ঢাকা রবিবার, ২৮ জুন, ২০২৬

জুলাই শহীদের অনুদানের টাকায় দ্বিতীয় বিয়ে করলেন বাবা

নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ
প্রকাশিত: জুন ২৮, ২০২৬, ০৭:৫০ পিএম
মোহাম্মদ আব্দুল মতিন। ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ শাহরিয়ার বিন মতিনের বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, জুলাই শহীদের অনুদানের সোয়া ৫ লাখ টাকার স্বর্ণালঙ্কার কিনে তিনি বিয়ে করেন। এ ঘটনায় উপজেলায় আলেচনা-সমালোচনা চলছে।

শহীদ শাহরিয়ার বিন মতিনের বাবার নাম মোহাম্মদ আব্দুল মতিন (৫০)। তিনি মতিঝিল শাখার আলফা গ্রুপের সেলস ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করছেন।

মোহাম্মদ আব্দুল মতিনের প্রথম স্ত্রী মমতাজ বেগম (৪৫)। তাদের বাড়ি উপজেলার মাইজবাগ ইউনিয়নের কুমড়াশসন গ্রামে। এ দম্পতির একমাত্র ছেলে শেখ শাহরিয়ার বিন মতিন। তাদের ১০ বছর বয়সি এক মেয়ে রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া শহীদ শাহরিয়ারের বাবা আব্দুল মতিন দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। তবে এ অভিযোগকে মিথ্যা দাবি করে করে তিনি জানান, প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নিয়েই দ্বিতীয় বিয়ে করেছি।

আব্দুল মতিন ও মমতাজ বেগম দম্পতির ২০০৪ সালের ৭ নভেম্বর এ বিয়ে করেন। দীর্ঘ ২২ বছর একসঙ্গে থাকার স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে করায় সম্পর্কে ফাটল ধরল।

উল্লেখ্য, শাহরিয়ার বিন মতিন ছাত্রজনতার আন্দোলনে অংশ নিয়ে ১৮ জুলাই বিকেলে ঢাকার মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের কাছে গুলিবিদ্ধ হন। গুলি ডান চোখের পাশ দিয়ে ঢুকে মাথা ভেদ করে বের হয়ে যায়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০ জুলাই তিনি মারা যান।

সূত্র জানায়, গত মাসের ২৯ মে জুলাই শহীদ ছেলের ভাতার অনুদানে ৭ লাখ টাকার কাবিন ও সোয়া ৫ লাখ টাকার গহনা পড়িয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেন।

এমন খবর পেয়ে অভিমানে গত ২ জুন একমাত্র মেয়ে শেখ মুমতাহিনা বিনতে মতিন ওরফে স্মাইলকে নিয়ে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেন। তবে, পরিবারের লোকজন বিষয়টি বুঝতে পেরে তাকে আত্মহত্যার হাত থেকে রক্ষা করেন।

এরপর বিষয়টি নিয়ে এলাকাজুড়ে আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় বইতে থাকে। এছাড়াও আব্দুল মতিনের বিরুদ্ধে জুলাই শহীদ ছেলে শাহরিয়ারের নাম ভাঙিয়ে বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়েন। এর অল্প কিছুদিনের মধ্যে বেশ টাকা পয়সার মালিকও হয়ে যান আব্দুল মতিন।

শহীদ শাহরিয়ারের মা মমতাজ বেগম বলেন, সন্তান হারানোর শোক কাটিয়ে উঠার আগেই আমার অনুমতি ছাড়াই আব্দুল মতিন দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। আমার জানামতে তার হাতে বিয়েতে সোয়া ৫ লাখ টাকার স্বর্ণালঙ্কার কেনার সামর্থ নেই। আমার শহীদ ছেলের রক্তের দাগ শুকানোর আগেই সরকারের দেওয়া অনুদানের টাকায় তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করছেন।

তিনি বলেন, আমার ছেলের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর পর থেকেই তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করার জন্য আমাকে বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করে আসছিলেন। তিনি বারবার বলেছিলেন, আমার বংশ রক্ষার জন্য দ্বিতীয় বিয়ে করতে হবে।

মমতাজ বেগম অভিযোগ করেন, আবদুল মতিন জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ একমাত্র ছেলে শাহরিয়ারের মৃত্যুকে পুঁজি করে নানা ধান্ধাবাজি ও প্রতারণা শুরু করেন। বারবার নিষেধ করার পরেও তিনি কোন কথাই শুনতে চাননি। দুই বউয়ের ভরণপোষণের সামর্থ্য নেই তার। আমি ২২ বছর কাটিয়েছি। তার আর্থিক অবস্থা ভালো না। 

মমতাজ বেগম আরও বলেন, শহীদ পরিবারকে দেওয়া সরকারি বরাদ্দের এককালীন ৩০ লাখ টাকা আমার সই জালিয়াতি করে তুলতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আমি সচেতন থাকায় সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছেন। শুধু তাই নয়, আমার শহীদ ছেলের নাম ভাঙিয়ে আব্দুল মতিন বিভিন্ন সময় মানুষের কাছ থেকে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। আমার এখন একটাই চাওয়া মেয়েটাকে বড় করার আগে যেন আল্লাহ আমাকে নিয়ে না যায়। এ ঘটনার আমি সঠিক বিচারের দাবি জানাচ্ছি।

এ বিষয়ে শাহরিয়ারের বাবা মোহাম্মদ আব্দুল মতিন বলেন, আমার বংশ রক্ষার জন্য আমি দ্বিতীয় বিয়ে করেছি। বিশেষ করে আমার মায়ের অনুরোধে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছি। এছাড়া বিয়ে করার আগে প্রথম স্ত্রীকে আমাকে দ্বিতীয় বিয়ে করার অনুমতি দিয়েছেন। কিন্তু তিনি এখন অস্বীকার করছেন।

তিনি আরও বলেন, আমি আলফা গ্রুপের মতিঝিল শাখায় সেলস ম্যানেজার হিসেবে কাজ করছি। বিয়ে করার মতো সামর্থ আমার আছে। ছেলের অনুদানের টাকা দিয়ে বিয়ে করতে হবে, বিষয়টি এমনও নয়। বিয়ে করার পর আমি প্রথম স্ত্রীকে আনতে পাঁচবার বাসায় গিয়েছি। মেয়ের সঙ্গেও দেখা করতে পারিনি। সবশেষ অন্য একজনের মাধ্যমে তাদের বাসায় প্রবেশ করি। কিন্তু আমাকে অসম্মান করে বাসা থেকে বের করে দিয়েছে। বিষয়টি এখন সমঝোতার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করছি।

এসময় নববধূর নাম ও পরিচয় জানতে চাইলে তিনি তা জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

এ বিষয়ে জুলাইযোদ্ধা রুহুল আমিন রিপন বলেন, একজন জুলাই শহীদের বাবা হয়ে মতিন সাহেব যে কাজটি করেছেন তা মোটেও উচিত হয়নি। আমি এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।

এ বিষয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী আল নূর আয়াস বলেন, জুলাই শহীদ শাহরিয়ার বিন মতিনের বাবার দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টি শুনেছি। তবে, বিষয়টি মেনে নেওয়ার মত না। ছেলেকে যদি সত্যিই তিনি ভালোবাসতেন, তাহলে তিনি এমন একটি কাজ করতেন না। তাদের একটি মেয়েও রয়েছে। তিনি চাইলেই মেয়েটাকে নিয়েই সংসার করে যেতে পারতেন।