বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বাড়েনি বিদ্যুৎ উৎপাদন। নানা সীমাবদ্ধতা ও আমদানি নির্ভরতার চাপ কমিয়ে একটি স্বনির্ভর, টেকসই, পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী জ্বালানিব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় সরকার। এক্ষেত্রে আমদানি নির্ভর জ্বালানির চাপ কমাতে জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতার প্রতীক হতে পারে সৌরবিদ্যুৎ। নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, সবুজ অর্থনীতি ও আত্মনির্ভরশীল শক্তিব্যবস্থার পথে অগ্রসর হচ্ছে সরকার। ২০৩০ সালের মধ্যে শুধু সৌরশক্তি থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কার্যত সৌরবিদ্যুৎকে বিদ্যুতের প্রধান উৎসে পরিণত করতে চায় সরকার। সরকারের এই উদ্যোগকে দূরদর্শী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। এর মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তার পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও নিশ্চিত হবে।
বর্তমানে দেশে মোট ১ হাজার ৪৫১ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এটি দেশের মোট বিদ্যুৎ সক্ষমতার মাত্র ৫ দশমিক ১ শতাংশ। ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান ৩০ শতাংশে উন্নীত করার মধ্যে দিয়ে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ বা রুফটপ সোলার ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য প্রকল্পগুলো দেশের আমদানি নির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। সরকারের সমন্বিত পরিকল্পনা মোতাবেক ইতোমধ্যেই আগামী দু’বছরের মধ্যে অতিরিক্ত ৮০৯ দশমিক ৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা দেখছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)।
সৌরশক্তি পরিবেশবান্ধব শক্তি উৎপাদনের অন্যতম সম্ভাবনাময় মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। একটি টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে চান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও। গত রোববার (২৪ মে) জাতীয় সংসদ ভবনে এক মেগাওয়াট রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘আজ আমরা এমন একটি উদ্যোগের উদ্বোধন করছি, যা শুধু একটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগই নয়; বরং এটি বাংলাদেশের টেকসই ভবিষ্যতের একটি প্রতীক।’ প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা থেকে স্পষ্ট সরকার একটি শক্তিশালী ও স্বনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সৌরবিদ্যুৎকে পরিবেশবান্ধব ও অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর সমাধান হিসেবে দেখছেন সরকারপ্রধান। তিনি বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, জাতীয় সংসদ ভবনের এই উদ্যোগ দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে অনুপ্রাণিত করবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ও প্রতিটি নাগরিক যদি পরিচ্ছন্ন জ্বালানির এ অভিযাত্রায় অংশ নেয়, তবে বাংলাদেশ ইনশাআল্লাহ খুব দ্রুতই টেকসই উন্নয়নের মডেল রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে।’
দেশজুড়ে সরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, কারখানা, বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক ভবনের ছাদে রুফটপ সোলার স্থাপন করে জ্বালানি সাশ্রয় করা সম্ভব। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ কার্যত শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। নগরীর অব্যবহৃত ছাদগুলোকে ‘জাতীয় রফটপ সোলার কর্মসূচি’র আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে যা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করেছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য থেকেই জানা যায়, বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে প্রতি বর্গকিলোমিটারে সাড়ে চার থেকে পাঁচ কিলোওয়াট ঘণ্টা সৌরশক্তি পাওয়া যায়। অসংখ্য ছাদ, শিল্প এলাকা, খোলা জমি এবং উপকূলীয় অঞ্চল নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিশাল সম্ভাবনা ধারণ করে আছে।’
রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন যে বাস্তবায়নযোগ্য তাঁর উজ্জ্বলতম উদাহরণ হতে পারে রাজধানীর আগারগাঁও এলাকার বিনিয়োগ ভবনের ছাদ। সেখানে স্থাপিত হয়েছে একটি ১৫০ কিলোওয়াট-পিক ক্ষমতাসম্পন্ন সোলারবিদ্যুৎ প্রকল্প। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) নিজেদের ভবনের ছাদের জায়গা বরাদ্দ দিলেও ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (ডেসকো) এর মূলধনী বিনিয়োগ ও পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছে। এখানে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। মাসে উৎপাদিত হচ্ছে ১৫ হাজার ইউনিট। ছাদ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার ফলে বিডা পাচ্ছে উৎপাদিত বিদ্যুতের ১০ শতাংশ। বাদ বাকী বাকি ৯০ শতাংশ বিদ্যুৎ যাচ্ছে ডেসকোর কাছে।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বিনিয়োগ ভবনে বেজা, পিপিপি কর্তৃপক্ষ ও বিদ্যুৎ বিভাগের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘মার্কেট সাউন্ডিং’ কর্মশালায় জানানো হয়, জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) ভিত্তিতে দেশের প্রথম সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ফেনীর সোনাগাজীতে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) মালিকানাধীন ৪১২ একর জমিতে ১৩০ থেকে ১৪০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে চলতি বছরের আগস্টে দরপত্র প্রক্রিয়া শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। উৎপাদিত বিদ্যুতের ক্রেতা হবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। এর আগে গত বছরের মার্চে প্রকল্পটি পিপিপি পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে চলতি বছরের ৭ মে বেজা ও বিপিডিবির মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়। এর আগে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে চলতি বছরের বৃহস্পতিবার (১৭ এপ্রিল) মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি বলেন, ‘সরকারি মালিকানাধীন জমি ব্যবহার করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন খাতে বড় আকারের উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতে বেসরকারি উদ্যোক্তারা অংশ নিতে পারবেন। চূড়ান্ত অনুমোদনের পর কয়েক দিনের মধ্যেই এটি কাজ শুরু করবে। প্রয়োজনে নীতিমালা সংশোধন ও নতুন আইন প্রণয়ন করা হবে।’
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) কর্মকর্তারা জানান, ইতোমধ্যে ১৩টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে ৫৭২ দশমিক ৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার অতিরিক্ত রুফটপ সৌর প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। এগুলো চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের মধ্যে চালু হবে। সম্প্রতি জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, আগামী পাঁচ বছরে ৫ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। তিনি বলেন, ‘এই লক্ষ্য অর্জনের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে আগামী তিন মাসের মধ্যে দেশের সব জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সৌর প্যানেল স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

