সমাজ মানুষের পরম আশ্রয়; সমাজ আমাদের অস্তিত্বের প্রথম ও শেষ ঠিকানা। এখানেই আমাদের জন্ম, এখানেই আমাদের বেড়ে ওঠা এবং জীবনের সমস্ত স্বপ্ন বুনে যাওয়া। সমাজ নামক এই যৌথ কাঠামোর পত্তনই হয়েছিল একটি পবিত্র লক্ষ্যকে সামনে রেখে যেখানে আমাদের মা-বোনেরা নিরাপত্তায় পথ চলবেন; আমাদের শিশুরা কোনো ভয় ছাড়া, নিশ্চিন্ত মনে খেলবে, দৌড়াবে আর প্রফুল্ল চিত্তে স্কুলে যাবে; যেখানে প্রতিটি মানুষের আত্মসম্মান, জীবন ও সম্পদ থাকবে সুরক্ষিত। তাই একটি সুস্থ, নিরাপদ এবং অপরাধমুক্ত মানবিক সমাজ প্রতিটি নাগরিকের অবিচ্ছেদ্য আকাঙ্ক্ষা।
কিন্তু নির্মম সত্য হলো, প্রায়শই মানুষের এই চিরন্তন আকাঙ্ক্ষার সাথে বাস্তবতার এক আকাশ-পাতাল ব্যবধান তৈরি হয়। যে সমাজ মানুষের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা ছিল, তা-ই কখনো কখনো বিষাক্ত অপরাধের এক অন্ধকার রাজ্যে পরিণত হয়। তবে কোনো সমাজই আচমকা বা রাতারাতি অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে না; এর পেছনে কাজ করে এক গভীর ও সূক্ষ্ম Social Engineering; একটি সমাজে যেমন ভালো ও আদর্শ নাগরিক গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট কৌশল বা শিক্ষা ব্যবস্থা থাকে, ঠিক তেমনি একজন মানুষকে অপরাধী বানিয়ে তোলার পেছনেও রয়েছে সুনির্দিষ্ট সামাজিক প্ররোচনা এবং পরিবেশগত প্রভাব।
মানুষ স্বভাবগতভাবে অপরাধকে ঘৃণা করে; তা সত্ত্বেও, কিছু মানুষ কখনো কখনো অপরাধের গহ্বরে পা বাড়ায়। কেউ হয়তো আকস্মিক ভাবে হুট করে একটা অন্যায় করে ফেলে, আবার কেউ কেউ সমাজের উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে ছোট ছোট অপরাধ করতে করতে একসময় বড় অপরাধী হয়ে ওঠে। কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক সত্য এই যে, একজন কুখ্যাত পেশাদার অপরাধীও তার অন্তরের একেবারে গহীন কোণে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক সুপ্ত অপরাধবোধ ও অনুশোচনার তাড়না অনুভব করে। সে যে তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে কেবল অপরাধই করে চলে, তা কিন্তু নয়। অনেক সময় সেই অপরাধীও একান্ত নীরবে স্রষ্টার কাছে ক্ষমা চায়, কোনো অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়ায়।
মানুষের ভেতরের এই চরম বৈপরীত্য ও দ্বান্দ্বিক সত্তা একটি বিষয়কেই অকাট্যভাবে প্রমাণ করে, মানুষের বিবেক পরিস্থিতিভেদে ম্লান হতে পারে, কিন্তু তা পুরোপুরি মরে যায় না। অথচ, যখন পারিপার্শ্বিক পরিবেশ অন্যায় প্রবণ হয়ে ওঠে, যখন শাস্তির ভয় থাকে না, এবং সামাজিকভাবে পাপবোধের লজ্জা হারিয়ে যায়, তখনই ভেতরের সেই ঘুমন্ত বিবেককে বন্দি করে একজন মানুষ পুরোদস্তুর অপরাধী হয়ে ওঠে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, সভ্যতার শীর্ষে বাস করা মানুষ আমরা, চারপাশের এত শিক্ষা, রাশি রাশি সার্টিফিকেট, আকাশচুম্বী উন্নয়ন আর হাজারো আইন; তবুও কেন সমাজে এমন অমানবিক ও জঘন্য অপরাধ বারবার ঘটে চলেছে? এই ব্যর্থতার মুল কারণ আসলে কোথায়?
সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্যই বিচার ব্যবস্থার সৃষ্টি। অপরাধীকে খুঁজে বের করা, তার অপরাধ প্রমাণ করা এবং তাকে শাস্তির আওতায় আনা রাষ্ট্রের সবচেয়ে মৌলিক দায়িত্ব। ক্ষেত্রবিশেষে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড বা ফাঁসির মতো সর্বোচ্চ সাজাও দেওয়া হয়। তবে অপরাধবিজ্ঞান এবং আইনশাস্ত্রের মূল কথা হলো, অপরাধীকে সাজা দেওয়ার উদ্দেশ্য তার ওপর প্রতিশোধ নেওয়া নয়। বরং এর মূল লক্ষ্য অপরাধ যেন আর না হয় সেই লক্ষ্যে অপরাধ প্রবণ মানুষের মাঝে ভয় সৃষ্টি করে সামাজিক জীবনের সুদূরপ্রসারী কল্যাণ নিশ্চিত করা।
যে ব্যক্তি মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্য অপরাধ করে, কোমলমতি শিশুকে হত্যা করে কিংবা এই জাতীয় নৃসংশতায় প্ররোচনা দেয়, তার কঠোরতম শাস্তি হওয়া অনিবার্য। কারণ, সাজা কার্যকর করার মাধ্যমে আমরা সেই নিষ্পাপ ও সুন্দর শিশুটিকে আর কখনো পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনতে পারব না। কিন্তু এই শাস্তির উদ্দেশ্য হলো একটি অমোঘ দৃষ্টান্ত স্থাপন করা, যেন ভবিষ্যতে আর কেউ এমন অপরাধ করার দুঃসাহস না দেখায়। শাস্তির মূল দর্শনই হলো অপরাধপ্রবণতার বিরুদ্ধে একটি মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশ ও ভীতি তৈরি করা। অপরাধ করার পরিণতি যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা দেখে সমাজ যেন সতর্ক হতে পারে।
দুর্ভাগ্যবশত, এখানেই আধুনিক বিচার ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা রয়েছে। আর এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই অপরাধ জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। যখন একটি জঘন্য অপরাধের বিচার শেষ হতে যুগের পর যুগ বা কয়েক দশক কেটে যায়, তখন অপরাধীরা আইনকে ভয় পাওয়ার কোনো তাগিদই অনুভব করে না। একটি দীর্ঘমেয়াদি বিচার প্রক্রিয়ায় নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালত, আপিল এবং সর্বশেষ ক্ষমা ভিক্ষার মতো দীর্ঘ প্রশাসনিক মারপ্যাঁচে সময়ক্ষেপণ হতে থাকে। এর ফলে অপরাধীরা কেবল পার পেয়ে যাওয়ার পথই খোঁজে না, বরং তাদের অপরাধ করার সাহস আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। এর চেয়েও বড় সংকট হলো, সুদীর্ঘকাল পর যখন কারও সাজা কার্যকর হয়, তা অত্যন্ত গোপনে, চার দেয়ালের ভেতরে সম্পন্ন হয়। ফলে অপরাধপ্রবণ মানুষেরা জানতেও পারে না যে কোন অপরাধের কী চরম পরিণতি হলো। যে শাস্তি বা বিচার সমাজকে নাড়া দিতে পারল না, দৃশ্যমান কোনো দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারল না, যা জনমনে সতর্কতা সৃষ্টি করতে পারল না, তা মূলত অকার্যকর এক ব্যবস্থা।
আমরা অনেক সময় উন্নত বিশ্বের উদাহরণ টানি। কিন্তু অপরাধ দমনের ইতিহাসে দেখা গেছে, বিশ্বের যেসব অঞ্চলে বা দেশে জঘন্যতম অপরাধের শাস্তি জনসমক্ষে দৃষ্টান্তমূলকভাবে দৃশ্যমান করা হয়েছে, সেখানে অপরাধের হার মুহূর্তের মধ্যে নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। অপরাধের ভয়াবহতার বিপরীতে শাস্তির দৃশ্যমান রূপটি দুর্বল মনের মানুষের কাছে সাময়িকভাবে কঠোর মনে হতে পারে, কিন্তু মানবতার বৃহত্তর স্বার্থে এই 'প্রয়োজনীয় কঠোরতা' অত্যন্ত জরুরি।
কিন্তু বলুন তো, একজন অপরাধী কি জন্মগতভাবেই অপরাধী? বিজ্ঞান বলে, মানুষ জন্ম নেয় একটি নিষ্পাপ মন নিয়ে; তাহলে সে কেন অপরাধী হয়ে ওঠে?
উত্তরটি লুকিয়ে আছে তার সামাজিক জীবনে বেড়ে ওঠার পথে। মানুষ তার চারপাশের পরিবেশে যা কিছু দেখে, যা শোনে এবং যা ভোগ করে, সেসবের ওপর ভিত্তি করেই তার মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো গড়ে ওঠে। একটি সুস্থ, পরিচ্ছন্ন ও নৈতিক পরিবেশ যেমন ভালো মানুষ তৈরি করে, তেমনি একটি অপরাধপ্রবণ, কলুষিত ও অনৈতিক পরিবেশ হাজারও অপরাধীর জন্ম দেয়। তাই যখন কোনো ব্যক্তি অপরাধের পথে পা বাড়ায়, তখন তার জন্য সে নিজে যতটা দায়ী, সমাজ কি সমানভাবে দায়ী নয়? যে বিষাক্ত পরিবেশে শিশুটি বড় হয়ে আজ অপরাধীতে পরিনত হয়েছে, সেই পরিবেশের স্রষ্টা তো আমরাই। পরিবেশ কোনো শূন্যস্থান থেকে তৈরি হয় না; পরিবেশ হলো আমাদের সমষ্টিগত আচরণ, সংস্কৃতি এবং মূল্যবোধের প্রতিফলন।
বিগত কয়েক দশকের দিকে তাকালে দেখা যাবে, আমরা আমাদের সমাজে ধাপে ধাপে এক চরম নৈতিক অবক্ষয় ও নির্লজ্জতার চাষ করেছি। আমরা প্রতিদিন যা দেখি, যা কিছু শুনি আমাদের সেই নাটক, সিনেমা, গল্প, কবিতা, সংগীত, আলোচনা, সোশ্যাল মিডিয়া এইসবই আমাদের মন গঠন করে। কিন্তু আমরা প্রায়ই সস্তা বিনোদনের নামে অবলীলায় সেইসব গল্প, কবিতা, সিনেমা, নাটক, সংবাদ আর সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে অপরাধ, অনৈতিকতা আর নির্লজ্জতার বীজ বুনে চলেছি। ছোট ছোট অন্যায়কে যখন সমাজ ঘৃণা করতে ভুলে যায়, তখন পরবর্তী প্রজন্ম বড় বড় অপরাধকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করতে শেখে। যদি লজ্জাজনক বিষয়গুলোকে উপযুক্তভাবে ধিক্কার দেয়া না হয়, তবে সেই সমাজে নির্লজ্জতার উচ্চতা হয় আকাশছোঁয়া।
আজ যে যুবকটিকে অপরাধের দায়ে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলাচ্ছি, তার প্রতি আমাদের তীব্র ঘৃণা। কিন্তু একই সাথে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের বিবেককে প্রশ্ন করা উচিত, এই সমাজকে অপরাধপ্রবণ করে তোলার পেছনে, নির্লজ্জতা আর কুরুচির চাষ করার পেছনে আমাদের প্ররোচনা কিংবা উদাসীনতা কি দায়ী নয়? এই ব্যর্থতার জন্য আমাদের কি কোন শাস্তিই প্রাপ্য নয়?
প্রিয় লেখক, সাংবাদিক, সংগীতশিল্পী, অভিনেতা, নির্মাতা, ইনফ্লুয়েন্সার এবং সামাজিক মাধ্যমের সচেতন ভাই-বোন ও অভিভাবকবৃন্দ-
আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, মানুষের মন হলো এক পরম উর্বর ভূমির মতো। এই ভূমিতে আত্মসম্মান, রুচিবোধ আর নৈতিকতার চাষাবাদ করা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ একটি কাজ। অথচ নির্লজ্জতা আর কুরুচি শক্তিশালী আগাছার মতো, এমনিতেই তা খুব দ্রুত চারপাশ ছাপিয়ে আমাদের অন্তরকে গ্রাস করে নেয়। তাই আসুন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেকোনো কিছু পোস্ট করার আগে আমরা একটু থামি, একটু ভাবি। নিজেকে প্রশ্ন করি, আমার এই একটি পোস্ট বা একটি মন্তব্য যারা দেখবে, তারা কি এখান থেকে মানবিক কোনো মূল্যবোধ শিখবে, নাকি কোনো মন্দ আচরণে উদ্বুদ্ধ হবে?
আধুনিক 'মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং' অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, আমরা চোখের সামনে যা কিছু বেশি দেখি এবং কানে যা কিছু বেশি শুনি, সেসবই আমাদের অবচেতন মন, চিন্তা ও কল্পনার জগতে অবিরাম বিচরণ করতে থাকে। আর মানুষের সেই ভেতরের চিন্তা ও কল্পনা থেকেই জন্ম নেয় তার প্রতিটি বাহ্যিক আচরণ। তাই আসুন অবক্ষয়ের বীজ বোনা বন্ধ করি। আগাছা উপড়ে ফেলে মানুষের মনের এই উর্বর জমিনে আমরা সম্মিলিতভাবে আত্মসম্মান ও আলোর চাষাবাদ শুরু করি।
লেখক : এ ইউ দৌলা
মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক।



