ওমান সাগরে ইরানি তেলবাহী একটি বাণিজ্যিক ট্যাঙ্কারে মার্কিন হামলায় তিন ভারতীয় নাবিক নিহত হওয়ার ঘটনায় ভারতে ব্যাপক জনরোষ সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটি এমন সময় ঘটেছে, যখন নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনের সম্পর্ক বিভিন্ন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে আগেই চাপের মুখে ছিল।
গত বুধবার সকালে ইরানি তেলবাহী এম/টি সেত্তেবেলো ওমান সাগর অতিক্রম করার সময় একটি মার্কিন সামরিক বিমান জাহাজটির ইঞ্জিন রুমে নির্ভুল অস্ত্র দিয়ে হামলা চালায়। এতে জাহাজে আগুন ধরে যায় এবং একটি বড় উদ্ধার অভিযান শুরু হয়।
পালাউয়ের পতাকাবাহী জাহাজটিতে হামলার পর উদ্ধার হওয়া তিনটি মরদেহ ভারতীয় নাবিকদের বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। মার্কিন বাহিনীর দাবি, ইরানি বন্দর অবরোধ কার্যকর করার সময় জাহাজটি বারবার নির্দেশ অমান্য করায় এই হামলা চালানো হয়।
ভারতের উদ্বেগ ও কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া
ভারত সরকার বলছে, নিহতদের পাশাপাশি জাহাজটিতে থাকা ২৮ জন নাবিকের অধিকাংশই ভারতীয় নাগরিক ছিলেন। এর মাত্র একদিন আগে ওমান উপসাগরে আরেকটি ট্যাঙ্কার এম/টি মারিভেক্সে মার্কিন হামলার পর ২৪ জন ভারতীয় নাবিককে উদ্ধার করতে হয়েছিল।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওয়াশিংটনে নিযুক্ত মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে তলব করে ঘটনার ব্যাখ্যা চেয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, “এই ধরনের হামলা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।”
নয়াদিল্লির আশঙ্কা, ভারতীয় নাবিকরা এমন একটি সংঘাতের শিকার হচ্ছেন, যার সঙ্গে ভারতের সরাসরি কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
নিহত নাবিকদের পরিবার এখনো তাদের স্বজনদের শেষ মুহূর্ত সম্পর্কে জানতে চাইছে।
নিহত এক নাবিকের বাবা রাজেশ শর্মা বলেন, আমি শুধু আমার ছেলের মরদেহ দেশে ফেরত চাই। আমি জানতে চাই, তার শেষ মুহূর্তে কী ঘটেছিল এবং তাকে উদ্ধার করার কোনো চেষ্টা করা হয়েছিল কি না।
ফরওয়ার্ড সিমেন্স ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়ার (এফএসইউআই) সাধারণ সম্পাদক মনোজ যাদব জানান, ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নৌশ্রমিক সরবরাহকারী দেশ। বিশ্বজুড়ে তিন লক্ষাধিক ভারতীয় নাবিক বিভিন্ন বিদেশি পতাকাবাহী জাহাজে কর্মরত আছেন। ফলে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে তাদের ঝুঁকি অনেক বেশি।
মোদির নীরবতা ও রাজনৈতিক বিতর্ক
ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরাসরি কোনো মন্তব্য না করলেও তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি ফোনকলের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) ধন্যবাদ জানান।
মোদি লিখেছিলেন, ধন্যবাদ, আমার বন্ধু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, আপনার ফোনকল ও শুভেচ্ছার জন্য।
এই পোস্ট প্রকাশের সময়ই তিন ভারতীয় নাবিক নিহত হওয়ার খবর সামনে আসে। ফলে বিরোধী দলগুলো মোদির কঠোর সমালোচনা শুরু করে।
আম আদমি পার্টির (এএপি) নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল প্রশ্ন তোলেন, “প্রধানমন্ত্রী ঠিক কোন বিষয়ের জন্য ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন? ভারতীয় নাগরিকদের হত্যার জন্য?”
ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসও এক বিবৃতিতে বলেছে, ট্রাম্পের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা বারবার উল্লেখ করা মোদি এখন ভারতীয়দের জীবন রক্ষায় সেই সম্পর্কের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছেন।
ভারতের সেন্টার ফর সোশ্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক প্রগ্রেসের ভিজিটিং সিনিয়র ফেলো ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী কান্তি বাজপাই মনে করেন, এই ঘটনা ভারত-মার্কিন সম্পর্কে নতুন অস্বস্তির জন্ম দিয়েছে।
তার মতে, ভারতীয় হতাহতের সংখ্যা বাড়লে এবং জনরোষ তীব্র হলে মোদি সরকারের পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
তিনি আরও বলেন, পরিস্থিতি শান্ত করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য দুঃখ প্রকাশ সহায়ক হতে পারে।
বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
গত এক বছরে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বিভিন্ন কারণে টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— ভারত-পাকিস্তান ইস্যুতে ট্রাম্পের মধ্যস্থতার দাবি, ভারতীয় পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক বৃদ্ধি, পাকিস্তানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি এবং ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক সামরিক কার্যক্রম।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই আগামী সপ্তাহে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিতব্য জি-৭ সম্মেলনের ফাঁকে মোদি ও ট্রাম্পের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে নাবিকদের মৃত্যুর ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
তিন ভারতীয় নাবিকের মৃত্যু শুধু একটি মানবিক ট্র্যাজেডি নয়; এটি ভারত-মার্কিন সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতারও প্রতিফলন। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা, অন্যদিকে বিদেশে ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা এখন মোদি সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভারতের অভ্যন্তরে জনমত যত তীব্র হবে, নয়াদিল্লির ওপর ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার চাপও তত বাড়বে। ফলে ওমান সাগরের এই ঘটনা শুধু তিনটি প্রাণহানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি ভবিষ্যতে ভারত-মার্কিন কূটনৈতিক সম্পর্কের গতিপথেও প্রভাব ফেলতে পারে।

