাকটিভ প্রযুক্তি এবং উন্নত সংযোগব্যবস্থা সম্প্রসারণের বিষয়টিও। একটি সমন্বিত ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এলএমএস), স্মার্ট মূল্যায়ন ও শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণও এক প্ল্যাটফর্মে আনতে চায় সরকার। কেবলমাত্র পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা নয় এর সঙ্গে পুষ্টির সমন্বয় ঘটানো সম্ভব হলে আনন্দমুখর ও আলোকোজ্জ্বল এক শিক্ষাব্যবস্থার সূত্রপাত ঘটবে। এছাড়াও প্রাথমিক স্তরে ভাষা শিক্ষার ভিত্তি শক্তিশালী করা, শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা, শুদ্ধ ভাষা চর্চা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষাকে আরও কার্যকর ও আনন্দময় করতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।

স্বভাবতই এজন্য একদম গোড়া থেকে অভিনব কর্মসূচি চালুর মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা খাতকে খোলনলচে পাল্টে দিতে আগ্রহী সরকারপ্রধান তারেক রহমান। খাবার, বিনামূল্যে ইউনিফর্ম, জুতা, মোজা, স্কুল ব্যাগসহ নানান প্রণোদনার মাধ্যমে দুই কোটি শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়ে ‘ধরে রাখতে’ চায় সরকার। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১ কোটি ৭ লাখের বেশি শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে এসব শিক্ষা উপকরণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর আগামী জুলাই-আগস্ট মাসের মধ্যেই শুরু হচ্ছে পরীক্ষামূলকভাবে (পাইলট প্রজেক্ট) এই সামগ্রী বিতরণ কার্যক্রম। শুরুতেই এই কার্যক্রমের আওতায় আসবেন প্রায় সাড়ে ৩ লক্ষ শিক্ষার্থী। যেখানে যুক্ত করা হবে ২৫ হাজারের বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে। এর মাধ্যমে নির্বাচনি ইশতেহার ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা দুটিই বাস্তবায়ন করতে চায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। 

দেশের প্রাথমিক শিক্ষা খাতে গুরুত্বপূর্ণ এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একযোগে কাজ করছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়। প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ৫ লক্ষ পাটের ওয়াটারপ্রুফিং স্কুল ব্যাগ উপহার হিসেবে সরবরাহ করবে পাট মন্ত্রণালয়। কার্যক্রম সফলে সামগ্রিক সহযোগিতা দেবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। ইতোমধ্যেই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম ও বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল ইসলাম গত সোমবার (৮ জুন) সচিবালয়ে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে এই বিষয়ে সভা করে নিজেদের লক্ষ্য বাস্তবায়নে অনেক দূর এগিয়ে গেছেন। শিক্ষার গুণগত মান বাড়ানো ও সঠিক শিক্ষা লাভের সুযোগ উন্মোচিত করার মধ্যে দিয়ে সরকারপ্রধানের স্বপ্নকে পূর্ণতার মিশন তাদের। 

প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বিভিন্ন খেলাধুলা ও সংস্কৃতিচর্চা চালু রয়েছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এই দু’টি বিষয় কখনও শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি। আপাতত ফুটবল ও দাবাকে খেলাধুলায় প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। গান, আবৃত্তি ও বিতর্ক থাকবে সংস্কৃতির পরিমণ্ডলে। জাতীয় শিক্ষাক্রমে চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দেশে ৬৫ হাজারের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ টুর্নামেন্ট’। ইউনিয়ন ও পৌরসভা পর্যায়ের খেলার মাধ্যমে চলতি বছরের ৬ এপ্রিল শুরু হয় এই টুর্নামেন্ট। বালক বিভাগে ৬৫ হাজার ৩৪২টি এবং বালিকা বিভাগে ৬৫ হাজার ৩২১টি দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে।

এখানে সংস্কৃতিচর্চার বিষয়টিকে ভাগ করা হয়েছে পারফরমেটিভ ও এক্সপ্রেসিভ- এই দু’ভাগে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এই বিষয়ে বলেছেন, ‘পারফরমেটিভ বলতে বোঝানো হচ্ছে যে শিক্ষার্থীরা কোনো শিল্প বা সাংস্কৃতিক কাজ সরাসরি পরিবেশন করবে। অর্থাৎ, শিক্ষার্থীকে অন্যদের সামনে নিজের দক্ষতা প্রদর্শন করতে হয়। আর এক্সপ্রেসিভে মঞ্চে পরিবেশনের চেয়ে নিজের ভাবনা বা অনুভূতি প্রকাশের বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে মূল বিষয় হলো সৃজনশীলভাবে নিজেকে প্রকাশ করা।’ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনায় অগ্রাধিকার পাচ্ছে শিক্ষার্থীদের জন্য কল্যাণমূলক কর্মসূচি মিড ডে মিল। পাইলট এই কর্মসূচি নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। এটি শুধুমাত্র খাদ্য সহায়তা হিসেবে নয় বিদ্যালয়গুলোতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার কমানোর পাশাপাশি করতে বিদ্যালয়মুখী করতেও উৎসাহিত করবে। একই সঙ্গে যোগান দিবে প্রয়োজনীয় পুষ্টির। 

একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধময় আগামীর জন্য একজন শিশুকে নিজস্ব সাংস্কৃতিক আকার-ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করে তুলতে প্রাথমিকের কচিকাচাদের সৃজনশীলতা ও সামগ্রিক বিকাশে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভূক্ত করা হচ্ছে সংগীত, নাট্যকলা, নৃত্যকলা এবং চারু ও কারুকলার মতো বিষয়গুলো। একই সঙ্গে যুগোপযোগী, দক্ষতাভিত্তিক ও বাস্তবমুখী নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়নে কাজ চলছে। ২০২৮ সালের মধ্যেই শুরু হচ্ছে নতুন কারিকুলাম। ২০২৭ সাল থেকে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ‘শিল্প ও সংস্কৃতি’ নামে নতুন পাঠ্যবই চালু করা হবে। এই বইয়ের চারটি অধ্যায়ে চারু ও কারুকলা, সংগীত, নৃত্যকলা ও নাট্যকলা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। বুধবার (১০ জুন) প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এসব যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘বর্তমান সরকারের শিক্ষা-দর্শনের মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্য তাদের দক্ষ করে তোলা। শিল্প, সংস্কৃতি ও ক্রীড়াভিত্তিক শিক্ষা শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’ 

প্রাথমিক শিক্ষায় এই বিষয়গুলোর সংযোজন তরুণ প্রজন্মের জন্য চাকরির নতুন দ্বার উন্মোচন করবে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বিপুলসংখ্যক বিশেষায়িত শিক্ষক ও প্রশিক্ষকের প্রয়োজন হবে। আগামী পাঁচ বছরে এই খাতে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। সংগীত, নৃত্যকলা, চারুকলা ও নাট্যকলা বিষয়ে ডিগ্রিধারী তরুণ-তরুণীদের জন্য এটি একটি দারুণ সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হবে। সংশ্লিষ্ট বিভাগের শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে তাদের পাঠ্যক্রমে শিক্ষকতা-সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ বা প্রস্তুতিমূলক মডিউল যুক্ত করার বিষয়ে সরকার কাজ করছে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটবে এবং দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। 

প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জলবায়ু সহনশীল শিক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ভাসমান বা নৌকাভিত্তিক বিদ্যালয় মডেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলেও মনে করেন। তার মতে, নৌকাভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং এটি একটি কার্যকর ও পরীক্ষিত মডেল। এই  অভিজ্ঞতাকে দেশের অন্যান্য অনুরূপ অঞ্চলে কীভাবে সম্প্রসারণ করা যায়, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে। 

জাতীয় পুনর্জাগরণের প্রধান শক্তি হয়ে উঠতে পারে প্রাথমিক শিক্ষা। মেধাবী কোমলমতি শিশুদের মননকে জাগিয়ে তোলার মাধ্যমে নিশ্চিত হোক প্রকৃত আনন্দময় শিক্ষা। প্রতিটি এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয় মুখরিত হোক সংশ্লিষ্ট এলাকার সামাজিক, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে। শিক্ষার মেরুদণ্ড প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে সরকারের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ হয়ে উঠুক একুশ শতকের আধুনিক প্রাথমিক শিক্ষার তীর্থক্ষেত্র। শিক্ষাকে জাতির শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত ধরেই জ্ঞান অর্জনের প্রথম পাঠশালা থেকে অর্জিত শিক্ষার মাধ্যমেই দেশের ভবিষ্যৎ অবশ্যই শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো সম্ভব।

লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক সন্ধানী বার্তা; অ্যাকটিং এডিটর, কালের আলো ডট কম।